প্রথম আলো: আমাদের দেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধ আইন পাস হয় ২০০২ সালে। একই সময় ভারতেও একই আইন পাস হয়। সেখানে আর্থিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এনফোর্সমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ইডি) রয়েছে। তবে আমাদের এখানে অনেকগুলো সংস্থা কাজ করে। আমাদের এখানে কোনো সংস্কার প্রয়োজন কি না।

শফিক আহমেদ: প্রশ্নটা হচ্ছে, অর্থ পাচার প্রতিরোধ করতে আমাদের সরকার কিংবা সরকারি যেসব সংস্থা দায়িত্বে আছে, তারা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে কি না। যদি সংস্থাগুলোর কর্তাব্যক্তিরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে থাকেন, তাঁরা যদি চিহ্নিত করে থাকেন যে এ ধরনের অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে। আর যাঁরা এসব অপরাধ করছেন, তাঁদের যদি গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করা যায়, তাঁদের যদি শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ ধরনের উদ্যোগ যদি তাঁরা না নেন, তাহলে তো দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ হবে না। সত্যিকার অর্থে যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তাহলে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব। কিন্তু আমি মনে করি না, আমাদের দেশের সংস্থাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে কাজগুলো করে।

প্রথম আলো: আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ থেকে একটা শ্রেণি বাণিজ্যের নামে বিপুল অঙ্কের টাকা বিদেশে নিয়ে চলে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের কেউ সেভাবে আইনের আওতায় আসছে না। এ ব্যর্থতার দায়ভার কার?

শফিক আহমেদ: আমি মনে করি, সরকারের একটা বিভাগ অর্থ পাচার ঠেকাতে মোটেও আন্তরিক নয়। তারা ভালোভাবে নজরদারি করছে না। অর্থ পাচার পুরোপুরি বন্ধ করা যদি উদ্দেশ্য না হয়, তাহলে তো অপরাধ সংঘটিত হবেই। নিবেদিতভাবে কাজটা করতে হবে। তা না হলে অর্থ পাচার ঠেকানো যাবে না। কারণ, প্রত্যেকে একটা ইনটেনশন নিয়ে ঘোরেন। এই ইনটেনশন যদি থামাতে হয়, তাহলে আপনাকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ অপরাধ ঠেকানো যাঁদের দায়িত্ব, তাঁদের সরকার জিজ্ঞাসা করুক, কেন অপরাধ থামানো যাচ্ছে না। সংস্থাগুলো বিস্তারিত তথ্য পর্যালোচনা করে ব্যর্থতার কারণগুলো চিহ্নিত করুক।

প্রথম আলো: সুইজারল্যান্ডসহ অন্যান্য দেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরত আসছে না। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর উদ্যোগ আছে বলে আপনি মনে করেন কি না।

শফিক আহমেদ: যাঁরা ইতিমধ্যে অর্থ পাচার অপরাধ সংঘটিত করে ফেলেছেন, তাঁরা কারা, সেটি আগে চিহ্নিত করা দরকার। তাঁদের বিরুদ্ধে এখনই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হোক। বাংলাদেশ থেকে যেসব অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, সেই অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার বাধ্য। ব্যাপারটি সরকারকে অবিলম্বে শতভাগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।

প্রথম আলো: বিদেশে যাঁরা টাকা পাচার করেছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু বিদেশ থেকে পাচারসংক্রান্ত তথ্য জোগাড় করতে পারছেন না বলে জানিয়েছেন তদন্তপ্রক্রিয়ায় জড়িত কর্মকর্তারা। এ ক্ষেত্রে কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?

শফিক আহমেদ: যে দেশে টাকাটা পাচার হয়েছে, তথ্য আনতে হলে সেই দেশের সহযোগিতা লাগবে। রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সহযোগিতায় বিদেশ থেকে অপরাধীদের তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করতে হবে। যাঁরা করেছেন, তাঁদের শাস্তি পেতে হবে। সোজা কথা হচ্ছে, যাঁরা অপরাধ করেছেন, তাঁদের তথ্য জোগাড় করা কঠিন কোনো কাজ নয়। দরকার শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের আন্তরিকতা।

প্রথম আলো: অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাবলয়ের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের কেউ কেউ অর্থ পাচারে জড়িত। কিন্তু তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে কী করণীয়?

শফিক আহমেদ: যাঁরা অর্থ পাচার অপরাধপ্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কিন্তু অনেকেই চেনেন। অর্থাৎ একটি মহল একে অন্যের পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, প্রভাবশালী মহল, কেন এসব চিহ্নিত অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না? আমাদের দেশের এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া দেখার পর যেকোনো লোক তো এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়তে ভয় পাবেন না। এ জন্য লোকে টাকা বিদেশে নিয়ে রাখছেন। সরকার যদি কঠোর না হয়, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

প্রথম আলো: বাণিজ্যনির্ভর অর্থ পাচার কিংবা ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তারা আসামি হচ্ছেন। সমাজের উচ্চশিক্ষিত লোকের এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে কী বলবেন?

শফিক আহমেদ: ইতিপূর্বে যাঁরা অর্থ পাচার করেছেন, তাঁদের তো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হচ্ছে না। যাঁরা চিহ্নিত অর্থ পাচার অপরাধে জড়িত, তাঁদের যদি শাস্তি না হয়, তাহলে তো অন্যরা এ ধরনের অপরাধ করতে ভয় পাবেন না। সেটাই হচ্ছে আমাদের বাংলাদেশে। আইনি প্রক্রিয়ায় যদি একজনের শাস্তি হয়, তখন অন্যরা তা দেখে সতর্ক হন। কিন্তু যদি এমন হয়, অপরাধ করলে কিচ্ছু হবে না, তাহলে তো অপরাধ বন্ধ হবে না। বাংলাদেশে সেটাই হচ্ছে। সরকার যদি তাঁদের সুযোগ দেয়, তাহলে তো কোনোভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ হবে না।

প্রথম আলো: কালোটাকা সাদা করার সংস্কৃতির কারণে আমাদের দেশে জালিয়াতি-দুর্নীতি কমছে না বলে মনে করেন আর্থিক খাতের অনেক বিশেষজ্ঞ। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?

শফিক আহমেদ: কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া যথাযথ নয় বলে আমি মনে করি। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন একজন লোক কালোটাকা সাদা করার সুযোগ পাবেন? যাঁরা কালোটাকা সাদা করেন, তাঁদের চিহ্নিত করুন। অন্যরা কে কী মনে করেন জানি না, আমি কালোটাকা সাদা করার বিপক্ষে। এটা মোটেও হওয়া উচিত নয়। অর্থ পাচার যদি ঠেকাতে হয়, তাহলে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।

প্রথম আলো: অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকায় অর্থ পাচারে জড়িত অনেককে ধরা হচ্ছে না। আপনি কী মনে করেন?

শফিক আহমেদ: সমাজের দুর্বৃত্তায়িত রাজনৈতিক চিত্র দেখে আমি হতাশ হই। আইন অনুযায়ী যদি সবকিছু চলত, তাহলে তো এমন হতো না। রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত অনেকে টাকা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এটা তো করতে দেওয়া উচিত নয়। দেশের টাকা বাইরে চলে যাবে, আর কিছু হবে না, করবে না, এটা তো হয় না।

প্রথম আলো: অর্থ পাচার রোধে আমাদের দেশে আইনগত কোনো সংস্কার প্রয়োজন আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

শফিক আহমেদ: আমাদের দেশে বিদ্যমান যে আইন, তার সংস্কার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। আমরা কীভাবে আইনটা ব্যবহার করছি, সেটা দেখার বিষয়। আমরা কতটা গুরুত্বের সঙ্গে আইন প্রয়োগ করছি, সেটি দেখার বিষয়। বিষয়টি আমরা কীভাবে দেখছি, সেটি কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। যদি আইনের সঠিক প্রয়োগ হয়, তাহলে তো অপরাধ বন্ধ হয়ে যাবে। তা না হলে এটা কিন্তু থামবে না। যদি দেখেন, টাকাটা চলে যাচ্ছে। তাহলে টাকাটা ধরেন। সঙ্গে সঙ্গে খুঁজে বের করেন, কেন এটা সংঘটিত হয়েছে। আমি তো সরকারকে তেমন কিছুই করতে দেখি না। যাঁরা অপরাধ সংঘটিত করেছেন, তাঁদের তো ধরা হচ্ছে না।

প্রথম আলো: রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ—আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এ তিনটি সংস্থার যথাযথ আইনি পদক্ষেপের ফলে রাষ্ট্র সঠিকভাবে পরিচালিত হয়। অর্থ পাচার মামলার যে দীর্ঘসূত্রতা, সে ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের কী করণীয় বলে আপনি মনে করেন?

শফিক আহমেদ: অর্থ পাচারে যাঁরা জড়িত, তাঁদের ব্যাপারে আদালত যদি কঠোর হন, আদালত যদি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করেন, তাহলে কিন্তু অপরাধী ছাড় পাবেন না। কে দোষী কিংবা নির্দোষ, সেটি অনেক পরের বিষয়। পাচার করা অর্থের সন্ধান পেলে, আদালত তা অবরুদ্ধ করতে পারেন। আদালত যদি আইনের প্রয়োগই না করেন, মাসের পর মাস চলে যাবে, বছরের পর বছর পার হবে, তাহলে তো কিছু হবে না।

প্রথম আলো: আইনজ্ঞরা বলছেন, আইনের শাসনের অভাবে অর্থ পাচার রোধ হচ্ছে না। আপনি কি তা-ই মনে করেন?

শফিক আহমেদ: যাঁরাই বাজার নিয়ন্ত্রণ করেন, তাঁদের অনেকেই বিদেশে টাকা পাচার করে নিয়ে যাচ্ছেন। সরকার যখনই সেটি জানতে পারবে, তখনই তো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। দেশে কঠোরভাবে আইনের শাসন নেই। আইনের শাসন সত্যিকার অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে না। সোজা কথা হচ্ছে, আইনের শাসন তো এত লুজ হতে পারে না। যদি কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রয়োগ করা হয়ে থাকত, তাহলে অর্থ পাচার নিয়ন্ত্রণে থাকত। কিন্তু সেটি হচ্ছে না বাংলাদেশে।

প্রথম আলো: অর্থ পাচার রোধে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের প্রসিকিউশন ব্যবস্থা দুর্বল। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?

শফিক আহমেদ: আমিও মনে করি, বাংলাদেশের প্রসিকিউশন ব্যবস্থা দুর্বল। যেখানে কঠোর হওয়া দরকার, সেখানে কঠোর হচ্ছে না। এই প্রসিকিউশনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তো অর্থ পাচারকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। আমাদের রাষ্ট্রকে এই দুর্বলতা স্বীকার করে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। যে দুর্বলতাটা আমার কাছে চিহ্নিত হয়েছে, সে দুর্বলতা কেন হচ্ছে, সেটা আগে চিহ্নিত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতাটা হচ্ছে, সরকার মনে করছে, ‘চলছে তো চলছে। তাতে আমার কী?’ এ ধরনের মনোভাব বজায় থাকলে আপনি কিছুই করতে পারবেন না।

প্রথম আলো: অনেক দেশ অর্থ পাচার রোধে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তথ্যভান্ডার তৈরি করেছে। আমাদের দেশেও এ ধরনের তথ্যভান্ডার করা উচিত কি না।

শফিক আহমেদ: আমাদের দেশে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে গেছে, সেটি যদি সংশোধিত না হয়, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর নানা কুপ্রভাব পড়বে। আমাদের দেশে যা করণীয়, তা হচ্ছে না। যেটি করলে পরে রাষ্ট্রের উন্নয়ন হবে, সেটি তো হচ্ছে না। তাহলে আমরা কীভাবে বলতে পারি, সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। রাষ্ট্রের নজরদারিতে থাকা উচিত, কাদের হাতে অঢেল সম্পদ রয়েছে। কার কাছে কত টাকা, সেটির একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভান্ডার থাকা উচিত। এতে অর্থ পাচার অনেকখানি কমে আসবে। যে যাঁর খুশি মতো অবৈধ সম্পদ আয় করবেন, যে যাঁর ইচ্ছেমতো বিদেশে অর্থ পাচার করবেন, সেটি তো হতে পারে না। লোকে যদি জানে, আমার যত সম্পদ, তা সরকারের জানা আছে, তখন তো তিনি সাবধান হবেন।