দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা নওগাঁ। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এ জেলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ঐতিহাসিক স্থান, স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। এসবের কিছু সংরক্ষণ করা হলেও এখনো অনেক প্রাচীন নিদর্শন রয়েছে, যা অনেকের অজানা। তেমনই এক নিদর্শন পাশাপাশি থাকা ৩৬৫টি পুকুর। চক-চান্দিরা গ্রামের উত্তরে রামপ্রসাদ ও দক্ষিণে কামারপাড়া গ্রামের ত্রিমোহনী মোড় পর্যন্ত প্রায় ছয় কিলোমিটারজুড়ে পুকুরগুলোর অবস্থান। বহুকাল আগে খনন করা এসব পুকুরের পাড়জুড়ে করা হয়েছে বনায়ন।

ইতিহাস এবং প্রত্নতত্ত্ববিদদের মত

পুকুরগুলো নিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ‘রূপকথার গল্প’ ফিরলেও এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। বরেন্দ্র অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন নিয়ে লেখালেখি করে আসছেন ধামইরহাট এম এম ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও ইতিহাস-গবেষক শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, পুকুরগুলো পাল শাসনামলে খনন করা হয়ে থাকতে পারে। পাল শাসক দেবপাল অথবা তাঁর পরের শাসক মহীপালের সময়ে কোনো এক রাজা এসব পুকুর খনন করে থাকতে পারেন। প্রায় ৫০ বছর আগেও ইসবপুর ইউনিয়নের চক-চান্দিরা ও ধুরল গ্রামের মাঝামাঝি একটি জায়গায় ঢিবি (ছোট পাহাড়) ছিল। একসময় সেই ঢিবি খুঁড়ে স্থানীয় লোকজন ইট খুলে নিয়ে যায়। সম্ভবত সেটা কোনো রাজার বাড়ি ছিল। ৫০ থেকে ৬০ বছর আগেও পুকুরগুলোয় ইট দিয়ে বাঁধানো ঘাট ছিল।

শহিদুল ইসলাম আরও বলেন, পুকুরগুলো যেখানে, তার পাশেই ঘুকশির বিল। বিলের পূর্ব পাশে পুকুরগুলোর অবস্থান আর পশ্চিমে পত্নীতলা উপজেলার আমাইড় ইউনিয়নের চকগোপাল গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক স্থাপনা যোগীর ঘোপা। কথিত আছে, যোগীর ঘোপা তৃতীয় পাল রাজা দেবপালের রাজভবনের একটি ধ্বংসাবশেষ। পাল রাজাদের রাজত্বকালে, ৮২১ থেকে ৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে, যোগীর ঘোপা প্রসিদ্ধ স্থানের মর্যাদা লাভ করেছিল।

এই ইতিহাস-গবেষকের মতে, খাবার পানি কিংবা কৃষিজমিতে পানির চাহিদা পূরণের জন্য এক জায়গায় একসঙ্গে এত পুকুর খননের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ, চক-চান্দিরা গ্রামের পাশেই ঘুকশির বিল। একসময় সেই বিলে সারা বছরই পানি থাকত। তাঁর মতে, প্রচলিত রূপকথার গল্পে বর্ণিত পুকুর খননের কারণটি সত্য হতে পারে। আবার ধর্মীয় কোনো কারণে একসঙ্গে এত পুকুর খনন করা হয়ে থাকতে পারে।

ওই স্থানে ঐতিহাসিক কোনো নিদর্শন না থাকার সত্যতা জানিয়ে নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক প্রত্নতত্ত্ববিদ ফজলুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, পুকুরগুলো কে, কবে খনন করেছেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। পুকুরগুলোর খনন নিয়ে অনেক গবেষক অনেক মত দিয়েছেন। কোনো গবেষকই সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। তবে মতামতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোস্তাফিজুর রহমানের মতামত। তিনি তাঁর এক গবেষণায় উল্লেখ করেছেন, ধামইরহাটের ইসবপুরে পাশাপাশি যে পুকুরগুলো রয়েছে, সব এক আমলের নয়। কিছু আছে পাল শাসনামলের, কিছু আছে মুসলিম বা মোগল আমলের। একসময় ওই স্থানে বেশ ঘনবসতি ছিল। কৃষি সহায়ক হিসেবে এবং খাবার পানির চাহিদা মেটাতে পুকুরগুলো খনন করা হয়েছিল।

সরেজমিন এক দিন

সম্প্রতি চক-চান্দিরায় গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে ঘুকশির বিলের পাশে জালের মতো ছড়িয়ে আছে পুকুরগুলো। পুকুরগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে আছে। একটি পুকুরের পাড়ের সঙ্গে আরও দুটি, তিনটি কিংবা চারটি পুকুর লাগানো। পুকুরপাড়ে লাগানো সারি সারি বনজ গাছ পুকুরঘেরা গ্রামটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে। পুকুরগুলোর পাড় ঘিরে করা হয়েছে বনায়ন। আকাশমণি, জারুল, অর্জুনসহ বিভিন্ন বনজ গাছের মধ্যে ছোট-বড় পুকুরগুলো দেখা যাবে। বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির পাশে সুবজে ঘেরা সারি সারি পুকুর এক অন্য রকম নৈসর্গিক সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। ছায়াশীতল পথ, বন, জলরাশি ও পাখির কলতান—জায়গাটিতে পা দেওয়ামাত্র মন ভালো হয়ে যাবে যে কারও।

চক-চান্দিরা গ্রামের ষাটোর্ধ্ব গফুর মণ্ডল বলেন, ‘পুকুরগুলা কবে খুঁড়িছে, কেউ কইতে পারে না। হামাগের বাপ-দাদাদের কাছ থেকে গল্প শুনছি, একটা রাজা নাকি রানির অসুখ সারাতে পুকুরগুলা খুঁড়িছে। হামরা ছোটবেলা দেখিছি, বড় বড় পুকুরে শানবাঁধানো ঘাট আছিল। ধীরে ধীরে সেই ঘাটগুলা নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষজন ঘাটের ইট খুলে নিয়ে গেছে।’

একসঙ্গে এত পুকুর সত্যিই বিস্ময়ের ব্যাপার উল্লেখ করে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ইসবপুর ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোরশেদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, প্রাচীন আমলে খনন করা পুকুরগুলো এখনো রয়ে গেছে। পুকুরগুলোর চারপাশে বন বিভাগের পক্ষ থেকে বনায়ন করা হয়েছে। এতে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আরও বেড়েছে। এ স্থানে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে।

জীবন-জীবিকা ও পর্যটন

পুকুরগুলো জীবন ও জীবিকার উৎস হয়ে উঠেছে ইসবপুর ইউনিয়নের চক-চান্দিরা, কামারপাড়া ও রামপ্রসাদ গ্রামের কয়েক শ পরিবারের। সরকারি এসব পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন বহু মানুষ। এ ছাড়া পুকুরপাড়ে ২২০ একরজুড়ে বন বিভাগের করা সামাজিক বনায়ন প্রকল্পের সদস্য হয়েও লাভবান হচ্ছেন এলাকার মানুষ।

চক-চান্দিরা গ্রামের বাসিন্দা ও ইসবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ হোসেন ২০ বছর ধরে সরকারি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন। বর্তমানে তিনি ইজারা নেওয়া তিনটি পুকুরে মাছ চাষ করছেন। তিনি বলেন, চক-চান্দিরা পশ্চিম ও পূর্বপাড়া, রামপ্রসাদ, কামারপাড়া গ্রামের শতাধিক পরিবার সরকারি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন। আবার যাঁরা একটু অসচ্ছল, তাঁরা মৎস্যজীবী সমিতি করে পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করছেন।

ধামইরহাট উপজেলা বন বিট কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, চক-চান্দিরা মৌজায় পাশাপাশি সরকারি ৩৬৫টি পুকুরের পাড় এবং পতিত জমিতে নব্বইয়ের দশকে প্রথম সামাজিক বনায়ন করা হয়েছে। বর্তমানে সেই সামাজিক বনায়নের সদস্য বা উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০০। ওই এলাকার প্রতিটি পরিবার থেকে একজন করে সদস্য রয়েছেন। সর্বশেষ ২০০৭ ও ২০০৮ সালের দিকে ওই বনায়নের গাছ কাটা হয়। সেই সময় একেকজন উপকারভোগী সাত থেকে আট লাখ করে টাকা পেয়েছেন। পুকুরপাড় ঘিরে বর্তমানে যে বনায়ন রয়েছে, সেখানে আকাশমণি, জারুল ও অর্জুনগাছই বেশি।

৩৬৫টি পুকুর ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে স্থানীয় প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনার কথা জানা গেল। ধামইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফুল ইসলাম বলেন, ওই স্থানকে পর্যটনের উপযোগী করতে সবার আগে প্রয়োজন যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা। সে জন্য রাস্তা নির্মাণে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য গোলঘর, ছাতা-ছাউনি ও বসার জন্য বেঞ্চের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও অন্য অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।