শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে থাকা ভবনে ‘নেশার আড্ডা’

কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় ভবনটি নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ফাইল ছবি

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টি টেকনোলজি (এফইটি) বিভাগের ‘টি ওয়ার্কশপের’ নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২১ সালের মার্চ মাসে। তবে নির্মাণের প্রায় আড়াই বছর হতে চললেও ভবনটি পড়ে আছে। কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় ভবনটি নেশাগ্রস্ত ব্যক্তিদের আড্ডাখানায় পরিণত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখা সূত্রে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন একাডেমিক ভবন থেকে অনেকটা দূরে সৈয়দ মুজতবা আলী হল-সংলগ্ন একটি টিলায় প্রায় ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘টি ওয়ার্কশপ’ নির্মাণ করা হয়। ২০২০ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০২১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি শেষ হয়। টিনের চারচালা ছাদ ও চারপাশে ইটের দেয়াল দিয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে পাঠদানের জন্য।

এ বিষয়ে এফইটি বিভাগের প্রধান জি এম রবিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যে স্থানে ওয়ার্কশপটি নির্মাণ করা হয়েছে, সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস থেকে কিছুটা দূরে এবং সেখানে নিরাপত্তাসংক্রান্ত সমস্যাও আছে। ভবনটি নির্মাণকালে বলা হয়েছিল, ২৪ ঘণ্টা সেখানে নিরাপত্তাসুবিধা নিশ্চিত করা হবে, কিন্তু সেটা করা হয়নি। তাই দামি যন্ত্রপাতি ওয়ার্কশপে রাখা হয়নি। তবে ওয়ার্কশপটি দ্রুত চালুর ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

গত ২৬ জুলাই বেলা সাড়ে তিনটার দিকে গিয়ে দেখা যায়, ভবনের বারান্দায় বসে দুজন নিরাপত্তাপ্রহরী মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। ভবনের মূল দরজায় তালা দেওয়া। চারপাশে জানালার গ্লাস ভাঙা। সামনের দিকে একটি জানালার গ্রিল কাটা। ভেতরে ধুলা জমে রয়েছে। আশপাশে পড়ে আছে সিগারেটের পরিত্যক্ত প্যাকেট। দেয়ালে শেওলা জমেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভবনের ভেতরে-বাইরের ইলেকট্রনিক তার, বাতিসহ বিভিন্ন সামগ্রী চুরি হয়ে গেছে। অনেক বৈদ্যুতিক সুইচ ভাঙা।

নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, সকাল ৮টা থেকে বেলা ২টা এবং বেলা ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পালাক্রমে দুজন নিরাপত্তাকর্মী এফইটি বিভাগ নির্মিত ওয়ার্কশপের সামনে পাহারা দেন। তবে রাত ১০টার পর থেকে কোনো নিরাপত্তাপ্রহরী ভবনে পাহারার কাজে থাকেন না। এ সময়টাতেই বখাটে ও মাদকসেবীরা ভবনের ভেতরে ঢুকে আড্ডা জমায় বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চুরি হওয়ার কাজও বখাটেরাই করেছে। এ ছাড়া অব্যবহৃত অবস্থায় থাকায় ভবনটিও জৌলুশ হারাচ্ছে।

একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অভিযোগ, পর্যাপ্ত বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়াই ওয়ার্কশপটি বিভাগের অনেক দূরে একটি টিলায় স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সেখানে যেতে নারাজ।

এ ছাড়া স্থানটি টিলা এলাকা হওয়ায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবও বোধ করছেন তাঁরা। একই কারণে ল্যাবের দামি যন্ত্রপাতিও চুরি হওয়ার আশঙ্কায় বিভাগের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ওই ওয়ার্কশপে রাখতে চাইছেন না। এসব কারণে ভবনের নির্মাণকাজ অনেক আগে শেষ হলেও ওয়ার্কশপটি অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। বিষয়টি দুর্ভাগ্যজনক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এফইটি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, সরকারি টাকা অপচয়ের একটা দৃষ্টান্ত হচ্ছে এফইটি বিভাগের টি ওয়ার্কশপ। পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া মূল ক্যাম্পাসের বেশ দূরে ভবনটি খেয়ালখুশিমতো কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া এখানে কর্তৃপক্ষ পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও রাখেনি। এর ফলে ভবনটি প্রায় আড়াই বছর ধরে অনেকটা ‘পরিত্যক্ত’ অবস্থাতেই রয়েছে। রাতের বেলা প্রায়ই ভবনের জানালার গ্রিলের কাটা অংশ দিয়ে বহিরাগত ব্যক্তিরা ভেতরে ঢোকেন। তাঁরা গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করেন।

যোগাযোগ করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘যথাসময়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে কী কারণে এখানে শ্রেণি কার্যক্রম শুরু হয়নি, সেটা সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃপক্ষ বলতে পারবে। তবে শুনেছি, পরিত্যক্ত থাকায় ভবনের অনেক জানালার কাচ কে বা কারা ভেঙে ফেলেছে। এমনকি বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও চুরি হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ–উপাচার্য মো. কবীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘সহ–উপাচার্য পদে আমি নতুন যোগদান করেছি। তাই এফইটি বিভাগের টি ওয়ার্কশপ নির্মাণের পর থেকেই যে পরিত্যক্ত রয়েছে, সেটা জানা নেই। তবে বিষয়টি দ্রুতই খোঁজ নিয়ে দেখব।’