বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাদী থেকে আসামি

default-image

সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম হত্যা মামলা সাড়ে পাঁচ বছর পর গত ১২ মে নতুন মোড় নেয়। বাবুল বাদী থেকে হয়ে যান আসামি। হত্যার পরপর বাবুল বাদী হয়ে করা মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সেদিনই চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন মাহমুদার বাবা মোশারফ হোসেন। এই ঘটনার এক দিন আগে (১১ মে) বাবুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পিবিআই চট্টগ্রাম কার্যালয়ে আনা হয়। মামলা করার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

এখানেই শেষ নয়, এ বছরের ১১ মে বাবুলের ব্যবসায়িক অংশীদার সাইফুল আলম ও আল মামুন সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন আদালতে। তাঁরা বলেন, স্ত্রী মাহমুদাকে খুন করতে বাবুল আক্তার সাইফুলকে তিন লাখ টাকা দিতে বলেন মামুনকে। মামুন এই টাকা বাবুলের সোর্স মুছাকে বিকাশের মাধ্যমে দেন। সর্বশেষ ২৩ অক্টোবর বাবুলের আরেক সোর্স (তথ্যদাতা) এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা আসামি হিসেবে জবানবন্দি দেন। তিনি বলেন, বাবুলের নির্দেশে তাঁর সোর্স কামরুল শিকদার ওরফে মুছার নেতৃত্বে মাহমুদাকে খুন করা হয়। সেই মুছাও এখনো নিখোঁজ।

বাবুল আক্তার বর্তমানে ফেনী কারাগারে রয়েছেন। ২০১৬ সালের ৫ জুন ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে গিয়ে নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় খুন হন মাহমুদা খানম। এর আগে চট্টগ্রামে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাবুল আক্তার।

আয়নাবাজির ‘বাস্তব’ কাহিনি

আয়নাবাজি সিনেমার কথা নিশ্চয়ই মনে আছে পাঠক। চলচ্চিত্রের মূল চরিত্র আয়না কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বদলে ভাড়ায় জেল খাটতেন। অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ছিলেন আয়নার চরিত্রে। বাস্তবে সেই আয়নাবাজির মতোই কাহিনি ছিল মিনু আক্তার (৩০) নামের এক নারীর। খুনের মামলায় আসামি না হয়েও প্রায় তিন বছর কারাভোগ করে গত বছরের ১৬ জুন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান মিনু।

মুক্তির পর মিনু প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মর্জিনা আক্তার নামের পূর্বপরিচিত এক নারী কুলসুমা নামের আরেক নারীর হয়ে সাজা খাটতে টাকার বিনিময়ে তাঁর সঙ্গে মৌখিক চুক্তি করেন। তিনি কুলসুমাকে চিনতেন না। প্রথমে কিছু টাকা দেন, কিন্তু পরে বাকি টাকা দেননি। ভয়ে তিনি কাউকে কিছু বলেননি।

কারামুক্তির ১৩ দিনের মাথায় ২৮ জুন দুর্ঘটনায় আহত হয়ে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন তিনি। ‘সাজা কুলসুমার, খাটছেন মিনু’ শিরোনামে গত ২৩ মার্চ প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

default-image

প্রকৃত আসামি কুলসুমা আক্তার এক পোশাককর্মী খুনের মামলার সাজা হওয়ার আগে ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। সাজা হওয়ার পর ২০১৮ সালের ১২ জুন কুলসুমা সেজে মিনু কারাগারে আসেন। পরে পুলিশ প্রকৃত আসামি কুলসুমাকে গ্রেপ্তার করে।

এদিকে এক আসামি আরেকজনের নাম-ঠিকানা যাতে ব্যবহার করতে না পারেন, দেশের থানা ও কারাগারে আসামির তথ্য সংরক্ষণে গত সেপ্টেম্বরের বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, বিষয়টি চালুর প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে আসামি না হয়েও নামের মিল থাকায় ১৬ মাস ধরে কারাভোগ করা নিরপরাধ হাসিনা বেগমকে (৪০) গত বছরের ২১ মে মুক্তির নির্দেশ দেন আদালত। এর আগে ১৭ মে প্রথম আলোতে ‘নামের মিলে এক নারীর সাজা খাটছেন আরেকজন’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নগরের কর্ণফুলী থানার একটি মাদক মামলায় সাজা খাটছেন হাসিনা বেগম নামের এক নারী। পরে পুলিশ হাসিনা আক্তার নামের প্রকৃত আসামিকে গ্রেপ্তার করে।

জেলারের কোটি টাকার দুর্নীতি

চট্টগ্রাম কারাগারের সাবেক কারাধ্যক্ষ (জেলার) সোহেল রানা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে গত ২৯ নভেম্বর ৪০ লাখ ২৭ হাজার ২৩৩ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ২৩৫ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে যাওয়া ময়মনসিংহগামী বিজয় এক্সপ্রেস থেকে নগদ ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার ‘অবৈধ’ টাকা ও ফেনসিডিলসহ তাঁকে আটক করে রেলওয়ে পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে।
কারা অধিদপ্তরের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শামসুল হায়দার সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বপরায়ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগে প্রাধান্য না দিলে কারাগারে টাকার খেলা বন্ধ হবে না। পাশাপাশি নিরাপত্তা, একজনের বদলে আরেকজনের কারাভোগের ঘটনা যাতে না ঘটে, সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম কারাগারে নির্মাণাধীন একটি ভবনের চারতলা থেকে লাফ দিয়ে এক বন্দী পালানোর ঘটনাটি ছিল আলোচিত। পরে ৯ মার্চ নরসিংদী থেকে পালানো বন্দী ফরহাদ হোসেন রুবেলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৬ মার্চ এই ঘটনা ঘটেছিল। তৎকালীন জেল সুপার ও জেলারের গাফিলতিতে বন্দী পালানোর সুযোগ পান বলে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়। পরে গ্রেপ্তার করা হয় ফরহাদকে। এখন তিনি কারাগারে রয়েছেন।

অস্ত্রধারী শনাক্ত হয়নি

২৭ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনের দিন পাথরঘাটা এলাকায় গুলি ছুড়তে থাকা পিস্তল হাতে যুবকের ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর নাম আ ফ ম সাইফুদ্দিন। তিনি চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি। ওই দিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় একটি গলিতে কালো প্যান্ট ও জ্যাকেট পরা সাইফুদ্দিনকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে জানান কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নেজাম উদ্দিন।
একই দিন দিন খুলশীতে একটি ভোটকেন্দ্রের সামনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে গুলিতে আলাউদ্দিন নামের দিনমজুর নিহত হন। এর আগে ১২ জানুয়ারি পাঠানটুলি ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ও বিদ্রোহী কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে গুলিতে নিহত হন আজগর আলী নামের এক মহল্লা সরদার। দুটি ঘটনার ভিডিও পুলিশ উদ্ধার করলেও অস্ত্রধারীকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।

আলাউদ্দিনের মা আছিয়া খাতুন বলেন, ছেলের দুই বছর বয়সী কন্যা জান্নাত আরাকে বলতে পারি না তার বাবার খুনিদের বিচার হয়েছে। সে বড় হলে তাকে কী জবাব দেব।
প্রকাশ্য অস্ত্রধারী ও খুনের ঘটনায় ব্যবহার করা অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে না পারা দুঃখজনক মন্তব্য করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অস্ত্রধারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে। নতুন বছরে এসব ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। নইলে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন