কাজের ফাঁকে গল্প হয় খোকন ও রিতা রানী পালের সঙ্গে। কথায় কথায় খোকন পাল বলেন, ‘আগে এই গ্রমের ৪০-৪৫ পরিবার মাটির কাজ করত। অনেকেই দেশ ছেড়েছে। অনেকে এই পেশায় নেই। কেউ কেউ একটু-আধটু মাটির কাজ করলেও সঙ্গে অন্য কাজ করছে। আর নতুন করে এখন এই পেশাতে কেউ আসতে চায় না। অনেক খাটুনি, তার ওপর অভাব ছাড়ে না। এত কষ্ট করে আসবে কেন? আমাদের বুড়ো গ্রুপ চলে গেলে এই গ্রামে এই পেশা শেষ।’

এই পেশার অনিশ্চয়তা নিয়ে খোকন পাল বলেন, ‘ছয় মাসের ব্যবসা। এখন একটু আয় হবে। পরানে খাতি চাইলি খাওয়া যাবে। জ্যৈষ্ঠি মাস পার হইয়ে গেলি পরান তো পরান! এমনি ঠিকঠাক খাওয়া জোটবে না। বর্ষাকালে মাল গড়া যায় না। বিক্রি থাকে না। তখন সবাই কামাই ভাইঙে, খাবে। ধানাই-পানাই করে চলবে তখন। কাউকে ভ্যান চালাতে হবে। কেউ দোকানের কাজে যাবে। কেউ দিনমজুরি করবে।’

শহর লাগোয়া এই গ্রামের মৃৎশিল্পীদের প্রধান সংকট এখন মাটির। গ্রাম লাগোয়া শিরোমণিতে কেডিএর আবাসিক এলাকা হওয়ার পর থেকে মাটির সংকট বেড়েছে। এর আগে শিরোমণির আশপাশ থেকে কাঠা হিসেবে মাটি কিনতেন। জমির ওপরের মাটি এক-দেড় ফুট কেটে নেওয়ার জন্য মালিকের সঙ্গে চুক্তি হতো। এখন কেউ মাটি দিতে চায় না। দূরদূরান্ত থেকে তাঁদের মাটি কিনতে হচ্ছে। আবার গত কয়েক বছরে মাটির দাম দ্বিগুণ বেড়েছে। ১০০ ঘনফুট মাটির দাম এখন তিন হাজার টাকা হয়ে গেছে। তার ওপর মাটির মান খুব খারাপ। কালো মাটি দিয়ে কিছু হয় না। যখন আগুনের তাপ লাগে, তখন চটে চটে যায়। সবাই আবার মাটি পাচ্ছেও না।

খোকন পালদের একান্নবর্তী পরিবারে সদস্য ছিল ১৭ জন। তখন মাটির পাত্রের চাহিদাও ছিল। সেই সময়ের সুখস্মৃতি রোমন্থন করে খোকন পাল বলেন, বড় পরিবার নিয়েও আগে চলতে অসুবিধা হতো না। ধারদেনা ছিল না। মাটি মিলত। মাটির দাম কম ছিল। জ্বালানির দাম কম ছিল। বেচাবিক্রি ভালো ছিল। এখন চারজনের সংসার নিয়েই দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়।

কাজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে খোকন-রিতা দম্পতি বলেন, মাটির কাজের জন্য আঠালো (এঁটেল) মাটি দরকার। মাটিতে পানি ঢেলে সঙ্গে সামান্য বালু মেশানো হয়। এরপর কোদাল দিয়ে কুচাতে হয়। মাটি থেকে সব ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। পরে পা দিয়ে মাড়িয়ে তৈরি করা হয় মাটির মণ্ড। এরপর আরও কিছু প্রক্রিয়া শেষ করে ছাঁচের মধ্যে দেওয়া হয়। পরে শুকাতে, ওলটাতে হয়। মসৃণ করতে হয়। কয়েকবার রোদ খাওয়ানোর পর নির্দিষ্ট নিয়মে আগুনে জ্বাল দিতে হয়।

প্লাস্টিক আর অ্যালুমিনিয়ামের দাপটে মাটির পাত্রের চাহিদা এখন তলানিতে। মাটি খারাপের কারণে চাক দিয়ে কলস আর হাড়ি গড়া ছেড়ে দিয়েছেন। আগে পাখি, খেলনা এসব বৈশাখী ও ঈদের মেলায় খুব চলত। গত কয়েক বছর ঈদ মেলা, বৈশাখী মেলা না হওয়ায় এসব তাঁরা তৈরি করছেন না। তবে এখন দইয়ের পাত্রটা বেশি চলে। পিঠার ছাঁচ, মলসা, কবুতরের ডিম পাড়া পাত্র এসবও মাঝেমধ্যে চলে। ১ কেজি দই ধরে এ রকম একটা পাত্রের দাম এখন চার টাকা। আর আধা কেজির দইয়ের একটা পাত্র থেকে পান মাত্র আড়াই টাকা।

রিতা পাল বলেন, ‘যে কষ্ট তাতে পয়সা নেই। তৈরি আর পোড়ানোর সময় অনেক নষ্ট হয়। বৃষ্টির সময় ওঠাতে পারলাম না, তো গলেই গেল। বর্ষাকালে উঠাতি–নামাতি একটা মালে কুড়িবার হাত পড়ে। মোটকথা, এ কাজে বিশাল কষ্ট। অনেক সময় এমন মনে হয়, আর পারতিছি নে, অন্য কিছু কইরে খাতি পারতাম!’

পাঁচজনের সংসার রিতাদের। মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। একমাত্র ছেলের মুদিদোকান আছে। শাশুড়ির হাত ধরে কাজ শেখা রিতা রানী বলেন, ‘ছেলে-বউমা কেউ এ কাজ পারে না। করতে চায়ও না। আমরা বুড়োবুড়ি দুজন করি। বাইরে কাজ করার অভ্যাস নেই। পারি না। শিখিছি এই। লস হলেও এই কাজ, লাভ হলেও এই কাজ করতি হয়। এত কষ্টে থাকি, কোনো সাহায্যও তো কেউ করে না।’

খুলনার মহেশ্বরপাশা পালপাড়ায় রিতা রানীর বাবার বাড়ি। ৩৬ বছর আগে ক্লাস নাইনে পড়ার সময় বিয়ে হয়েছে। বাবার বাড়ির কেউ এখন আর এ দেশে নেই। রিতাদের অনেক স্বজনও এখন আর এই দেশে বাস করেন না। এই পাড়ার অনেকেও। তবে রিতারা দেশ ছাড়তে চান না।

কণ্ঠে প্রত্যয় নিয়ে রিতা বলেন, ‘অনেকে চলে গেছে। সেটা যার যার রুচি। আমরা মাতৃভূমি ছাড়ব না।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন