এবার তেঁতুলিয়ায় রাজসিক সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে টিউলিপ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শারিয়ালজোত ও দর্জিপাড়া এলাকায় ক্ষুদ্র চাষিদের বাগানে ফুটেছে নানা রঙের টিউলিপছবি: প্রথম আলো

সূর্যের আলো ও তাপ নিয়ন্ত্রণ করা বিশেষ ছাউনির নিচে সারি সারি টিউলিপ ফুটেছে। রাজসিক সৌন্দর্যের এ ফুল ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। শীতের দেশের এই ফুল উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় ফুটেছে। দেখতে দর্শনার্থীরা ছুটে যাচ্ছেন সেখানে। কেউ ছুঁয়ে দেখছেন, কেউ ছবি তুলছেন আবার কেউ ভিডিও কলে বন্ধু-স্বজনদের দেখাচ্ছেন টিউলিপের সৌন্দর্য।

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার শারিয়ালজোত ও দর্জিপাড়া এলাকায় ক্ষুদ্র চাষিদের টিউলিপবাগানে এখন প্রতিদিনই এমন দৃশ্য দেখা যায়। নিজেদের বাগানে ফোটা এমন মায়াবী ফুলের চাহিদা আর কদর দেখে এখন টিউলিপ চাষেই স্বপ্ন বুনতে শুরু করেছেন তেঁতুলিয়ার চাষিরা।

হিমালয় কন্যাখ্যাত শীতপ্রবণ জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় এবারই প্রথম ক্ষুদ্র চাষিদের মাধ্যমে খামার পর্যায়ে শুরু হয়েছে টিউলিপের চাষ। পরীক্ষামূলকভাবে টিউলিপ উৎপাদনের এ উদ্যোগ নিয়েছে বেসরকারি সংস্থা ইকো সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও)। প্রকল্পটিতে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে পল্লী কর্ম–সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

আমি টেলিভিশন বা ইউটিউবে টিউলিপ দেখেছি। কিন্তু এভাবে কখনো টিউলিপ ছুঁয়ে দেখিনি। সত্যিই টিউলিপ একটা আকর্ষণীয় ফুল। তেঁতুলিয়ায় টিউলিপ চাষ হচ্ছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগছে।
জুয়াইরিয়া, ফুল দেখতে আসা কলেজছাত্রী

বছরের প্রায় চার মাস পঞ্চগড়ে শীতের আবহাওয়া থাকায় জেলাটিতে বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ চাষের সম্ভাবনা দেখছেন উদ্যোক্তারা। সেই সঙ্গে টিউলিপ তেঁতুলিয়ার পর্যটনের একটি অনুষঙ্গ হিসেবে যুক্ত হবে বলে আশা তাঁদের।

টিউলিপ ফুল চাষের ক্ষেত্রে দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনশীল হিসেবে ধরা হয়। তাপমাত্রা এর চেয়ে বেশি হলে পূর্ণ বয়সের আগে মানসম্মত ফুল নাও ফুটতে পারে। স্বাভাবিকভাবে রোপণের ১৮ থেকে ২০ দিনের মধ্যে কলি আসতে শুরু করে এবং ২৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত ফুল স্থায়ী হয়। অনেক সময় আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে ব্যতিক্রমও হতে পারে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শীতপ্রধান এলাকা হিসেবে তেঁতুলিয়া উপজেলাকে নির্বাচন করেছে ইএসডিও। ১ জানুয়ারি উপজেলার শারিয়ালজোত ও দর্জিপাড়া গ্রামের ৮ নারী চাষির ৪০ শতক জমিতে নেদারল্যান্ডস থেকে আনা ৬ প্রজাতির ৪০ হাজার টিউলিপগাছের বাল্ব (বীজ হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত কাণ্ড) রোপণ করা হয়। এই ফুল ফোটাতে ব্যবহার করা হয়েছে উচ্চ কৃষিপ্রযুক্তি। ফুলগুলো একটি ছাউনির নিচে চাষ করা হচ্ছে। ছাউনিটি একটি বিশেষ ধরনের পলিথিন দিয়ে ঢাকা। এর চারপাশ ঢাকা ছোট ছিদ্রযুক্ত জাল দিয়ে। বিশেষ পদ্ধতিতে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করা হয় সূর্যের আলো।

শুনেছি, এই ফুল ঠান্ডার দেশে হয়। আমাদের তেঁতুলিয়ায় তো বেশির ভাগ সময় ঠান্ডা অনুভূত হয়, এ জন্য হয়তো এখানেও ভালো টিউলিপ ফুল ফটেছে।
ফুলচাষি সাজেদা বেগম বলেন, ‘

পরীক্ষামূলক এ প্রকল্পে ২৩ দিনের মাথায় ফুটতে শুরু করে টিউলিপ। নিজের এলাকায় প্রথমবারের মতো টিউলিপের মোহনীয় দৃশ্য দেখে উৎফুল্ল চাষিরা। ৬ প্রজাতির ১২টি রঙের মধ্যে এখন পর্যন্ত ফুটেছে বেশ কয়েকটি ফুল।

ফুল দেখতে আসা কলেজছাত্রী জুয়াইরিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি টেলিভিশন বা ইউটিউবে টিউলিপ দেখেছি। কিন্তু এভাবে কখনো টিউলিপ ছুঁয়ে দেখিনি। সত্যিই টিউলিপ একটা আকর্ষণীয় ফুল। তেঁতুলিয়ায় টিউলিপ চাষ হচ্ছে, এটা ভাবতেই অবাক লাগছে।’

ফুলচাষি সাজেদা বেগম বলেন, ‘শুনেছি, এই ফুল ঠান্ডার দেশে হয়। আমাদের তেঁতুলিয়ায় তো বেশির ভাগ সময় ঠান্ডা অনুভূত হয়, এ জন্য হয়তো এখানেও ভালো টিউলিপ ফুল ফটেছে। ইএসডিও কর্তৃপক্ষ ঢাকার ফুল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব ফুল বিক্রির ব্যবস্থা করে দেবেন বলে জানিয়েছে। ভালো দামে বিক্রি হলে আমরা এর পর থেকে আরও বেশি জায়গাজুড়ে এ ফুলের চাষ করব।’

ইএসডিওর টিউলিপ প্রকল্পের সমন্বয়কারী মো. আইনুল ইসলাম বলেন, নেদারল্যান্ডস থেকে টিউলিপের একেকটি বাল্ব আনতে প্রায় ৬২ টাকা খরচ হয়েছে। পরীক্ষামূলক প্রকল্পটি সফল হলে পরবর্তী সময়ে বৃহৎ আকারে প্রকল্প হাতে নিয়ে কমপক্ষে এক হাজার চাষিকে দিয়ে বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপ ফুলের চাষ সম্প্রসারণ করা হবে। উৎপাদিত এসব ফুল বিক্রির জন্য ইতিমধ্যে ঢাকার ফুল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তেঁতুলিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ইএসডিওর এই টিউলিপ প্রকল্পে চাষিদের নানা রকম পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। এই টিউলিপ চাষ কৃষি বাণিজ্যে ও পর্যটনের নতুন দুয়ার খুলবে বলে আশা।