বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দিনাজপুরে ৬ হাজার ৫৪৬ হেক্টর জমিতে লিচুবাগান রয়েছে ৫ হাজার ৪১৮টি। বসতবাড়ির উঠান ও বাগান মিলিয়ে জেলায় লিচুগাছ আছে সাত লাখের বেশি। গত মৌসুমে উৎপাদিত হয়েছিল ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার মেট্রিক টন লিচু, যা থেকে আয় হয় সোয়া ৪০০ কোটি টাকা।

করোনা পরিস্থিতিতে জনসমাগম এড়াতে গত বছরের মতো এবারও শহরের গোর এ শহীদ ময়দানে বসেছে লিচুর পাইকারি বাজার। গত শনিবার বাজারের উদ্বোধন করলেন দিনাজপুরের জেলা প্রশাসক খালেদ মোহাম্মদ জাকি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ আনোয়ার হোসেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ প্রমুখ।

সম্প্রতি বাজার ঘুরে দেখা যায়, মাঠের দক্ষিণে লিচুর পাইকারি বাজার। আর উত্তর দিকে খুচরা বাজার। কৃষক ও বাগানমালিকেরা লিচু নিয়ে আসছেন, আড়তে দিচ্ছেন। খুচরা বাজারে স্থানীয় ব্যক্তিরা যেমন লিচু কিনছেন, তেমনি চাঁদপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম থেকে পাইকারেরা এসেছেন লিচু কিনতে। লিচু কিনছেন, তুলছেন ট্রাকে।

জেলায় নানা জাতের লিচুর চাষ হলেও এখন বাজারে এসেছে মাদ্রাজি, বেদানা ও বোম্বাই জাতের লিচু। মাদ্রাজি জাতের লিচু প্রতি হাজার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত। বেদানা জাতের লিচু বিক্রি হচ্ছে প্রতি হাজার সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত। বোম্বাই লিচু বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ২০০ থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে মাদ্রাজি লিচু খুচরা বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০টি ১৮০–৩২০ টাকা। বেদানা লিচু বিক্রি হচ্ছে প্রতি ১০০টি সাড়ে ৪৫০–৭০০ টাকা। আর বোম্বাই লিচু বিক্রি হচ্ছে ২৫০–৪৫০ টাকায়।

default-image

বিরল উপজেলার রবিপুর গ্রামের লিচুচাষি শিশির শাহ বলেন, ২৫ একর জমিতে ৮০০ গাছ নিয়ে লিচুবাগান তাঁর। গত বছরের তুলনায় এবার ৬০ শতাংশ গাছে মুকুলই আসেনি। তবে গত বছর যেখানে মাদ্রাজি লিচু ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এবার শুরুতেই সেই লিচু প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে।

সদর উপজেলার মাসিমপুর এলাকার লিচুচাষি মো. হাশিম বলেন, ১০০টি গাছের বাগান তাঁর। সব মিলিয়ে বাগানে খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। কিন্তু ফল এসেছে ৩৮টি গাছে, তা–ও আবার ফলন কম। লিচুর আকারও এবার ছোট। চাষি হাশিমের ভাষায়, ‘এবার লাভ তো দূরের কথা, খরচটাই উঠল না।’

চাঁদপুর থেকে লিচু কিনতে এসেছেন রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, এ বছর লিচুর চাহিদা অনেক বেশি, সে তুলনায় বাজারে লিচু নেই।


এ বছর লিচুর ফলন বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে দিনাজপুর হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক টি এম টি ইকবাল বলেন, লিচুর ফলন কমে যাওয়ার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণকে দায়ী করা যায় না। তিনি বলেন, লিচু পাড়ার সময় অনেকেই গাছের বড় বড় ডাল ভেঙে ফেলেন। সেই ঘাটতি পূরণ হতে কিছুটা সময় লাগে। তা ছাড়া লিচুতে মুকুল আসার সময় শীত বেশি ছিল। ফলে পরাগায়ন ঠিকভাবে হয়নি। ফল যখন পুষ্ট হবে, সেই সময় ছিল প্রচণ্ড খরা। এ কারণে ফলের আকার ছোট হয়ে গেছে। আবার শেষ দিকে হঠাৎ বৃষ্টি বেড়েছে, শিলাবৃষ্টিও হয়েছে। ফলে লিচু ফেটে গেছে। সঠিক সময় সেচ না পাওয়ায় গৌণ খাদ্য উপাদান, যেমন ম্যাঙ্গানিজ, পটাশিয়াম, কপার, জিংক, আয়রন, বোরন—এসবেরও ঘাটতি রয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক প্রদীপ কুমার গুহ বলেন, করোনা পরিস্থিতি এড়াতে লিচুর বাজার এবারও উন্মুক্ত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এবার লিচুর ফলন কম হলেও অর্থনৈতিক বিনিময়ে কোনো ঘাটতি হবে না, চাষিরা ভালো দাম পাবেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় অনাবৃষ্টির কারণে মাটি থেকে গাছের খাদ্য সংগ্রহ বিঘ্নিত হয়েছে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবারই লিচুর এমন ফলন বিপর্যয় হয়েছে। সামনের মৌসুমগুলোতে লিচুর ফলন বিপর্যয় রক্ষায় কৃষকদের নিয়ে প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজনের কথাও জানান তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন