কুমিল্লা টাউন হল

ঐতিহ্যবাহী ভবন ভাঙার তোড়জোড়

১৩৫ বছরের পুরোনো কুমিল্লা টাউন হল ভবন ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষোভে ফুঁসছে বিভিন্ন মহল।

বিজ্ঞাপন
default-image

সামনে সবুজ চত্বর। প্রতিদিন বিকেল ও সন্ধ্যায় স্থানটা থাকে আড্ডামুখর। সবুজ ঘাসে বসে কেউ গলা ছেড়ে গান ধরেন। কেউবা করেন আবৃত্তি। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন কুমিল্লা টাউন হলে এ চিরচেনা এক দৃশ্য। এ যেন কুমিল্লাবাসীর নিশ্বাস নেওয়ার একটুকরো শান্তিনিকেতন। নগরের প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের এই টাউন হলে অবস্থিত বীরচন্দ্র গণপাঠাগার ও নগর মিলনায়তন। ১৩৫ বছরের এই স্থাপনা ভেঙে বহুতল স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষোভে ফুঁসছেন সংস্কৃতিপ্রেমীরা।

এই পরিকল্পনা বাতিলের দাবিতে বুধবার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট বিবৃতি দিয়েছে। এতে বলা হয়, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষাসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত টাউন হল ভবন ভাঙার পরিকল্পনা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের মূলে কুঠারাঘাত। টাউন হল ভবন না ভেঙে সংরক্ষণ করার দাবি জানিয়ে গত মঙ্গলবার বিবৃতি দিয়েছেন দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের বিশিষ্ট ৫০ ব্যক্তি। তাঁরা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের টাউন হল ধ্বংসের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ঐতিহ্যবিনাশী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাতিলেরও আহ্বান জানান।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ে সংস্কৃতিপ্রেমী ও কুমিল্লাবাসীর মতামত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।
মো. আবুল ফজল মীর, জেলা প্রশাসক, কুমিল্লা

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি কুমিল্লা-৬ আসনের সাংসদ আ ক ম বাহাউদ্দিন কুমিল্লা টাউন হলের বর্তমান স্থাপনা ভেঙে নতুন করে বহুতলবিশিষ্ট আধুনিক স্থাপনা করতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে একটি আধা সরকারি পত্র (ডিও) দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় গণপূর্ত বিভাগকে টাউন হল নিয়ে নকশা করার জন্য বলে।

কুমিল্লা টাউন হলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আহসানুল কবীরের লেখা কুমিল্লার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ‘১৮৮৫ সালের ৬ মে কান্দিরপাড়ের ৩ একর ৪৩ শতক জায়গা নিয়ে কুমিল্লা টাউন হল প্রতিষ্ঠিত হয়। হলের প্রতিষ্ঠাতা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজপরিবারের সদস্য মহারাজা বীরচন্দ্র মাণিক্য বাহাদুর। দৃষ্টিনন্দন কারুকাজে ভবনটি নির্মিত। ১৯৩০ সালে এটি প্রথম সংস্কার করা হয়। ২০০২-০৩ সালে এটি পুনরায় সংস্কার করা হয়।

বিভিন্ন সময়ে এই টাউন হলে অহিংস আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, ভাষাসৈনিক শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পঁচাত্তরের পর বাংলাদেশের সরকারপ্রধানেরা বক্তৃতা করেন।

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কুমিল্লার আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু এই টাউন হল। বর্তমানে এর সদস্যসংখ্যা আট শতাধিক। প্রতি দুই বছর পরপর নির্বাচন করা হয়। এতে সাধারণ সদস্যরা ১৫ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মধ্য থেকে একজন সহসভাপতি, একজন সাধারণ সম্পাদক, দুজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হন। কুমিল্লা জেলা প্রশাসক পদাধিকার বলে এ কমিটির সভাপতি। তবে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন সাধারণ সম্পাদক।

টাউন হলটির সাধারণ সম্পাদক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, হলের মিলনায়তনের অবস্থা জরাজীর্ণ। মিলনায়তন নিচু হওয়ায় এতে পানি ঢোকে। ফলে বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণ নিয়ে সংস্কৃতিপ্রেমী ও কুমিল্লাবাসীর মতামত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন