default-image

শেরপুর জেলা শহরের চাল ব্যবসার প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র গোপালবাড়ী বটতলা। এই বটতলা মোড় থেকে সামান্য উত্তর দিকে তাকালেই দেখা যায় সুন্দর কারুকার্য করা দৃষ্টিনন্দন লাল রঙের একটি দোতলা ভবন। এ ভবনের নাম চারু ভবন। দেড় শতাব্দী প্রাচীন শেরপুর পৌরসভার নিজস্ব ভবন। জমিদার–অধ্যুষিত শেরপুরে ৯০ বছর আগে নির্মিত এ ভবনটি এত দিন শেরপুর পৌরসভার কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সম্প্রতি শেরপুর নতুন ভবনে পৌর কার্যালয় স্থানান্তরিত হয়েছে। তবে এখনো চারু ভবনে পৌরসভার পানি শাখাসহ কয়েকটি বিভাগের কাজ চলছে। বর্তমানে এ ভবনটিকে পৌর জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে।

বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ১৮৬৯ সালের ১ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ আমলে নয়আনী বাড়ির জমিদার হরচন্দ্র রায় চৌধুরীর সহযোগিতায় এবং ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে শেরপুরে প্রথম পৌরসভা স্থাপিত হয়। এর প্রথম প্রশাসক ছিলেন জামালপুরের তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক টি এ ডনো। ১৮৬৯ থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শহরের গোপালবাড়ী এলাকার একটি টিনের ঘরে শেরপুর পৌরসভার প্রথম কার্যক্রম শুরু হয়। তদানীন্তন ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৮৬-৮৮ সালে শেরপুর পৌরসভায় নয়আনী বাড়ির জমিদার হরচন্দ্র চৌধুরী স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন। স্বাধীনতা–উত্তরকালে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের নতুন সংবিধানের আওতায় প্রথম অনুষ্ঠিত শেরপুর পৌর নির্বাচনে প্রবীণ জননেতা প্রয়াত খন্দকার মজিবর রহমান এবং প্রয়াত ছাত্রনেতা আমজাদ হোসেন যথাক্রমে চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। শেরপুর পৌরসভার আয়তন ২৪ দশমিক ৭৫ বর্গকিলোমিটার। বর্তমান জনসংখ্যা লক্ষাধিক। ১৯৯৪ সালে এটি প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়। পৌরসভার বর্তমান মেয়র হলেন গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া।

default-image

পৌর ভবনের নাম চারু ভবন রাখার পেছনে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস। জানা যায়, ১৯৩০ সালে হেমন্ত চন্দ্র চৌধুরী চেয়ারম্যান থাকাকালে পৌর ভবনের মূল অংশটি নির্মিত হয়। নির্মাণকাজে ব্যয় হয় ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে পাঁচ হাজার টাকা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া যায়। এ টাকায় ভবনের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন পৌরসভার তদানীন্তন চেয়ারম্যান হেমন্ত চন্দ্র চৌধুরী নিজেই এগিয়ে আসেন। তিনি তাঁর পিতা স্বর্গীয় রায় বাহাদুর চারু চন্দ্র চৌধুরীর নামানুসারে পৌর ভবনটির নাম চারু ভবন রাখার শর্তে অবশিষ্ট পাঁচ হাজার টাকা দান করেন। সেই থেকে শেরপুর পৌর ভবনের নাম চারু ভবন হিসেবে অভিহিত হয়ে আসছে। এই চারু ভবনে চারু চন্দ্র চৌধুরীসহ অতীত ও বর্তমান সময়ের কয়েকজন চেয়ারম্যানের ছবি শোভা পাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন
default-image

লাল রঙের ইটের গাঁথুনি দিয়ে নির্মিত চারু ভবনের দেয়ালের কাজ অত্যন্ত কারুকার্যময়, দৃষ্টিনন্দন ও আকর্ষণীয়। নিচে ও দোতলায় আছে যথাক্রমে পাঁচ ও দুটি কক্ষ। ভবনটির নিচ ও দোতলায় আছে কাঠের তৈরি ৮টি দরজা ও ২০টি জানালা। পৌর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে সংস্কার করে ৯০ বছরের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এই ভবনটিকে সম্পূর্ণ ব্যবহার উপযোগী করে রেখেছে।

বর্তমান মেয়র গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া একজন সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগ ও পৌর পরিষদের সিদ্ধান্তে গত বছরের ২৫ নভেম্বর পৌরসভার ঐতিহ্যবাহী চারু ভবনকে জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। এই জাদুঘরে ১৫২ বছরের প্রাচীন শেরপুর পৌরসভার দুর্লভ আসবাব, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় নানা ছবি, বঙ্গবন্ধু কর্নার, মুক্তিযুদ্ধ কর্নার, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিভিন্ন জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। শেরপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতে এই জেলায় প্রথমবারের মতো জাদুঘরটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এবং দেশ-বিদেশ থেকে আসা পর্যটকেরা এ ভবনটি দেখে শেরপুরের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাবেন। এ ছাড়া জাদুঘরের সামনে একটি মুক্তমঞ্চও স্থাপন করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে পারে।

জাদুঘরের কিউরেটর মেহেদী আলম বলেন, চারু ভবনে স্থাপিত জাদুঘরে প্রায় প্রতিদিনই দর্শনার্থী আসেন। শেরপুর ইতিহাস পরিষদের আহ্বায়ক ফকির আখতারুজ্জামান বলেন, প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী চারু ভবনকে জাদুঘর হিসেবে রূপান্তর করায় এ ভবনটি সংরক্ষণ হবে। সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্ম শেরপুর অঞ্চল সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন