default-image

শ্রমিক বোঝাই হয়ে গেছে। ভটভটি স্টার্ট দেওয়া হয়েছে। চালকের পাশে বসে আছে কিরণ বিশ্বাস। তার সঙ্গে কথা বলা শেষ হয়নি। কিরণ উচ্চমাধ্যমিক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। তার কাছে শেষ প্রশ্ন ছিল, ‘লেখাপড়া শেষ করে জীবনে কী হতে চাও?’ তখন ভটভট শব্দ করে ভটভটি চলতে শুরু করেছে। কিরণ এই প্রতিবেদকের কানের কাছে মুখে এনে সশব্দে বলল, ‘বিয়ে করতে চাই।’

বোঝা গেল কিরণ এখন লেখাপড়া করলেও তার চোখে নতুন কোনো স্বপ্ন নেই। সে নিজেও শ্রমিক। তার স্বপ্নের মানুষ আরেকজন শ্রমিকই হতে পারে। এভাবে বংশপরম্পরায় ওরা শ্রমিকই থেকে যাচ্ছে।

প্রতিদিন এ রকম শ্রমিকবোঝাই ভটভটি বিভিন্ন উপজেলা থেকে রাজশাহী নগরে আসে। সারা দিন শহরে থাকে। শ্রম বিক্রি করে তাঁদের দিন কাটে। দিন শেষে আবার ভটভটিতে চড়ে তাঁরা গ্রামে ফিরে যান। সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে তাঁরা ৩৩০ টাকা মজুরি পান। ৩০ টাকা গাড়িভাড়া যায়। বাকি ৩০০ টাকা থাকে।

এখন রাজশাহী নগরের সমন্বিত নগর উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এ রকম প্রকল্প চলতেই থাকে। এতে বেশির ভাগ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর লোকেরা কাজ করেন। গতকাল শুক্রবার রাজশাহী নগরের কল্পনার মোড় এলাকায় প্রায় ৩০ জন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয়। দু–একজন বাদ দিয়ে সবাই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁদের মধ্যে শুধু একজন লেখাপড়া শিখে অন্য কিছু করার কথা বলেছে। যাঁরা বয়সী শ্রমিক তাঁদের বেশির ভাগই তাঁদের সন্তানদের শ্রমিকজীবন থেকে তুলে এনে নতুন জীবন দিতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

পবা উপজেলার ভুগরোইল সন্তোষপুরের সঞ্চিতা বিশ্বাস (১৮) এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবেন। তাঁরা চার বোন, তিন ভাই সবাই শ্রমিক। এ পর্যন্ত লেখাপড়া করলেও শ্রম বিক্রি ছাড়া আর কোনো কাজের কথা ভাবতে পারছেন না।

আব্রাহাম হেমব্রমের বয়স ১৯ বছর। বাড়ি গোদাগাড়ীর কাঁকনহাট পৌর এলাকার সুরসুনিপাড়ায়। সেখান থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে উপজেলার ঈশ্বরীপুরে মামার বাড়িতে থাকেন। কারণ, ঈশ্বরীপুর থেকে শ্রমিকদের ভটভটিতে ওঠা যায়। সেই ভটভটিতে চড়েই প্রতিদিন রাজশাহী নগরে কাজ আসেন। বাবার মতোই আব্রাহামের জীবনে আর কোনো স্বপ্ন নেই। দিন শেষে তিনি একজন শ্রমিক।

বাসন্তী রানীর বয়স প্রায় ৪০ বছর। স্বামীও তাঁর মতোই শ্রমিক। তাঁদের তিন সন্তান। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। ছোটটা ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ছেলেটা ছোট। বাসন্তী রানীও ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে পারেন না। তবে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করছেন।

শুধু ব্যতিক্রমী বক্তব্য পাওয়া গেল শ্যামলী বিশ্বাসের কাছ থেকে। সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তার বাড়ি পবা উপজেলার বায়া এলাকায়। তার বাবাও শ্রমিক। লেখাপড়া শেষ কী হতে চায়, জানতে চাইলে সে হাসতে হাসতে বলে, ডাক্তার হতে চায়। এ সময় তার পাশে ছিল সঞ্চিতা বিশ্বাস, কিলমা বিশ্বাস ও ঝরনা হেমব্রম। তারা সবাই তার সঙ্গে হেসে ওঠে। এই হাসির কারণ বোঝা গেল না। বোঝা গেল না, শ্যামলীর ডাক্তার হওয়ার কথাটা মন থেকে বলল কি না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন