করোনায় টিউশনি বন্ধ, তাই চলছে না দিন

বিজ্ঞাপন
default-image

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্সের ছাত্র বিপ্লব মিয়ার বাড়ি ঠাকুরগাঁওয়ে। থাকতেন কেরানীগঞ্জের একটি মেসবাড়িতে। ভাড়া দেড় হাজার টাকা। খাবারসহ সব মিলিয়ে মাসে তাঁর খরচ হতো সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। টিউশনির টাকায় চলতেন। বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাতেন। কিন্তু করোনার কারণে বিপ্লবের সব ওলটপালট হয়ে গেছে। কয়েক মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাঁর টিউশনিও বন্ধ হয়ে গেছে। উপার্জনের পথ বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন এই শিক্ষার্থী। বললেন, তিনটি টিউশনি করে ৮ হাজার টাকা পেতেন। এই টাকা থেকে নিজের খরচ বাদে বাকি টাকা বাড়িতে দিতেন। বাবা নেই, বড় ভাই আলাদা থাকেন। বোনের বিয়ে হলেও স্বামীর চাকরি না হওয়ায় সমস্যায় আছেন। ফলে তাঁকেই পরিবারের দেখভাল করতে হয়। টিউশনি না থাকায় ঢাকা ছেড়েছেন আরও আগেই। এখন বাড়িতে কৃষিকাজ করেন। এর মধ্যেই আবার কেরানীগঞ্জ থেকে চার মাসের মেসভাড়ার টাকা চাওয়া হচ্ছে।

মহামারির এই সময় বিপ্লবের মতো টিউশনি করে চলা কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী নিদারুণ কষ্টে আছেন। আবাসিক হলের বাইরে যাঁরা বাসা ভাড়া করে বা মেসে থাকেন, তাঁদের কষ্ট অনেক বেশি। কারণ, ঠিকসময়ে বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। মালিকের চাপ। এই কষ্ট কবে শেষ হবে তা–ও কেউ বলতে পারছেন না।

বর্তমানে সারা দেশে ৪৬টি পাবলিক ও ১০৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সর্বশেষ তথ্য বলছে, অধিভুক্ত ও অঙ্গীভূত কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট সাড়ে ৪৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। এর মধ্যে কত শিক্ষার্থী টিউশনি করে চলেন, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বুয়েট) কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ টিউশনি ও খণ্ডকালীন চাকরি করে চলেন।

সংকট ও শিক্ষার্থীদের টিউশনির কিছুটা ধারণা পাওয়া গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীনের কাছ থেকে। তিনি বললেন, করোনা সংকটের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন, শিক্ষক সমিতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ডিবেটিং সোসাইটির মাধ্যমে আবেদন নিয়ে ইতিমধ্যে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আর্থিকভাবে সহায়তা করা হয়েছে। বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের মাধ্যমেও সহায়তা করা হচ্ছে। একেকজন শিক্ষার্থীকে গড়ে দুই হাজার টাকা দেওয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে গত ১৮ মার্চ থেকে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। আগামী ৬ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধের ঘোষণা থাকলেও এই বন্ধ আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গড়াতে পারে। ফলে শিক্ষার্থীদের সংকট আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

খণ্ড খণ্ড কষ্ট

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতি বিভাগের একজন ছাত্র জানালেন, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্য সেন হলে থাকতেন। গ্রামের বাড়ি মাগুরায়। রাজধানীর হাতিরপুলে সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে পড়িয়ে মাসে সাড়ে ছয় হাজার টাকা পেতেন। এই টাকায় নিজের খরচের পর অবশিষ্ট টাকা বাড়িতে পাঠাতেন। বাবা নেই, মা গৃহিণী। ছোট তিন বোন পড়াশোনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে টিউশনি ও হল বন্ধ থাকায় তিনি গ্রামের বাড়িতে আছেন। বললেন, এখন ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে।

গত ২০ মার্চ হল ছেড়ে বাড়ি চলে গেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত চতুর্থ বর্ষের ছাত্র হাসনাইন আহমেদ। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেন বঙ্গবন্ধু হলে। সাভার ও আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় মোট চারটি টিউশনি করাতেন। মাসে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা উপার্জন হতো। বাবা-মা এবং ভাই-বোন মিলিয়ে ছয়জনের পরিবার। বাবাও অসুস্থ। এমন অবস্থায় টিউশনি বন্ধ হওয়ায় সমস্যা হচ্ছে বলে জানালেন তিনি।

>

প্রায় চার মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও টিউশনি বন্ধ। অনেকে নিজের খরচের পাশাপাশি পরিবারকেও সহায়তা করতেন। এখন তাঁরা সংকটে।

বুয়েটের শেরেবাংলা হলের আবাসিক ছাত্র সাকিব মাহমুদ এখন যশোরে বাড়িতে আছেন। তিনি জানালেন, দুটি টিউশনি করে ১৫ হাজার টাকা পেতেন। নিজের খরচ নিজেই বহন করতেন। টাকা উপার্জনের প্রবাহ থাকার পর সেটি বন্ধ হয়ে গেলে যেমন হয় তাঁরও তা–ই হচ্ছে। তবে এখন বাড়িতে থাকায় সমস্যা কম হচ্ছে।

তবে কেউ কেউ অনলাইনেই টিউশনি চালিয়ে যাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের এক ছাত্র জানালেন, তিনি জুম অ্যাপ ব্যবহার করে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন।

করণীয় কী

সংকটে পড়া শিক্ষার্থীদের অনেকে নানাভাবে সহায়তা করছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষার্থীদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষের (৩১ ব্যাচ) প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা। গত এপ্রিল থেকে ৬০ জনকে সহায়তা করেছেন তাঁরা। প্রত্যেককে তিন হাজার করে টাকা দিয়েছেন। এই সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ৩১ ব্যাচের শিক্ষার্থী মো. ইউসুফ প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত যাঁদের সহায়তা করেছেন, তাঁদের অধিকাংশই টিউশনি করে চলতেন। কেউ কেউ খণ্ডকালীন চাকরি করতেন।

করণীয় সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মাহবুবা নাসরীন বললেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। এখন আবার অনলাইনে ক্লাসের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত সহায়তাও দিতে হবে।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট সহায়তার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে তাঁরা প্রস্তাব দিচ্ছেন। আর সংকটে পড়া শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তাদের কল্যাণ তহবিল থেকে প্রয়োজন অনুসারে সহায়তা করতে পারে।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন