করোনাভা্সইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে  সারা দেশে সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে কেউ এ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। শুক্রবার সকালে তোলা ছবি
করোনাভা্সইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে সারা দেশে সরকারিভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবিরে কেউ এ স্বাস্থ্যবিধি মানছে না। শুক্রবার সকালে তোলা ছবিপ্রথম আলো

কক্সবাজার শহর থেকে দক্ষিণে টেকনাফের দিকে ৪৬ কিলোমিটার গেলে উখিয়ার কুতুপালং বাজার। সেখান থেকে পশ্চিম দিকে আরও পাঁচ-ছয় কিলোমিটার গেলে কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৪ আশ্রয়শিবির ও বাজার। এটি গড়ে উঠেছে উঁচু কয়েকটি পাহাড় ঘিরে। পাহাড়ের ঢালুতে বসতি অন্তত ৬০ হাজার রোহিঙ্গার।

গত শুক্রবার দুপুরে উখিয়ার কুতুপালং, মধুরছড়া, লম্বাশিয়া, জুমশিয়া, বালুখালী আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ রোহিঙ্গার মুখে মাস্ক নেই। হাটবাজার, দোকানপাট, রাস্তার গলিমুখসহ বিভিন্ন আড্ডায়ও ব্যাপক লোকসমাগম; সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে না। গাদিগাদি করে লোকজনের বসতি ঝুপড়িঘরে।

দুপুরে আশ্রয়শিবির-৪ বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকজন রোহিঙ্গা পুরুষের মুখে মাস্ক নেই। এর কারণ জানতে চাইলে আবুল কালাম (৪৫) নামের এক রোহিঙ্গা বলেন, ‘করোনারে আঁরা ন ডরাই। মানুষ মরে আল্লাহর হুকুমে।’ অর্থাৎ ‘করোনাকে আমরা ভয় পাই না। মানুষ মারা যায় আল্লাহর হুকুমেই।’

বালুখালীর একটি পাহাড়ের ঢালুতে ত্রিপলের ছাউনির ছোট্ট একটি ঘরে স্ত্রী, তিন ভাইবোন ও চার সন্তান নিয়ে বাস করেন সৈয়দ করিম।
সৈয়দ করিম (৫০) বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বরে এনজিও–কর্মীরা ঘরে এসে পাঁচটি মাস্ক দিয়েছিলেন। কয়েক দিন ব্যবহারের পর মাস্কগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। এরপর থেকে কেউ আর মাস্ক ব্যবহার করেনি। করোনায়ও কেউ আক্রান্ত হয়নি।

বিজ্ঞাপন
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশ পালিয়ে আসে আট লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে আসে আরও কয়েক লাখ।

বালুখালী ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা জাকের হোসেন বলেন, করোনা কী, অধিকাংশ রোহিঙ্গা তা বোঝে না। করোনায় আক্রান্ত হয়েও এ শিবিরে তেমন কেউ মারা যায়নি। তাই রোহিঙ্গাদের মধ্যে করোনার ভয় নেই। এ শিবিরে ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গার বসতি।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ও নির্যাতনের মুখে বাংলাদেশ পালিয়ে আসে আট লাখ রোহিঙ্গা। এর আগে আসে আরও কয়েক লাখ।

বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ।

ঘন বসতিতে থাকা সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে শুরু থেকেই আতঙ্ক ছিল। কারণ, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কারও করোনা শনাক্ত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতো। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। করোনা তেমন প্রভাব ফেলেনি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে।
মাহবুবুর রহমান, সিভিল সার্জন, কক্সবাজার

জেলা সিভিল সার্জন মাহবুবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ঘন বসতিতে থাকা সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে শুরু থেকেই আতঙ্ক ছিল। কারণ, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কারও করোনা শনাক্ত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতো। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টো। করোনা তেমন প্রভাব ফেলেনি রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে।

সিভিল সার্জন আরও বলেন, ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত করোনায় মারা গেছেন ১০ রোহিঙ্গা। আক্রান্ত হয়েছেন ৩৮১ জন। বর্তমানে আইসোলেশন সেন্টারে চিকিৎসাধীন আছেন ৩৮ জন। ক্যাম্পে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ২৬ হাজার ৩২৮ জনের। সর্বশেষ ২০২০ সালের ৩০ অক্টোবর করোনায় মারা গেছেন জামাল হোসেন (৩০) নামের এক রোহিঙ্গা।

সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে মাত্র ২৬ হাজারের নমুনা পরীক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের প্রধান স্বাস্থ্য সমন্বয়কারী আবু তোহা এম আর এইচ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, আগের তুলনায় শিবিরে নমুনা সংগ্রহ অনেক বেড়েছে। আগে দৈনিক ২০-২৫টি নমুনা সংগ্রহ হতো, এখন ৭০-৮০টি। নমুনা সংগ্রহের ২২টি বুথ চালু রয়েছে। তবে ক্যাম্পে কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত ও মৃত্যুর হার দুটিই কমেছে। গত তিন মাসে করোনায় কোনো রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়নি।

আবু তোহা আরও বলেন, গত বছরের ১৪ মে উখিয়ার কুতুপালং আশ্রয়শিবিরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছিল। এরপর অন্তত ১৪ হাজার রোহিঙ্গাকে ১৪ দিনের হোম কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছিল। লকডাউনের সময় শিবিরের অভ্যন্তরে এনজিও কার্যক্রম সীমিত করে রোহিঙ্গাদের চলাচল বন্ধ, স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ, মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক ও লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ করায় ক্যাম্পে করোনার তেমন বিস্তার ঘটেনি। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে শিবিরে শরণার্থীদের সচেতন করতে এখনো নানামুখী প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন