কিনব্রিজ হবে দেশের দীর্ঘতম পদচারী-সেতু?

বিজ্ঞাপন
default-image

প্রায় ৮৬ বছরের পুরোনো লোহার কাঠামোর কিনব্রিজ। নির্মাণের পর মুক্তিযুদ্ধের সময় এক দফা সংস্কার হয়েছিল। পরে রেলওয়ের তত্ত্বাবধানে আরও একবার। সর্বশেষ সংস্কারকাজ শুরু করেছে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ। এ জন্য গত রোববার থেকে সেতু দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। রাতে এক দফা পর্যবেক্ষণ শেষে গতকাল সোমবার থেকে শুরু হয়েছে সংস্কারকাজ।

এদিকে কিনব্রিজকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ। ঐতিহ্যবাহী এ স্থাপনাকে পদচারী-সেতুতে রূপান্তর করা। সিটি মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর মতামতসহ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের প্রকৌশল বিভাগকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। এই প্রস্তাব পাস হলে কিনব্রিজ হবে দেশের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ পদচারী–সেতু।

গতকাল সোমবার যোগাযোগ করলে সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেছেন, কিনব্রিজ প্রতিষ্ঠার বয়স, অবস্থা বিবেচনায় পদচারী-সেতুতে রূপান্তরে দুই পক্ষই রাজি হয়েছে। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বার্থে বিশেষ পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে। সংস্কারকাজ চলাকালে সরেজমিন অবস্থা প্রত্যক্ষ করে পদচারী–সেতুতে রূপান্তরের চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সিলেট নগরকে বিভক্ত করেছে সুরমা নদী। উত্তর ও দক্ষিণ পাড়ের বাসিন্দাদের যোগসূত্র তৈরি করতে ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৩ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল সেতুটি। দৃষ্টিনন্দন সেতুটি নির্মাণকাজ শেষে ১৯৩৬ সালে চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। আসাম প্রদেশের তৎকালীন গভর্নর মাইকেল কিনের নামে এই সেতুর নামকরণ হয় কিনব্রিজ। দিনে দিনে সেতুটি দেশে ও বিদেশে সিলেটের প্রতীক হয়ে ওঠে। তবে দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় সেতুটি যান চলাচলের একেবারেই অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সংস্কারের জন্য ১ সেপ্টেম্বর থেকে কিনব্রিজ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করা হয়।

সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ জানায়, ১ সেপ্টেম্বর যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা হবে, বিষয়টি প্রায় এক সপ্তাহ আগে মেয়র ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর আগে তিনি স্থানীয় সাংসদ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন ও কিনব্রিজ তদারকের দায়িত্বে থাকা সওজ বিভাগের প্রকৌশল বিভাগকেও অবহিত করা হয়। এরপর ৩১ আগস্ট রাত ১২টার পর মেয়র কিনব্রিজ এলাকার দুটি ফটকে লোহার বেষ্টনী দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরদিন রোববার কিনব্রিজ দিয়ে কোনো যানবাহন নয়, চলাচল করেছে শুধু মানুষ। যানবাহনগুলো এখন বিকল্প পথ হিসেবে পশ্চিম ও পূর্ব দিকের দুটি সেতু দিয়ে চলাচল করছে। এক দিন যানবাহন বন্ধ রাখার পর রোববার রাত ১২টার পর শুরু হয়েছে সংস্কারকাজ।

লোহা দিয়ে তৈরি কিনব্রিজ। আকৃতি অনেকটা ধনুকের মতো বাঁকানো। দৈর্ঘ্য ১ হাজার ১৫০ ফুট এবং প্রস্থ ১৮ ফুট। সরেজমিন দেখা গেছে, প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ কিনব্রিজের স্থানে স্থানে পিচ, বিটুমিন, বালু, পাথর ও ইটের খোয়া উঠে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও খানাখন্দ এতই বড় যে সেখানে মাঝেমধ্যে রিকশা ও অটোরিকশা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। পুরো সেতুটি চলাচলের রাস্তা ব্যবহারের অনেকটা অনুপযোগী হয়ে পড়ছে।

>

ঐতিহ্যবাহী এ সেতুটি টিকিয়ে রাখার স্বার্থে এটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করার প্রস্তাব। চলমান সংস্কারকাজ শেষে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

সেতুর কাঠামো নাজুক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যবর্ধন ও আলোকসজ্জার নানা রকম সাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতুর উত্তর ও দক্ষিণ পাশে লাগানো আটটি বড় আকারের লেজার লাইট স্থাপনের জন্য কাচের বক্স স্থাপন করা। এর মধ্যে ছয়টি ভাঙাচোরা এবং বিকল অবস্থায় দেখা গেছে। দুটি কাচের বক্স থাকলেও এর ভেতরে কোনো লেজার লাইটের বাতি দেখা যায়নি। লেজার বাতি রাখার কাচের বাক্সগুলো সব কটিই ভাঙা অবস্থায় আছে। বাক্সের মধ্যে থাকা ছয়টি বাতিও ভাঙা। ছয়টি বাতির মধ্যে চারটির ভেতরে থাকা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বাইরে থেকে দেখা যায়। উত্তর পাশে সেতুর পাটাতনের ওপরে ভেঙে ঝুলে থাকতে দেখা গেছে দুটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। তবে নতুন করে দুটি আইপি ক্যামেরা স্থাপনা করা হয়েছে। সেগুলো দিয়ে নজরদারি করে পুলিশ।

সংস্কারকাজের জন্য কিনব্রিজ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় নগরে ওই এলাকার জনারণ্যে কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে। কিনব্রিজ দিয়ে যানবাহন চলাচল না করলেও মানুষের চলাচল অনেকটা স্রোতের মতো দেখাচ্ছে।

সংস্কারকাজ শেষে আর যান চলাচল করতে না দিলে কিনব্রিজ হবে দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ পদচারী–সেতু। এমনটি জানিয়ে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘কিনব্রিজ সিলেটের একটি প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। কিনব্রিজের ছবি দেখামাত্র যে কেউ বলে দিতে পারেন, এটি সিলেট। তাই এই সেতুকে রক্ষা করতে হবে। কিনব্রিজ রক্ষার স্বার্থে সেতুটি দিয়ে শুধু পায়ে হেঁটে চলাচলের দাবি ছিল। আমিও চাই হেঁটে চলাচলের মধ্যে সচল থাকুক সেটি। এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে সংস্কারকাজ শেষে।’

কিনব্রিজ দিয়ে যান চলাচল বন্ধে নগরের ওপর বাড়তি কোনো চাপ পড়বে কি না, এ প্রশ্নে মেয়র বলেন, এমনিতেই কিনব্রিজ শুধু ছোট ছোট যানবাহন, যেমন রিকশা, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ছিল। এগুলো বন্ধ করলে অন্যান্য সেতুর ওপর চাপ পড়বে ঠিক, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা থাকায় যান চলাচলে সংকট হবে না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন