default-image

কুড়িখাই মেলার ইতিহাস–ঐতিহ্য ৪০০ বছরের আর চৌদ্দমাদলের ৯০ বছরের। কুড়িখাই বসে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে এবং চৌদ্দমাদল মেলা হয় অষ্টগ্রামে। দুই মেলার ভাবধারা সম্প্রীতির ও লোকজ ঐতিহ্য প্রায় অভিন্ন। সময়ের ব্যবধানে মেলা দুটি এখন দুই জনপদের সর্বজনীন উৎসবের রূপ পায়। লাখো মানুষকে একপ্রাণে বাঁধতে মেলা দুটি যেন সম্প্রীতির বার্তাবাহক।

কুড়িখাই মেলা

কুড়িখাই মেলার ইতিহাস ৪০০ বছরের। প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগেও লোকজ সংস্কৃতির ধারায় এগিয়ে চলা মেলাটির আবেদন এতটুকু কমেনি। বরং প্রচার, প্রসার, আগ্রহ, আকর্ষণ, আবেদন বেড়ে চলেছে দিন দিন। মেলাটি বসে কটিয়াদীর মুমুরদিয়া ইউনিয়নের কুড়িখাই গ্রামে। মাঘের শেষ মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া মেলাটির স্থায়িত্ব এক সপ্তাহ।

স্থানীয় লোকজনের মতে, ৩৬০ জন আউয়ালিয়ার শিরোমণি শাহজালাল (রহ.)–এর সফরসঙ্গীদের একজন ছিলেন হজরত শাহ শামছুদ্দিন বুখারী (রহ.)। তিনি তাঁর তিন সঙ্গী শাহ নাসির, শাহ কবীর ও শাহ কলন্দরকে নিয়ে কুড়িখাই আসেন। সময়টি ছিল ১২২৫ সাল। এই জনপদে শামছুদ্দিন বুখারীর আসার কারণ ইসলাম প্রচার। তাঁর মৃত্যুর পর ভক্তরা মাজার প্রতিষ্ঠা করেন। একপর্যায়ে মাজার ঘিরে বছরের নির্দিষ্ট একটি মাসের নির্দিষ্ট বার ধরে ওরস পালন শুরু হয়। মূলত ৪০০ বছর আগে থেকে ওরস ঘিরে মাজারের চারপাশের কৃষিজমিতে শুরু হয় মেলা বসার প্রচলন।

মেলার প্রধান আকর্ষণ মাছ। হাওরের রুই, কাতলা, বোয়াল, আইড়, কালবাউশ, চিতলসহ অন্তত ২০ প্রকারের মাছের বড় সংস্করণের সমারোহ ঘটে। প্রচার আছে, কুড়িখাই মেলায় বোয়াল মাছ খেলে সে বছরের জন্য শনির দশা কেটে যায়। সে কারণে অন্য যেকোনো মাছের তুলনায় বোয়ালের আমদানি বেশি। আবার ক্রেতা ও দামও বেশি। মেলা চলাকালে আশপাশের ৪০ গ্রামের জামাইরা শ্বশুরবাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পাবেন—এটিও রীতি। মেলা থেকে বড় মাছ কিনে জামাইরা তবেই শ্বশুরালয়ে হাজির হবেন এবং ওই মাছ দিয়ে সবাই একসঙ্গে ভূরিভোজ করবেন। ফিরে যাওয়ার সময় জামাইয়ের হাতে মাছ ধরিয়ে দেওয়াও রীতি। সপ্তাহের একটি দিন বউদের জন্য। ওই দিন মেলায় বউ, বিশেষ করে নারীদের রাজত্ব থাকে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সর্বত্র নারীদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠে মেলাস্থল। মেলা উপলক্ষে জামাইদের বিশেষ নিমন্ত্রণ থাকে এবং মাছ কিনে তবেই শ্বশুরবাড়ি যেতে হয় বলে মেলাটি এখন জামাইমেলা হিসেবেও পরিচিতি।

মাছের বাজার ছাড়াও বিন্নিখই, মিঠাইসহ নানা রকম গ্রামীণ খাবারের বিরাট হাট বসে। এ ছাড়া বিনোদনের জন্য সার্কাস, পুতুলনাচ, চরকি, নাগরদোলার আয়োজন থাকে। হস্ত, ইলেকট্রনিকস, আসবাবসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রায় ৩০০ দোকান বসে। থাকে বাউলগানের জন্য স্থায়ী মঞ্চ। উপজেলা প্রশাসন মেলাটি নিয়ন্ত্রণ করে। সরকারকে নির্দিষ্ট টাকা দেওয়ার মাধ্যমে কোনো একটি পক্ষ মেলার ইজারা নেয়।

শহীদ-শাফিয়ার দাম্পত্য জীবন দেড় যুগের। জানালেন, সাংসারিক ব্যস্ততায় শাফিয়ার এখন আর বাবার বাড়ি যাওয়া হয় না। একই অবস্থা শহীদেরও। তবে যত ব্যস্ততা সামনে আসুক না কেন, মেলা চলাকালে স্ত্রীকে নিয়ে শহীদ শ্বশুরবাড়ির পথ হাঁটবেনই। এবারও মেলায় এসেছেন তাঁরা এবং যথারীতি মাছ কিনে নিমন্ত্রণ রক্ষা করেছেন। শহীদ কুমিল্লার রসুলপুর গ্রামের বাসিন্দা। আর শাফিয়া কুড়িখাই গ্রামের আজিম মিয়া তৃতীয় মেয়ে।

বিজ্ঞাপন

চৌদ্দমাদল মেলা

default-image

৯০ বছর আগের কথা। নাম তাঁদের রাধাকান্ত দেবনাথ, নদীয় চাঁদ রায়, রাইচরণ রায় ও প্রকাশ চন্দ্র রায়। কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা অষ্টগ্রামের বাঙ্গালপাড়া গ্রামের সেই সময়কার বাসিন্দা তাঁরা। বাংলা ১৩৩৭ সনের মাঝামাঝিতে এই চারজন ভারতে তীর্থভ্রমণে যান। পশ্চিমবঙ্গে নবদ্বীপ নামে একটি স্থানে গিয়ে দেখতে পান, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন। সেটি উৎসবধর্মী, যা দেখে চারজনই মুগ্ধ হন। উৎসবটির নাম চৌদ্দমাদল। সেখানে বসেই ভাবনায় স্থির হন, গ্রামে ফিরে তাঁরাও চৌদ্দমাদল করবেন। সেই থেকেই চৌদ্দমাদল ধীরে ধীরে ভাটি অঞ্চলের সবচেয়ে বড় উৎসব বা মেলার রূপ পায়। কীর্তন ঘিরে মেলাটি আবির্ভূত হলেও এই মেলা এখন ইতিহাস–ঐতিহ্যের অংশ হয়ে হাওরবাসীর জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে আছে।

কামরুল হাসান বাবু স্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। চৌদ্দমাদল মেলার প্রচার ও প্রসারে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। চৌদ্দমাদল নিয়ে কামরুল হাসানের অনুভূতি সম্প্রীতি–জাগানিয়া। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন হাওর জনপদকে বছরের কয়েকটি দিন এক প্রাণ দেয় এই মেলা।

রীতি অনুযায়ী, মেলাটি বসে মাঘ মাসের ৪ তারিখ। চলে চার দিন। সূচনা বছর থেকেই বাঙ্গালপাড়ায় চৌদ্দমাদল পূজারও আয়োজন করা হয়। কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠা করা হয় একটি মন্দির। নাম নাথ মন্দির। পূজায় কীর্তন হয়। মাদল শব্দের উৎপত্তি মৃদুল শব্দ থেকে। আর মৃদুল শব্দের অর্থ খোল, যা কীর্তনের প্রধান বাদ্যযন্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। রীতি অনুযায়ী, মেলার সূচনা হয় ১৪টি খোল ও বাদ্যযন্ত্র এবং ১৪ জোড়া করতাল একসঙ্গে বাজিয়ে।

মেলা বসে গ্রামটির খেলার মাঠে। দোকানের সংখ্যা ১৫০টির কম–বেশি। মেলা থেকে শিশুদের মাটির পুতুল, ঘোড়ার গাড়ি, বল, বেলুন, বাঁশি, খই মুড়ি, মিঠাই কেনা চাই-ই চাই। গ্রামের বধূ ও কিশোরীরা মেলার মূল আকর্ষণ। দলবেঁধে মেলায় গিয়ে আলতা, পাউডার, কাচের চুড়ি, লিপিস্টিক, খোঁপা, ক্লিপ, কানের দুলসহ প্রসাধনী কেনায় তাঁরা ডুবে থাকেন। মেলায় পাওয়া যায় হরেক রকম গৃহস্থালি পণ্যও। ফলে কৃষকেরা কিনে নিতে পারেন দা, বঁটি, কাস্তে, কুড়ালসহ তাঁদের প্রয়োজনীয় পণ্য।

default-image

সময়ের ব্যবধানে এখন মেলায় আধুনিক পণ্যেরও প্রসার ঘটছে। পাওয়া যাচ্ছে নানা নান্দনিক নকশার খাট, চৌকি, আলনা, চেয়ার, টেবিল, সোফাসেট, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিলসহ নানা আসবাব। মূল্যও তুলনামূলকভাবে সহনীয়।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন