বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কালাইহাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ইউসুফ আলী প্রথম আলোকে বলেন, সকালে বিদ্যালয়ে এসে ধ্বংসযজ্ঞ দেখে নির্বাক হয়ে গেছেন শিক্ষকেরা। কক্ষে বসার কোনো পরিবেশ নেই। বিদ্যালয়ে শিক্ষকেরা এলেও শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। শিক্ষকদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গতকাল সন্ধ্যায় বিজিবির গুলিতে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রিকশাচালক আলমগীর হোসেন (৪০) একজন। দুপুরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র মেয়ে আদরী খাতুনকে বুকে জড়িয়ে বাড়ির উঠানে আহাজারি করছিলেন আলমগীরের স্ত্রী হোসনে আরা বেগম (৩৪)। মেয়ে আদরী খাতুন বলে, মা–বাবাসহ তারা বগুড়া শহরে বসবাস করে। বাবার রিকশা চালানোর টাকাতেই সংসার চলত তাদের। ভোট দিতেই বাবা গতকাল কালাইহাটা গ্রামের বাড়িতে আসেন। তার বাবা দুপুরের আগেই ভোট দেন। ভোটের ফল জানতে সন্ধ্যায় বাজারে যান। ঘণ্টাখানেক পর গুলিতে বাবার মৃত্যুর খবর আসে।

default-image

কালাইহাটা হাটখোলা বাজারে খেতের সবজি বিক্রি করতে এসেছিলেন দিনমজুর খোরশেদ আলী আকন্দ (৬৮)। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও একজন। তিনি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ছিলেন না। তবে বিদ্যালয়ের জানালা দিয়ে বিজিবির ছোড়া গুলিতে তিনিও নিহত হয়েছেন। তাঁর বাড়িতেও চলছিল মাতম। তাঁর ছেলে এরশাদ আকন্দ (৩০) বলেন, দিনমজুরির পাশাপাশি বাবা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষবাস করতেন। বুধবার বিকেলে খেতের শাকসবজি বিক্রি করতে হাটখোলা বাজারে যান। শাক বিক্রি করে বাড়িতে ফেরার পথে তিনি গুলিতে নিহত হন।

সংসারের সওদাপাতি করতে এসছিলেন দিনমজুর আবদুর রশিদ প্রামাণিক (৬০)। তাঁর স্ত্রী বুলবুলি বেগম (৫০) প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামী পেশায় দিনমজুর। অন্যের কিছু জমিজমাও চাষাবাদ করেন। নিজের ভিটেমাটি ছাড়া কোনো সহায়–সম্বল নেই। সংসারে দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে কালাইহাটা দাখিল মাদ্রাসায় দশম শ্রেণিতে এবং ছোট ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে। সংসারের কিছু সওদাপাতি করতে রশিদ হাটখোলা বাজারে যান। বাজার থেকে বাড়িতে ফেরার পথে গন্ডগোলের মধ্যে পড়ে গুলিতে নিহত হন। বড় ছেলে বাবুলও পুলিশের লাঠিপেটায় আহত হয়েছেন।

সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য প্রার্থী জোবেদা বেগমের নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন কুলসুম বেগম (৫০)। তাঁর স্বজন ভানু সরকার (৭০) ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, বিকেল চারটায় ভোট গ্রহণ শেষে গণনা না করেই প্রশাসনের কর্মকর্তারা ব্যালট বাক্স উপজেলা সদরে নেওয়ার প্রস্তুতি নেন। এ সময় জনতা ভোট গণনা করে ফলাফল ঘোষণার দাবি করতে থাকে। একপর্যায়ে ব্যালট বাক্স যাতে উপজেলা সদরে নিতে না পারেন, এ জন্য শত শত নারী-পুরুষ কেন্দ্রের বাইরে সড়ক অবরোধ করেন। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রথমে লাঠিপেটা করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একপর্যায়ে জনতা ভোটকেন্দ্র ঘেরাও করলে পুলিশ-বিজিবি ভোটকক্ষের জানালা দিয়ে বিনা উসকানিতে নির্বিচার ৩০-৪০টি গুলি ছোড়ে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই প্রার্থীর এজেন্ট কুলসুমসহ চারজন নিহত হন। গুলিবিদ্ধ হন আরও কয়েকজন। এ সময় ক্ষুব্ধ জনতা ইটপাটকেল ছুড়ে ভোট কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখে।

default-image

কেন্দ্রে দায়িত্বরত নৌকার এজেন্ট আবদুল গোফফার বলেন, ২০১৬ সালে এই কেন্দ্রে ভোট গণনা না করেই উপজেলা সদরে ব্যালট বাক্স নিয়ে গিয়ে ফল উল্টে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। এবার যাতে কেন্দ্রেই ফল ঘোষণা করা হয়, ভোটাররা সেই দাবি জানাতে থাকলে কর্মকর্তারা তা না শুনে ব্যালট বাক্স গুটিয়ে নিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করার চেষ্টা করেন। জনতা সড়ক অবরোধ করে। এ সময় পুলিশ-বিজিবি জনতাকে লাঠিপেটা করে সরিয়ে দিয়ে কেন্দ্র ত্যাগ করার চেষ্টা করে। জনতা ফল ঘোষণার দাবিতে অনড় থাকলে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেট গুলির নির্দেশ দেন। সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ-বিজিবি নির্বিচার গুলি চালিয়ে মানুষ হত্যা করে। পরে জনতা কেন্দ্র ঘেরাও করে কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে। রাত সাড়ে ১০টায় নৌকার প্রার্থীকে ওই কেন্দ্রে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়, তিনি ওই কেন্দ্রে ১ হাজার ৮৯১ ভোট পান।

তবে কেন্দ্রে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও শাজাহানপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসিফ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ শেষ হলেও নৌকার প্রার্থীর সমর্থকেরা গণনায় বাধা দেন। এ কেন্দ্রে মোট ভোটার ছিলেন ৩ হাজার ২২ জন। এর মধ্যে ভোট দেন ২ হাজার ৩৭০ জন। অন্য কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষে নৌকার সমর্থকেরা এ কেন্দ্রে ভোটের ফলাফল ঘোষণা করতে বলেন। যাতে পিছিয়ে পড়লে এখানে না পড়া ৬৫২ ভোট থেকে প্রয়োজনীয় ভোট যোগ করে তাঁদের বিজয়ী ঘোষণা করা যায়। এতে আপত্তি জানালে নৌকার প্রার্থী ইউনুছ আলী ফকিরের সমর্থকেরা ভোটকেন্দ্রে হামলা চালান। তাঁরা ইটপাটকেল ছুড়ে, ভোটকক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে তাণ্ডব চালান। ইউএনওর গাড়িসহ বিজিবি ও পুলিশের চারটি গাড়ি ভাঙচুর করেন। ইউএনও বলেন, ‘প্রাণভয়ে আমরা ভোটকক্ষের ভেতরে অবস্থান নিই। সেখানেও নৌকার কর্মীরা চড়াও হলে জানমাল রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গুলি ছুড়তে বাধ্য হন।’

এ ঘটনায় চারজন নিহত ছাড়াও গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন আরও চারজন। তাঁরা হলেন দিনমজুর আবদুল (৪০), ছহির উদ্দিন (৬০), শিক্ষার্থী মেহেদী (১৩) ও রাকিব (১৬)। শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক আবদুল ওয়াদুদ প্রথম আলোকে বলেন, রাতে গুলিবিদ্ধ আহত অবস্থায় আবদুল, রাকিব ও ছহির উদ্দিনকে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁরা তিনজনই বর্তমান শঙ্কামুক্ত।

গুলিবিদ্ধ কালাইহাটা উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মেহেদী হাসান বলে, ভোটের ফল জানতে সে হাটখোলা বাজারে যায়। সেখানে জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে পুলিশ বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ে। শটগানের গুলি তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিধে আছে। মেহেদী হাসানের ছোট মা সমাপ্তি আকতার আহাজারি করে বলেন, ‘এইটুকু বাচ্চা ছেলে। ভোট দেখতে বাজারে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে বাড়িতে পড়ে আছে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পেয়েছে।’

গাবতলী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়া লতিফুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে একটি মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন