বৃষ্টি না হওয়ায় চলন বিল এলাকার মাঠ-ঘাট-নদী শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। কৃষিকাজ ও খাওয়ার পানি আনতে হচ্ছে দূর–দূরান্ত থেকে। সম্প্রতি পাবনার চাটমোহর উপজেলার চলনবিলে
বৃষ্টি না হওয়ায় চলন বিল এলাকার মাঠ-ঘাট-নদী শুকিয়ে চৌচির হয়ে গেছে। কৃষিকাজ ও খাওয়ার পানি আনতে হচ্ছে দূর–দূরান্ত থেকে। সম্প্রতি পাবনার চাটমোহর উপজেলার চলনবিলেছবি: হাসান মাহমুদ

‘বিলের প্রায় আধ হাত মাপের কই মাছ যে একবার খাইছে, জীবনে ভুলিতে পারিবে না। বাচা মাছের তেলের কথা শুনিলেই জিহ্বায় পানি আসিবে। চলন বিলে সোঁতি জালের একটানে আট থেকে দশ মণ বাচা মাছ উঠিত। সেই মাছ সারা দেশে পৌঁছাত।’

১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘চলন বিলের ইতিকথা’ বইয়ে লেখক এম এ হামিদের বর্ণনা ধরে এখন চলনবিলে গেলে হতাশই হতে হয়। দখল-দূষণে মরা খালে পরিণত হয়েছে দেশের বৃহত্তম চলনবিলের নদ-নদী। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে বিলের বিভিন্ন খাল। ভূ-উপরিস্থ পানি না থাকায় নেমে গেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ফলে বিলুপ্ত হতে বসেছে বিলের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদ। ব্যাহত হচ্ছে কৃষি আবাদ।

পূর্ব ইতিহাস বলে, রাজশাহী বিভাগের ৬ জেলার ১ হাজার ৮৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে ছিল চলনবিল। বর্তমানে পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ—এই তিন জেলার ১০টি উপজেলার, ৬২টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৬০০ গ্রাম নিয়ে বৃহত্তর চলনবিল। বিলে রয়েছে ২১টি নদ-নদী, ৭১টি নালা-খাল ও ৯৩টি ছোট বিল।

প্রতিবছর কমছে বিলের আয়তন

ইম্পিরিয়াল গেজটিয়ার অব ইন্ডিয়ার তথ্যমতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে এই আয়তন দেখানো হয় ১৪২ বর্গমাইল। হিসাব অনুযায়ী, ৮২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ৪০৮ বর্গমাইল। উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। এই হিসাবে ১৯০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পরবর্তী ১১২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ১৯৯ বর্গকিলোমিটার। প্রতিবছর গড়ে বিলের আয়তন কমছে ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

চলনবিল বাঁচাতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে প্রকৃতির উপযোগী রাস্তা ও সেতু করতে হবে।
মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির তথ্যমতে, ১৯১৪ সালে ঈশ্বরদী-সিরজগঞ্জ রেললাইন চলনবিলকে দ্বিখণ্ডিত করে। ২০০১ সালে হাটিকুমরুল-বনপাড়া ৫৫ কিলোমিটার মহাসড়ক ও ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর থেকে চলনবিলে একের পর এক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছর থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫ বছরে চলনবিলে ১ হাজার ১৮৮ দশমিক ৫ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইচগেট নির্মাণ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভরাট হচ্ছে নদ-নদী, খাল

চলনবিলে পানিপ্রবাহের প্রধান উৎস হচ্ছে বড়াল নদ, গুমানী ও আত্রাই। পদ্মা-যমুনার পানি এ তিন নদ-নদীর মাধ্যমেই বিলে প্রবেশ করে। ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের কারণে প্রথম এই পানি কমতে থাকে। ১৯৮৫ সালে বড়াল নদের উৎসমুখ রাজশাহীর চারঘাটে স্লুইচগেট নির্মাণের ফলে বড়াল নদ পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এ সময় থেকে চলনবিলও পানিশূন্য হতে শুরু করে।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুসারে, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে বড়াল নদ মরা খালে পরিণত হয়েছে। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে। যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। প্রায় ৬৬ হাজার ২৪০ জন কৃষক এসব খাল ও নালা থেকে সেচের পানি পেতেন। বর্তমানে ৩৬৮ কিলোমিটার পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। যা মোট নালা ও খালের ৯০ দশমিক ২৪ শতাংশ। বাকি ৪২ কিলোমিটার নালা ও খাল পুনরায় খনন করে নাব্যতা ফেরানোর কাজ চলছে।

default-image


বিএডিসির পানাসি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক সাজ্জাদ হোসেন ভুঞা প্রথম আলোকে বলেন, বিলের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় প্রতিবছর বর্ষায় নদ-নদী, নালা ও খালে ৮ থেকে ১৬ ফুট পর্যন্ত পলি জমছে। এতে প্রতি ১০ বছর অন্তর গড়ে ১২ ফুট পর্যন্ত নালা-খাল ভরাট হচ্ছে। এতে ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ না থাকায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। একদিকে মৎস্য সম্পদ বিলুপ্ত ও অন্যদিকে সেচের পানি না পেয়ে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কমছে মৎস্য সম্পদ

পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, চলনবিলে ১৯৮২ সালে মাছের উৎপাদন ছিল ২৬ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন। এরপর ১৯৮৭ সালে ২৪ হাজার ৩৩৬ মেট্রিক টন, ১৯৯২ সালে ১৮ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন, ১৯৯৭ সালে ১৫ হাজার ৪২১ মেট্রিক টন, ২০০২ সালে ১২ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন এবং ২০০৬ সালে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ১১৭ মেট্রিক টন। এই হিসাবে ২৫ বছরে চলনবিলে মাছের উৎপাদন কমেছে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ। গড় উৎপাদন কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ। প্রতিবছর উৎপাদন কমেছে ৩ শতাংশ।

পাবনা জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন কমার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে কৃত্রিমভাবে খননকৃত পুকুরে চাষ করা মাছের উৎপাদন বাড়ছে। বাণিজ্যিক সাফল্য পেতে অনেকেই বিলে পুকুর কেটে মাছ চাষ করছেন। এতে প্রাকৃতিক মাছ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

পাবনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, বিলের গভীরতা কমে যাওয়া, সংযুক্ত নালা ও খাল ভরাট, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, চাষ করা মাছ উৎপাদন ও জমিতে কীটনাশক প্রয়োগ এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণেই প্রাকৃতিক মাছ কমছে। প্রাকৃতিক মাছ রক্ষা করতে হলে অবশ্যই বিলের নালা–খালগুলো পুনরায় খননসহ বিরূপ কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং মৎস্য আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।

নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর

মার্চ ও এপ্রিলে কয়েক দফা চলনবিল ঘুরে দেখা গেছে, বিশাল জলরাশির চলনবিল এখন পানিশূন্য। চলছে ফসলের আবাদ। বিলের চাটমোহর অংশে বড়াল নদে পানি নেই। কচুরিপানা ও ময়লা আবর্জনায় ঠাসা। উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের হান্ডিয়াল বোথর মাঠ। পানির জন্য হা–হুতাশ কৃষকের। মাঠের পর মাঠ আবাদ হয়েছে বোরো ধান। চলছে সেচের পানির সংকট। পানি পেতে ১৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে বসানো হয়েছে সেচযন্ত্র। তবু যেন পানি মিলছে না।

default-image

চাটমোহর থেকে নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাগঞ্জের তাড়াশ পর্যন্ত ঘুরে দেখা গেছে, আঁকাবাঁকা শত রাস্তায় ছেয়ে আছে পুরো বিল। মাঝেমধ্যেই ছোট-বড় ব্রিজ। কিন্তু কোথাও যেন পানির দেখা নেই।

বিল এলাকার বাসিন্দারা বলেন, চলনবিলে একসময় সারা বছর পানি থাকত। উঁচু জমিতে ফসল আবাদ, নদী-খালে মাছ শিকার চলত। অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই বৃহৎ এই বিল এখন পানিশূন্য। এতে একদিকে মৎস্য সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি আবাদ। চাটমোহরের বোথর মাঠের নলকূপের মালিক আবদুস সালাম বলেন, পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে ভূগর্ভে ২৭ থেকে ২৮ ফুট গভীরে পানি মিলত। এখন এক শ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। ফলে মাটি খুঁড়ে সেচযন্ত্র বসিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে।
চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, একদিকে ভূ-উপরিস্থ পানি না থাকা, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণেই পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। সংকট মোকাবিলায় আপাতত মাটি খুঁড়ে কিছুটা নিচে সেচযন্ত্র বসিয়ে পানি তুলতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে কৃষককে বোরো আবাদে অনুৎসাহিত করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

চলনবিল রক্ষা আন্দোলন কমিটির সদস্যসচিব এস এম মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, চলনবিল রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। পরিকল্পনা, ভূমি, কৃষি, পনি সম্পাদ, নৌ, স্থানীয় সরকার, মৎস্য ও পরিবেশ—সব মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে সঠিক পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্রিজ–কালভার্ট ও স্লুইচগেট অপসারণ করতে হবে। বাণিজ্যিক পুকুর খনন বন্ধ করতে হবে। তবেই চলনবিল প্রাণ ফিরে পাবে।

default-image

চলনবিল নিয়ে গবেষণা করেন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম। তিনি জানান, চলনবিল এলাকার তিনটি আবহাওয়া কেন্দ্রের ১০০ বছরের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, বিলের আবহাওয়া প্রতিবছর বিরূপভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। প্রতিকূলতার কারণে আবহাওয়ার ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। প্রতিবছর গড় বৃষ্টিপাত কমছে, বাড়ছে তাপমাত্রা। এতে একদিকে পানিতে অক্সিজেন কমে মাছের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।

মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম বলেন, চলনবিল বাঁচাতে হলে প্রথমেই রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিশ্রুতি রক্ষায় বিচ্ছিন্ন উন্নয়ন বন্ধ করতে হবে। পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করতে প্রকৃতির উপযোগী রাস্তা ও সেতু করতে হবে। তবেই জলজ উদ্ভিদের চক্রবৃদ্ধি স্বাভাবিক হবে; জলজ প্রাণীর উৎপাদনও স্বাভাবিক হবে। অন্যদিকে খাল খননের মাধ্যমে ভূ-উপরিস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক করতে পারলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর স্বাভাবিক হবে। চলনবিল প্রাণ ফিরে পাবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন