default-image

বগুড়া শহরের শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলা ও শরীরচর্চার এক প্রাণকেন্দ্র আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ। কিন্তু মাঠটিতে দুই সপ্তাহ ধরে কোনো খেলাধুলা নেই। উল্টো মাঠ খোঁড়াখুঁড়ি করে চলছে মাসব্যাপী মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি।

বগুড়া জেলা জজ আদালত ও জিলা স্কুলঘেঁষা আবাসিক এলাকায় এই মাঠে মাসব্যাপী বিসিক শিল্পপণ্য মেলা বসানোর ‘অনুমতি’ দিয়েছে বগুড়া জেলা প্রশাসন। আর খেলার মাঠ লাখ টাকায় মেলার জন্য ভাড়া দিয়েছে বগুড়া পৌরসভা। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলছেন, খেলার মাঠে মাসব্যাপী মেলা বসানোর কারণে শুধু আদালত ও আবাসিক এলাকার পরিবেশ বিঘ্নিত হবে না, খোঁড়াখুঁড়ির কারণে মাঠ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেলা শেষ হওয়ার পরও এটি খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়বে।

এই মেলার আয়োজক বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) বগুড়া। বিসিক বগুড়ার উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, মাসব্যাপী বিসিক শিল্পপণ্য এই মেলা আয়োজন করা হতো শহীদ টিটু মিলনায়তন চত্বরে। এবার মেলা হচ্ছে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে। মেলা বসানোর জন্য জেলা প্রশাসন থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে। ১৮ ফেব্রুয়ারি বিসিকের চেয়ারম্যান মো. মোশ্তাক হাসান মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।

যদিও খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০-এর ৫ নম্বর ধারা অনুযায়ী, খেলার মাঠ অন্য কোনোভাবে ব্যবহার বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাবে না৷ এই আইন লঙ্ঘনে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় সাজার বিধান আছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাসব্যাপী এই মেলার জন্য দুই সপ্তাহ ধরে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে স্টল, ফটক, কৃত্রিম ফোয়ারা, টাওয়ার ও সাংস্কৃতিক মঞ্চ নির্মাণের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়েছে। এতে বন্ধ হয়ে পড়েছে সব ধরনের খেলাধুলা ও অনুশীলন।

করোনা পরিস্থিতি এখনো শতভাগ স্বাভাবিক হয়নি। জনসমাগম এড়িয়ে চলাফেরার জন্য মানুষজনকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অথচ জেলা প্রশাসন স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ মানছে না।
মোস্তাফিজুর রহমান, ডেপুটি সিভিল সার্জন, বগুড়া

সরেজমিনে দেখা গেছে, মাঠের সিংহভাগ অংশজুড়ে প্যান্ডেল তৈরি করা হয়েছে। প্যান্ডেলের চারপাশ টিন দিয়ে ঘিরে স্টল বানানো হয়েছে। মাঠের ভেতরেও আছে বেশ কিছু স্টল। মাঠের একদিকে চরকি, দোলনা, ট্রেন, নাগরদোলাসহ নানা রাইড স্থাপন করা হয়েছে। মেলার প্রবেশমুখে ইট দিয়ে স্থায়ী অবকাঠামোর মতো স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। চলছে টাওয়ার ও রঙিন পানির ফোয়ারা নির্মাণের কাজ।

জলেশ্বরীতলা ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডোনিস বাবু তালুকদার বলেন, করোনায় স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও আদালত ও আবাসিক এলাকা ঘেঁষে মাসব্যাপী এই মেলার আয়োজন চলছে।

বগুড়ার ডেপুটি সিভিল সার্জন মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, করোনা পরিস্থিতি এখনো শতভাগ স্বাভাবিক হয়নি। জনসমাগম এড়িয়ে চলাফেরার জন্য মানুষজনকে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। অথচ জেলা প্রশাসন স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ মানছে না। তারা মাসব্যাপী মেলা আয়োজনে সহযোগিতা করছে।

বিজ্ঞাপন

খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠকেরা বলছেন, ঐতিহ্যবাহী এই খেলার মাঠে যুগ যুগ ধরে খেলাধুলা ও চর্চা করে আসছেন খেলোয়াড়রা। নানা বয়সভিত্তিক ও স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট, জেলা প্রশাসক কাপ, বঙ্গবন্ধু কাপ ছাড়াও নানা ফুটবল টুর্নামেন্টের আসর বসে। এ ছাড়া বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের আসরও বসে এখানে। এখানে গড়ে উঠেছে ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমি। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় শিশু-কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলায় ভরসাও এই মাঠ।

default-image

স্থানীয় লোকজন প্রথম আলোকে বলেন, এবারই প্রথম নয়। আইন লঙ্ঘন করে এই খেলার মাঠে বছরজুড়েই ছোট-বড় মেলা, রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ইসলামি জলসাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে। খেলার মাঠে মেলা আয়োজনের মাধ্যমে কিছু ব্যক্তি কামিয়ে নিচ্ছেন বিপুল অঙ্কের টাকা। বিসিক শিল্পপণ্যের মেলা বলা হলেও এখানে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পণ্যের স্টল কম।

পৌরসভার অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে মাঠটি ঐতিহ্য হারাচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ি করে মেলা আয়োজন করায় মাঠে খেলাধুলার পরিবেশ নেই।
সুলতান মাহমুদ খান, সভাপতি জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন

জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার ও বাফুফের রাজশাহী বিভাগের ফুটবল প্রশিক্ষক মাকসুদুল আলম বুলবুল দুই যুগ ধরে এ মাঠে ফুটবল খেলছেন। এখন প্রশিক্ষণ দেন। তিনি বলেন, এই মাঠে আর ফুটবল গড়ানোর মতো পরিবেশ নেই। পৌরসভা এই মাঠ ভাড়া দিয়ে বাণিজ্য করছে। খেলা বন্ধ করে মাসব্যাপী মেলা হচ্ছে। মাঠ রক্ষায় পৌরসভার কোনো সদিচ্ছা নেই।

সাবেক ফুটবলার সাজেদুল করিম বলেন, ২৬ বছর ধরে এ মাঠে ফুটবল নিয়ে আছেন। এখানে ফুটবল একাডেমি করেছেন। কিন্তু মাসজুড়ে মেলা আয়োজনে ফুটবল প্রশিক্ষণ বন্ধ। মাঠ রক্ষার জন্য প্রশাসন, পৌরসভার কাছে অনেক অনুরোধ করেও কোনো কাজ হয়নি।

জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুলতান মাহমুদ খান প্রথম আলোকে বলেন, পৌরসভার অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার কারণে মাঠটি ঐতিহ্য হারাচ্ছে। খোঁড়াখুঁড়ি করে মেলা আয়োজন করায় মাঠে খেলাধুলার পরিবেশ নেই। মাঠে অনুষ্ঠান না করার জন্য পৌরসভাকে অনেক অনুরোধ করা হয়েছে। মাঠটি পৌরসভার বদলে জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছে হস্তান্তরের জন্য জেলা প্রশাসনে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

৭ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় কাউন্সিলর দেলোয়ার হোসেন পশারী প্রথম আলোকে বলেন, খেলার মাঠ সবার জন্য উন্মুক্ত। মেলার কারণে খেলাধুলা বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত খেলাধুলা করতে না পারলে কিশোর-তরুণদের মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বাড়ে।

default-image

এ বিষয়ে বগুড়া পৌরসভার সচিব রেজাউল করিম বলেন, মাসব্যাপী এই মেলা আয়োজনের জন্য বিসিককে এক লাখ টাকায় মাঠ ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে প্রতি বর্গফুট মাঠের ভাড়া ২ টাকা হলেও বিসিক সরকারি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় সেই দরে ভাড়া আদায় করা যায়নি।

করোনা পরিস্থিতির মধ্যে আবাসিক এলাকায় খেলার মাঠে মেলা আয়োজন বিষয়ে বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. জিয়াউল হক প্রথম আলোকে বলেন, শিল্প মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে মাসব্যাপী এই মেলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এই মাঠে আগেও মেলা হয়েছে। আবাসিক এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা আদালত থাকলেও কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতিতে সব মেলা হচ্ছে, এ মেলাও হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন