হাটে তোলা কবুতরগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি তাদের বাহারি সব নাম। দেশি কবুতরের পাশাপাশি হাটে লক্ষা, কিং সিরাজি, আউল, গোল্ডেন সুইট শর্টফেস, মুক্তি, হোমার, গিরিবাজ, শার্টিন, ঘিয়া সুল্লী, জিরাগলা, জ্যাকোবিন, সোয়া চন্দনের মতো নানা জাতের কবুতরের দেখা মেলে।

সরেজমিন হাট ঘুরে দেখা গেল, ক্রেতারা কবুতর কেনার আগে পালকের নিচে-ওপরে, গলা, পা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন। কবুতরের মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী পরীক্ষা করছেন। বিক্রেতাকে কবুতরের বয়স, নিয়মিত ডিম দেয় কি না ইত্যাদি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করছেন। হাটে কে ক্রেতা, আর কে বিক্রেতা, সেটা বোঝা মুশকিল। হাটের বেশির ভাগ বিক্রেতাই শৌখিন কবুতর পালনকারী। নিজের সংগ্রহের বাড়তিগুলো যেমন বিক্রি করছেন, তেমনি অন্য পছন্দ হলে তা কিনে নিজের সংগ্রহ সমৃদ্ধ করছেন। কবুতরের পাশাপাশি হাটে অন্যান্য পাখি ও খরগোশের দেখা মেলে।

সোনাডাঙ্গা খাঁ বাড়ি এলাকার তরুণ রাব্বি পাঁচ জোড়া কবুতর হাটে এনেছেন। ছয় বছর ধরে তিনি কবুতর পালন করেন। কবুতরের পেছনে সময় দিতে গিয়ে তাঁর পড়ালেখাও বেশি দূর এগোয়নি। ১৮ বছর বয়সী রাব্বির বাসায় গোল্ডেন, গিরিবাজ, মুক্তি, কাজ্জী, পোর্টার বলসহ বিভিন্ন জাতের ৫০ জোড়া কবুতর আছে। হাটে আনা একজোড়া পোর্টার বলের দাম হাঁকছিলেন ১১ হাজার টাকা। রাব্বি প্রথম আলোকে বললেন, ‘হাটে এক শ’র ওপর বিক্রেতা কবুতর আনেন। এ ছাড়া অনেক ফড়িয়ারাও আসেন। বর্তমানে কবুতরের দাম একটু কম। করোনার পর থেকে বেচাকেনা যেন কেমন ডাউন (নিম্নমুখী) হয়ে গেছে।’

default-image

নতুন কোনো বিক্রেতা কবুতর নিয়ে হাটে ঢুকলেই ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে তাঁর কাছে যাচ্ছেন। দরদাম করছেন। ক্রেতা-বিক্রেতা একে অন্যকে কথা ও অভিজ্ঞতার মারপ্যাঁচে ঘায়েল করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। লবণচনা মোক্তার হোসেন সড়ক এলাকা থেকে দুটি খাঁচায় কবুতর নিয়ে হাটে আসেন মিতু বেগম (৩২)। তাঁর কবুতর দেখতে আশপাশের ক্রেতারা ভিড় করেন। তিনি কিং সিরাজি, জিরাগলা ও গিরিবাজ—এই তিন জাতের কবুতর হাটে নিয়ে এসেছেন।

কিং সিরাজির দাম হাঁকাচ্ছিলেন জোড়াপ্রতি সাড়ে ৫ হাজার, গিরিবাজের দাম চাচ্ছিলেন ৭০০ টাকা জোড়া। মিতু বেগম প্রথম আলোকে বললেন, শুরুতে শখের বশে কবুতর পোষা শুরু করলেও এখন এটাই তাঁর পেশা। তাঁর খামারে এখন কিং সিরাজি, গিরিবাজ, কাজ্জী, সিলভার সিরাজি, জিরাগলা, লক্ষাসহ নানা জাতের ৫০ জোড়া কবুতর আছে। স্বামী চাকরি করেন। তাঁর পাশাপাশি তিনি কবুতর ও হাঁস-মুরগির ব্যবসা করছেন। প্রতি সপ্তাহে কবুতর বিক্রি করেন। এতে তাঁর ভালো আয় হয়।

হাটে কবুতর কিনতে আসছি, আবার বেচতে। প্রতি সপ্তাহেই আসি। সপ্তাহে হাজার দশেক টাকার বেচাবিক্রি করি। ফজরের পর থেকেই এ হাটে লোক আসতে শুরু করে।
হাটে বাগেরহাট থেকে আসা বিক্রেতা মো. রিয়াজ

ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, গল্লামারীতে ১০ থেকে ১২ বছর ধরে কবুতরের হাট বসে। আগে সেটি ছোট পরিসরে বসত। গত দুই-তিন বছরে হাট জমজমাট। এখন ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের ব্যাপক উপস্থিতি থাকে।

বাগেরহাটের কাটাখালী থেকে হাটে এসেছেন মো. রিয়াজ। ২২ ধরে তিনি কবুতরের ব্যবসা করেন। বাড়িতে তাঁর খামারে শ খানেক কবুতর আছে। রিয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাটে কবুতর কিনতে আসছি, আবার বেচতে। প্রতি সপ্তাহেই আসি। সপ্তাহে হাজার দশেক টাকার বেচাবিক্রি করি। ফজরের পর থেকেই এ হাটে লোক আসতে শুরু করে। এরপর হাট ভাঙলে খালিশপুরের চিত্রালি যাই। চিত্রালির হাট বেলা একটার মধ্যে শেষ হয়। বিকেল তিনটার পর থেকে ফুলবাড়ী গেট হাট বসে। খুলনা শহরে শুক্রবার এক দিনে তিনটি হাট বসে। কোথাও খাজনা বা টোলের ব্যবস্থা নেই, এটাই সুবিধা।’

default-image

মো. আসিফ নামের এক বিক্রেতা বলেন, বর্তমানে মাংস খাওয়ার জন্য বাচ্চা ও কম দামি কবুতর বেশি বিক্রি হচ্ছে। হাটে শৌখিন কবুতরের বেচাবিক্রি কম। বেচাবিক্রি কেমন হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পালকেরা এখন অনলাইনেই বেচাকেনা করেন। মানুষ যদি ঘরে বসে জিনিস পান, তাহলে হাটে আসবেন কেন?’

নিরালা দীঘিরপাড়ের বাসিন্দা মো. আলী হাটে কবুতর কিনতে এসেছেন। বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখার সময় এক দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, তাঁর বাসায় ২৪ জোড়া কবুতর আছে। বাসা থেকে ঠিক করে আসেননি, যদি কোনো কবুতর পছন্দ হয় তবে কিনবেন। যেসব কবুতর বেশি ওড়ে, সেগুলোই তাঁর পছন্দ। এ জন্য ভালো গিরিবাজ ও রেসার হোমার দেখছেন। তিনি বলেন, হাটে বিক্রেতার পাশাপাশি ক্রেতার সংখ্যাও বেড়েছে। আগে না এলে ভালো কবুতর পাওয়া যায় না বলে জানান তিনি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন