default-image

মাগুরার লাঙ্গলবাঁধ হয়ে শ্রীপুর পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে গত ৩০ বছরে স্থানীয় ২৪টি সমিতির মাধ্যমে কয়েক হাজার গাছ লাগানো হয়েছে। সমিতির সদস্য সবাই স্থানীয় গ্রামবাসী। তাঁরা যত্নআত্তি করে গাছগুলো বড় করেছেন। ওই সড়ক চওড়া করার জন্য কোনো দরপত্র ছাড়ায় হঠাৎই কোপ পড়েছে সেই গাছগুলোতে। কোথাও এক্সকাভেটর দিয়ে গাছগুলো উপড়েও ফেলা হয়েছে। এত দিনের যত্নের গাছগুলোর এই হাল দেখে ক্ষুব্ধ স্থানীয় মানুষ। গাছগুলো থেকে প্রাপ্য অর্থ পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় তাঁরা। বন বিভাগ অবশ্য দাবি করছে, সময় স্বল্পতার কারণে আগে দরপত্র আহ্বান করা না গেলেও কাটা গাছ সঠিকভাবেই নিলাম করা হবে।

মাগুরা সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি ‘শেখপাড়া-শৈলকূপা-লাঙ্গলবাঁধ-ওয়াপদা মোড় জেলা মহাসড়ক প্রশস্তকরণ ও মজবুতকরণ’ নামে একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে মাগুরার ওয়াপদা মোড় থেকে ঝিনাইদহের শৈলকুপা হয়ে কুষ্টিয়ার শেখপাড়া পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে। এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে মাগুরা অংশে ওয়াপদা মোড় থেকে লাঙ্গলবাঁধ হয়ে শ্রীপুর পর্যন্ত ৩৬ কিলোমিটার ১২ ফুট সড়ক চওড়া করে ১৮ ফুট করা হবে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মাগুরা অংশের কাজ উদ্বোধন করেন স্থানীয় সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর। এরপর বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে থাকা গাছ কাটা শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

মাগুরা সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তবেন্দ্রনাথ সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গাছগুলো চিহ্নিতকরণসহ দরপত্র আহ্বানের জন্য আমাদের কাজ চলমান ছিল। তবে তার আগেই সড়ক বিভাগ কাজ শুরু করে, অনেক জায়গায় গাছ উপড়ে ফেলেছে তারা। এতে উপকারভোগীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে উপজেলা পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির সভায় গাছ কাটার সিদ্ধান্ত হয়। এখন গাছ কেটে মাপজোখ করে উপকারভোগীদের জিম্মায় রাখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে দরপত্রের মাধ্যমে এগুলো বিক্রি করা হবে। এই গাছ বিক্রি করে যে অর্থ আসবে, তার ৫৫ ভাগ পাবেন গাছগুলো দেখভালকারী সমিতির সদস্যরা। বাকিটা জমির মালিক ও সরকারের একাধিক খাতে যাবে।

৫ মার্চ সরেজমিন ওয়াপদা থেকে লাঙ্গলবাঁধ সড়কে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন জায়গায় গাছ কাটা চলছে। দুরান নগরের আমরা কজন বনায়ন সমিতির সভাপতি মো. ফকরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এভাবে কাজ কাটায় আমরা চরম আর্থিক লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছি। এক্সকাভেটর দিয়ে অনেক গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। একসঙ্গে অনেক জায়গায় গাছকাটা শুরু হওয়ায় শ্রমিক খরচ বেশি হচ্ছে, জ্বালানি কাঠের দাম কম পাচ্ছি। সঙ্গে আমাদেরও শ্রম দিতে হচ্ছে। এ ছাড়া যে কাঠ নিলামের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, তার দাম সঠিক পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। অথচ প্রায় ২০ বছর ধরে গাছগুলো আমরা যত্ন করে বড় করেছি। এখন সরকারি কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।’

অন্তত পাঁচটি সমিতির সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সমিতির তত্ত্বাবধানে কাটা গাছের লগ (গুঁড়ি) সংরক্ষণ করা হচ্ছে। আর গাছের খড়ি বিক্রি করে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে। তবে দরপত্র ছাড়া গাছ কাটায় সঠিক মূল্য পাবেন কি না, এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন অনেকে।

মাগুরা সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সড়কের পাশ থেকে গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ শেষ করার জন্য আমাদের একটি সময়সীমা রয়েছে। আর গাছ উপড়ে ফেলার বিষয়ে অবহিত হওয়ার পরপরই বিষয়টি বন্ধ করেছি।’

এ বিষয়ে শ্রীপুর ইউএনও ইয়াসিন কবির মুঠোফোনে বলেন, ‘সড়ক বিভাগ বা অন্য কোনো সরকারি দপ্তর এ বিষয়ে আগে থেকে আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করেনি। গত মাসের মাঝামাঝি সময়ে পরিবেশ ও বন উন্নয়ন কমিটির বৈঠক আহ্বান করা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে উন্মুক্ত নিলামের মাধ্যমে গাছ বিক্রি করতে হবে। যখন অভিযোগ পেয়েছি গাছ নানাভাবে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, তখনই নতুন করে গাছকাটা বন্ধ করেছি। কমিটিকে এখানে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কারণ, আগে থেকে এসব বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন