default-image

মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলায় রাস্তার পাশে, জনবসতিপূর্ণ এলাকায় চলছে ইট, বালু ও পাথরের ব্যবসা। শহরের হাটলক্ষ্মীগঞ্জ থেকে শুরু করে পঞ্চসার ইউনিয়নের ফিরিঙ্গীবাজার এলাকা পর্যন্ত আড়াই কিলোমিটার রাস্তায় ৩০ থেকে ৩৫টি গদি বসিয়ে চলছে এই ব্যবসা। ফলে বাতাসে ধুলাবালু উড়ে যাওয়ায় স্থানীয় লোকজন ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, বারবার প্রশাসনকে জানিয়েও দূষণের প্রতিকার পাচ্ছেন না তাঁরা। উল্টো মিলছে হুমকি-ধমকি।

মুন্সিগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি তানভির হাসান জানান, দীর্ঘদিন ধরে বালুর ব্যবসায়ীরা রাস্তা, বাঁধ ও লোকালয়ে তাঁদের ব্যবসার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। এতে মানুষ, পরিবেশ, বাঁধ ও রাস্তাঘাট নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। প্রশাসন কয়েকবার ব্যবস্থা নিয়েছিল, সেটা স্থায়ী হয়নি। যাঁরা এই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা করছেন, তাঁরা প্রভাবশালী। তাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এ ছাড়া ব্যবসাগুলো এমন কোনো স্থানে স্থানান্তর করা দরকার, যেখানে মানুষ ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি না হয়।

তবে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নয়ন মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, বালু ব্যবসায়ীদের গাফিলতিতে পরিবেশদূষণ হচ্ছে। তবে বালু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তাঁদের সরাসরি আইন প্রয়োগ করার এখতিয়ার নেই। বিষয়টি জেলা প্রশাসনের।

সম্প্রতি দেখা যায়, হাটলক্ষ্মীগঞ্জ থেকে শুরু করে পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাঁও, মালিপাথর মুক্তারপুর ফিরিঙ্গীবাজার এলাকায় রাস্তার কোথাও এক পাশে, কোথাও দুই পাশে, আবার কোথাও শহর রক্ষা বাঁধের ওপর ইট, বালু, মোটা বালু ও পাথরের ব্যবসা চলছে। এ রাস্তায় মক্কা এন্টারপ্রাইজ, দেওয়ান এন্টারপ্রাইজ, ধলেশ্বরী এন্টারপ্রাইজ, মাদবর এন্টারপ্রাইজ, হাসান এন্টারপ্রাইজ, সাদ্দাত এন্টারপ্রাইজ, মোল্লা এন্টারপ্রাইজ ও আদিভা এন্টারপ্রাইজ নামে অন্তত ২৫টি নির্মাণসামগ্রীর দোকান চোখে পড়ে। এসব গদিতে বাল্কহেডের মাধ্যমে মূল রাস্তা কেটে পাইপ দিয়ে বালু আনা হচ্ছে। এসব বালু দিয়ে জনবসতি ও মূল সড়কের পাশে বিশাল জায়গা নিয়ে তৈরি করা হয়েছে উঁচু স্তূপ। এসব স্তূপ থেকে বালু বাতাসে উড়ে রাস্তায় এসে পড়ছে। গদি থেকে ঢাকনাবিহীন ট্রাক, ট্রেইলার ও ভ্যানগাড়ি বোঝাই করে শহরের বিভিন্ন স্থানে বালু নেওয়া হচ্ছে। এতে পিচ ঢালাইয়ের রাস্তা বালুর রাস্তায় পরিণত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মালিপাথর এলাকার মেসার্স মোল্লা এন্টারপ্রাইজের পরিচালক দেলোয়ার হোসেন বলেন, কয়েক বছর আগে রাস্তার দুই পাশে অন্তত ৩৫টি নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বর্তমানে নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আরও বেশি হতে পারে।

এ পথে যাতায়াতকারী ও ফিরিঙ্গীবাজারের বাসিন্দা রাসেল মিয়া বলেন, ‘আমাদের বাড়ি ঘেঁষে বালুর বিশাল স্তূপ রাখা হয়েছে। সামান্য বাতাসে ঘরের ভেতর বালু ঢুকছে। ঘরের আসবাব নষ্ট হচ্ছে। খাবারে বালু মিশে যাচ্ছে। পরিবারের ছোট শিশু থেকে বয়স্ক—সবাই সারা বছর ধরে জ্বর, সর্দিকাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, কাশি দিলে পেটের ভেতর থেকে বালু বের হয়।’

মালিপাথর এলাকার মনা মিয়া বলেন, ‘অনেক প্রতিবাদ, আন্দোলন করেছি। এখন আর এগুলো নিয়ে ভাবি না। সুযোগ হলে বাপ-দাদার ভিটা বালুর ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে চলে যাব।’

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ‘সামান্য বাতাসে বালু উড়ে চারপাশ অন্ধকার হয়। ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন স্থানীয় লোকজন। নাক–মুখ চেপে রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করছেন পথচারীরা। আগে সপ্তাহে এক দিন পানি দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করা হতো। এখন মাসেও একবার হয় না। দুই বছর আগে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। কোনো লাভ হয়নি, বরং ব্যবসায়ীরা প্রভাবশালী হওয়ায় আমাদের উল্টো হুমকি দিচ্ছেন। তাঁরা পুলিশের ভয় দেখান। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।’

মালিপাথর এলাকায় অবস্থিত মাদবর এন্টারপ্রাইজের গদিতে বসা এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি বলেন, ‘বালুতে কারও কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। তবে আমাদের সঙ্গে কথা বলে লাভ নেই। আমাদের এই নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসাগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন পঞ্চসার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য জাহিদ মেম্বার।’

ইউপি সদস্য জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বালুর ব্যবসা নদীর পাড়েই করতে হবে। আমি প্রতিটি গদিতে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু দিই। তবে কেউ পরিবেশ দূষণ করলে সেটার জন্য সে–ই দায়ী।’

তবে দেওয়ান এন্টারপ্রাইজের মালিক আবু বক্কর দেওয়ান বলেন, বালুর ব্যবসা পরিবেশদূষণ ঘটাচ্ছে। পথচারীদের সমস্যাও হচ্ছে। তবে মানুষের কষ্টটা যেন কম হয়, সেভাবে ব্যবসা করার চেষ্টা করা হবে।

আরমান এন্টারপ্রাইজের মালিকপক্ষ আবদুর রহমান বলেন, তাঁরা ধুলাবালু কমাতে সপ্তাহে এক দিন পানি দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করেন। দুই দিন ভালো থাকে পরদিন আবার রাস্তায় বালুর স্তর জমে যায়।

ইউএনও রুবাইয়াত হাসান শিপলু বলেন, কিছুদিন আগে সরকারি রাস্তা ও সরকারি জায়গায় যেন এসব নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা করা না হয়, সে জন্য ব্যবসায়ীদের নোটিশ করা হয়েছিল। তবে যাঁরা ব্যক্তিগত জায়গায় ব্যবসা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে তেমন কিছুই করার থাকে না। কিন্তু যেহেতু তাঁদের মাধ্যমে মানুষ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন