বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জীবনানন্দের শহরে জীবন এখন কেমন—এই প্রশ্নের দুই উত্তর পাওয়া যাবে। প্রথমত, দেশের অন্য বিভাগীয় শহরগুলোর তুলনায় বরিশালে জীবন সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যের। এখনো কিছু বাড়ির সামনে আঙিনা টিকে আছে, গাছগাছালি আছে। পার্কগুলোতে সাধারণ মানুষ প্রাতর্ভ্রমণ অথবা বৈকালিক ভ্রমণে যেতে পারে। রাজাবাহাদুর সড়কের হিমনীড়ের বাংলোর পুকুরে এখনো উঁকি মারে লাল-শ্বেত পদ্মফুল। শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ আর বাগানবাড়িগুলোর পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে এখনো একদণ্ড শান্তি মেলে। নগরের উত্তর ও পূর্ব পাশ দিয়ে প্রবাহিত কীর্তনখোলা নদীর পানি এখনো দূষণে বিষিয়ে যায়নি। রাস্তাগুলোতে তেমন যানজট দেখা যায় না। ধুলাবালু আর বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় বিষিয়ে ওঠেনি বাতাস।

default-image

দ্বিতীয় মত হলো, বরিশাল শহরে তিন দশক আগে যেমন জীবন ছিল, এখন তেমন নেই। শহর অনেক বড় হয়েছে, তবে পরিকল্পনার ছাপ নেই। রাস্তা সরু। শহরের সম্প্রসারিত এলাকার অনেক রাস্তায়ও ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। হারিয়ে যাচ্ছে গাছপালা ও দিঘি। এমনকি যে খালের কারণে কবি নজরুল ইসলাম বরিশালকে ‘ভেনিস’ নামে অভিহিত করেছিলেন, সেই খালগুলো মৃতপ্রায়। ২২টি খালের মধ্যে প্রবহমান আছে মাত্র ৪টি।

এসব থেকে শহরকে রক্ষার উদ্যোগ কী, জানতে চাইলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, মহানগরের পরিবেশ বাঁচাতে সব খাল পুনঃখনন এবং এগুলোর দুই তীরে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য আড়াই হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া আছে। এ প্রকল্প অনুমোদন হলে খাল খনন করে বরিশালের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি আরও বলেন, সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত নগর গড়ার জন্য নগর উন্নয়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অবশ্য নগরের পুরোনো বাসিন্দারা বলছেন, শহরটিকে বাঁচাতে বড় বড় প্রকল্পের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সদিচ্ছা ও পরিকল্পনা। পুকুর ভরাট করা, খাল দখল রোধ করা ও বড় রাস্তা না রেখে ভবন করা ঠেকাতে পরিকল্পনাটি বেশি জরুরি।

গোড়াপত্তন

বরিশাল পৌরসভার গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৫২ বছর আগে, ১৮৬৯ সালে। তখন এর নাম ছিল টাউন কমিটি। তৎকালীন জেলা প্রশাসক জে সি প্রাইজ ছিলেন টাউন কমিটির প্রথম সভাপতি। ১৮৭৬ সালে বরিশাল শহর মিউনিসিপ্যালিটিতে উন্নীত হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম শ্রেণির পৌরসভা করা হয় বরিশালকে। এরপর ২০০২ সালে ‘বরিশাল সিটি করপোরেশন (সংশোধন) আইন, ২০০২’-এর মাধ্যমে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হয় শহরটি।

নদ-নদীবেষ্টিত বরিশাল হচ্ছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নৌবন্দর। বরিশাল থেকে ঢাকার পথে প্রতিদিন রাতে বিলাসবহুল অনেক লঞ্চ ছেড়ে যায়। মূলত বরিশালের গুরুত্ব বেড়েছিল এই বন্দরকে কেন্দ্র করেই।

বরিশাল ‘গিরি-ই-বান্দর’ নামে পরিচিত ছিল। বন্দরটি লবণ, মসলা ও কাঠের ব্যবসার জন্য ব্যাপক পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে এটি বরিশাল বন্দরে রূপান্তরিত হয়। ১৮৮০ সালের আগে বরিশালের নদীপথে স্টিমার চলাচল শুরু করে। ১৮৮৪ সালে বেঙ্গল সেন্ট্রাল ফ্লোটিলা কোম্পানি বরিশাল ও খুলনার মধ্যে নিয়মিত স্টিমার পরিষেবা চালু করে। পরে বরিশাল নদীবন্দরটি আন্তজেলা এবং বাংলাদেশের অন্যান্য জেলা থেকে কলকাতা পর্যন্ত উভয় পথে একটি টার্মিনাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ স্টিমার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

এখন বরিশাল শহরের আয়তন ৫৮ বর্গকিলোমিটারের মতো। শহরটিতে বাস করে প্রায় ছয় লাখ মানুষ। বছর কয়েক আগেও শহরে বহুতল ভবন ছিল হাতে গোনা। একতলা বা দোতলা বাড়ির সংখ্যাই ছিল বেশি। গত পাঁচ বছরে এসব বাড়ি ভেঙে অনেক বহুতল ভবন হয়েছে। বেশ কয়েকটি আবাসন কোম্পানি, পুরোনো বাড়ি ভেঙে নির্মাণ করছে বহুতল ভবন।

নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের নগর-পরিকল্পনাবিদ মো. বায়েজিদ বলেন, বরিশাল নগরকে এখনো পরিকল্পিত সুন্দর নগর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনামাফিক এগোনো এবং সদিচ্ছা। তিনি বলেন, মূল শহরের বিশেষ করে বাণিজ্যিক এলাকার রাস্তাগুলো প্রশস্ত করার এখন আর সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে নগরকে যানজটমুক্ত করতে সিটি সার্কুলার রোড করা যেতে পারে। একই সঙ্গে খালগুলো খনন করে হাঁটার পথ ও পাড়ে গাছ লাগানো গেলে নগরের পরিবেশ, প্রতিবেশ সুরক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি এসব খাল যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব।

শিক্ষার প্রসার

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বরিশাল সিটি করপোরেশনে সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক ৩ শতাংশ, যা দেশের তখনকার গড় হারের (৫৬ দশমিক ৫ ভাগ) চেয়ে বেশি। বরিশাল শহরে আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটে ১৮২৯ সালে বরিশাল ইংলিশ স্কুল স্থাপনের মধ্য দিয়ে। এটি বর্তমানে বরিশাল জিলা স্কুল নামে পরিচিত। বিদ্যালয়টি বরিশাল বিভাগের মধ্যে প্রথম ও দেশের অন্যতম প্রাচীন বিদ্যালয়। আধুনিক শিক্ষার প্রসারের দিকপাল অশ্বিনীকুমার দত্ত। ১৮৮৪ সালে ব্রজমোহন বিদ্যালয় এবং ১৮৮৯ সালে ব্রজমোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। তখন কলেজটি এতই উন্নত মানের ছিল যে অনেকে একে দক্ষিণ বাংলার অক্সফোর্ড নামে ডাকতেন।

উচ্চশিক্ষার জন্য বর্তমানে বরিশাল শহরে একটি সরকারি ও তিনটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া একটি সরকারি ও একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, একটি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, একটি মেরিন একাডেমি, একটি সরকারি ও বেশ কয়েকটি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সরকারি আবদুর রব সেরনিয়াবাত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও নার্সিং কলেজ আছে।

স্বাস্থ্য খাতে সংকট

বরিশাল বিভাগের সরকারি চিকিৎসাসেবার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজার রোগী ভর্তি থাকে। কিন্তু হাসপাতালটির অবকাঠামো এবং চিকিৎসক কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংকট যুগ যুগ ধরে চলছে। ফলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালের বাইরে বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এসব হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এখনো যুক্ত হয়নি। ফলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশালবাসীকে এখনো ছুটতে হয় রাজধানীতে।

default-image

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২২৪ জন চিকিৎসকের স্থলে ১১৭ জন কর্মরত আছেন। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, এই হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট অনেক দিন ধরেই। এ জন্য চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

বাড়েনি নাগরিক সুবিধা

বরিশাল নগরে এখন প্রতিদিন নিয়মিত ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় পানির কষ্ট আছে। এ ছাড়া নগরের বর্ধিত ওয়ার্ডগুলোর রাস্তাঘাট এখনো অনুন্নত।

বরিশাল নগরের ৩ নম্বর কাউনিয়া ওয়ার্ডের পুরানপাড়া এলাকায় বর্জ্য ফেলার বিশাল ভাগাড়। বর্জ্য পোড়ানোর ধোঁয়া চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। দুর্গন্ধ আর মশা-মাছির উপদ্রবে এলাকাবাসীর জীবন অতিষ্ঠ।

বরিশাল সিটি করপোরেশনের পানি সরবরাহ বিভাগ সূত্র জানায়, নগরের ছয় লাখ বাসিন্দার জন্য দৈনিক ৫ কোটি ৪০ লাখ লিটার পানির দরকার। করপোরেশন থেকে বর্তমানে ২ কোটি ৭ লাখ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। দিনে পানির ঘাটতি হচ্ছে ৩ কোটি ৩৩ লাখ লিটার। নগরে নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করেন বাসিন্দারা।

জলাবদ্ধতায় নাকাল

ধান-নদী-খালের বরিশাল এখন একটু বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানিতে ডুবে যায়। এমন অবস্থার জন্য দায়ী অপরিকল্পিত নগরায়ণ। নগরের খাল এবং পুকুরগুলো ভরাট করে বড় বড় ইমারত নির্মাণ করায় জলাবদ্ধতার সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে।

default-image

বরিশালে মডেল স্কুল ও কলেজ নির্মাণের নামে ভরাট করা হয়েছে বিশাল দিঘি, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল নাপিতের খাল। ভরাট করা হয়েছে ত্রিশ গোডাউনের দিঘি। অর্ধেক ভরাট হয়েছে পুলিশ লাইনসের বিশাল পুকুর। অশ্বিনীকুমার দত্তের বাসভবনের সামনে সুবিশাল পুকুরটি ভরাট হতে হতে ছোট ডোবায় পরিণত হয়েছে। কাউনিয়ার পুকুর ভরাট করে স্কুল হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, বরিশাল নগরকে বাঁচাতে হলে এসব খাল উদ্ধার ও খনন করে প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। একটি সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য নগরের জন্য এর বিকল্প নেই।

শিল্পে পিছিয়ে বরিশাল

বরিশালে বড় শিল্পকারখানা কী কী আছে—এই প্রশ্নের জবাবে দুটি নাম বলতে পারেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একটি অপসোনিনের ওষুধ কারখানা, অন্যটি খান সন্সের সিমেন্ট মিল। এর বাইরে যাঁরা একটু বেশি খোঁজ রাখেন, তাঁরা বিসিক শিল্পনগরের ফরচুন শুজ নামের একটি রপ্তানিমুখী জুতার কারখানার কথা উল্লেখ করতে পারেন।

এর বাইরে বরিশালে উল্লেখযোগ্য বৃহৎ কোনো শিল্প নেই। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পের দিক দিয়ে বরিশাল অন্য বিভাগগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। বরিশালে গ্যাস নেই। বিদ্যুতের ঘাটতিও প্রবল। উদ্যোক্তা, সস্তা শ্রম ও জমি থাকার পরও এই জেলায় শিল্পে বিনিয়োগ হয়নি।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিআই) সভাপতি সাইদুর রহমান বলেন, পায়রা বন্দর চালু হলে এই অঞ্চলে পণ্যের কাঁচামাল পরিবহন সহজ হবে। পদ্মা সেতু নির্মাণ শেষ হলে বরিশালে পণ্য তৈরি করে তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে পাঠানোর যে সমস্যা ছিল, সেটি দূর হবে। এতে বরিশালে বিনিয়োগ বাড়বে।

ধান ও ইলিশে সমৃদ্ধ

একসময়ের শস্যভান্ডার হিসেবে বরিশালের খ্যাতি ছিল। কিন্তু কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার পিছিয়ে থাকায় বরিশালের সেই সুখ্যাতি অনেকটা ম্লান হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার উপযুক্ত শস্য বিন্যাস ও জমির যথাযথ ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির কারণে পুরোনো সেই শক্তি আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে। কয়েক বছর ধরে বরিশাল বিভাগে আউশ, আমন, বোরো—তিন ফসল মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হচ্ছে।

default-image

ধানের পাশাপাশি ইলিশের নেতৃত্ব দিচ্ছে বরিশাল। দেশের মোট ইলিশের ৬৬ শতাংশের জোগানদাতা বরিশাল বিভাগ। চলতি অর্থবছরে দেশে মোট ইলিশ উৎপাদিত হয়েছে ৫ লাখ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে বরিশাল থেকে উৎপাদিত হয়েছে ৩ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক
টন ইলিশ।

‘যা আছে টিকিয়ে রাখতে হবে’

১৯৬৭ সাল থেকে বরিশাল শহরে বেড়ে উঠেছেন অধ্যাপক শাহ সাজেদা, যিনি সচেতন নাগরিক কমিটির জেলা সভাপতি। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, শহরে আগে যে প্রাণ ছিল, এখন তা নেই। তবে অন্য শহরের তুলনায় এখনো কিছুটা স্বস্তি আছে এখানে। এখন যা আছে তাকে যত্ন করে টিকিয়ে রাখতে হবে। একে বিলীন হতে দেওয়া যাবে না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন