একজন রোগীর শ্বাসকষ্ট থাকায় তাঁকে অক্সিজেন মাস্ক পরিয়ে সিলিন্ডার থেকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। তাঁর শয্যার নিচে রাখা আরও চারটি সিলিন্ডার। যেকোনো সময় লাগতে পারে শঙ্কায় এগুলো মজুত করেছেন রোগীর স্বজনেরা। পাশেই আরেক রোগীর সিলিন্ডারের অক্সিজেন প্রায় শেষ। কিন্তু চেয়েও অক্সিজেন পাচ্ছেন না স্বজনেরা। অক্সিজেনের জন্য ছোটাছুটি করছেন তাঁরা। আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে অবস্থানকালে দেখা গেল এমন দৃশ্য।
এই ওয়ার্ডে ভর্তি করোনা রোগী মনির হোসেনের ভাই এমাদুল হাসানের অভিযোগ, ‘অক্সিজেন নিয়ে যে কী অবস্থা চলছে, বলে বোঝাতে পারব না। কারও সিটের নিচে চার–পাঁচটা অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখা। আবার কেউ দরকারে চেয়েও পাচ্ছেন না। সকালে আমার ভাইয়ের অক্সিজেন শেষ হয়ে আসার পর দৌড়ে আমি নার্সদের কাছে যাই। কোথাও অক্সিজেন নেই। পরে একজন নার্স রোগীর স্বজনের মজুত করে রাখা অক্সিজেন সিলিন্ডার আমাকে দেন।’
বিভাগের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল এটি। সম্প্রতি এই হাসপাতালের করোনা ইউনিটকে ২০০ শয্যা থেকে ৩০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। আজ দুপুর পর্যন্ত ২১৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। এখানে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে ২২টি শয্যা আছে। তাঁর ২১টিতেই মুমূর্ষু রোগীরা ভর্তি। প্রতিদিনই এই হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়ছে। বাড়ছে স্বজনদের দৌড়ঝাঁপ, উৎকণ্ঠা।
আজ এক বেলা হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেল, পদে পদে অব্যবস্থাপনা। সিঁড়ি, মেঝে থেকে শুরু করে শৌচাগার—সর্বত্র নোংরা অবস্থা। হাসপাতালের সামনেই মেডিকেল বর্জ্যের ভাগাড়ে আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে বর্জ্য। দুর্গন্ধ আর ধোঁয়ায় দম আটকে আসার মতো অবস্থা। এর কাছেই নিচতলার ডান দিকে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে শতাধিক লোক অপেক্ষা করছেন নমুনা দেওয়ার জন্য।
এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু খাওয়ার পানির জন্য যেতে হয় বাইরে। দুটি নলকূপ থাকলেও তাতে পানি ওঠে না। এখানে কেউ কাউকে সহায়তা করে না। জীবন যে এত অসহায়, তা আগে বুঝিনি। এখানে এসে বুঝলাম।
হঠাৎই দেখা গেল, হাতে দুটি বড় প্লাস্টিকের বোতল নিয়ে খাবার পানির জন্য ছুটছেন রায়হান নামের এক তরুণ। শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় গত মঙ্গলবার তাঁর মাকে এখানে ভর্তি করা হয়েছে। বললেন, ‘এত বড় হাসপাতাল, কিন্তু খাওয়ার পানির জন্য যেতে হয় বাইরে। দুটি নলকূপ থাকলেও তাতে পানি ওঠে না। এখানে কেউ কাউকে সহায়তা করে না। জীবন যে এত অসহায়, তা আগে বুঝিনি। এখানে এসে বুঝলাম।’
একজন রোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘চার দিন ধরে এখানে আছি। কোনো চিকিৎসকের দেখা পাইনি। তবে নার্সরা খুব সহায়তা করেন। আন্তরিকভাবে রোগীর সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অনেক রোগীর স্বজন পাঁচ–ছয়টা করে অক্সিজেন সিলিন্ডার মজুত করে রাখছেন। এত নোংরা! শৌচাগারে তো ঢোকাই যায় না।’
হাসপাতাল সূত্র জানায়, শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি চলছে ৩৫০ শয্যার জনবল দিয়ে। অথচ এই হাসপাতালকে অনেক বছর আগে এক হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। এর ওপর করোনার জন্য ৩০০ শয্যার আলাদা একটি ইউনিট খোলা হয়েছে। পুরোনো ৩৫০ শয্যার জনবল–কাঠামো অনুযায়ী এই হাসপাতালে চিকিৎসকের মোট পদ ২২৪ জন হলেও কর্মরত মাত্র ১১৮ জন।
হাসপাতালে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই। তবে চিকিৎসক, কর্মচারী–সংকট আছে। আমরা এই সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, করোনা ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৩ জন চিকিৎসক ও ১৭ জন নার্স পালা করে দায়িত্ব পালন করেন। এই সংখ্যাও অপ্রতুল। পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক নার্স বলেন, রোগীর যে চাপ, তাতে সীমিত জনবল দিয়ে এত বড় একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে পরিপূর্ণ সেবা দেওয়া দুঃসাধ্য।
এসব বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আপাতত আমাদের হাসপাতালে অক্সিজেনের কোনো সংকট নেই। তবে চিকিৎসক, কর্মচারী–সংকট আছে। আমরা এই সংকটের কথা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’ অপরিচ্ছন্নতার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিদিন হাসপাতালে ১০ হাজার লোকের আনাগোনা। সেখানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী আছে সীমিত। এ দিয়ে এত বড় হাসপাতাল পরিচ্ছন্ন রাখা দুঃসাধ্য। তারপরও চেষ্টা চলছে।
মৃত্যুকালেও সঙ্গী অব্যবস্থাপনা
পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি উপজেলার সুর্কণ রায় (৫৬) আজ সকাল ছয়টার দিকে মারা যান। ছেলে সুমন রায় বাবার মৃত্যুর পর কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। দুপুর ১২টা পর্যন্ত লাশ হাসপাতালের শয্যাতেই পড়ে ছিল। পরে কোয়ান্টামের স্বেচ্ছাসেবীদের ফোন করলে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে এসে তাঁরা লাশ নিয়ে যান বরিশাল কেন্দ্রীয় মহাশ্মশানে। সুর্কণ রায়ের মৃত্যুর পর তাঁর মৃত্যু সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি নারী এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী।
কোয়ান্টামের বরিশাল শাখার পরিচালক ফয়সাল মাহমুদ মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময় বলেন, ‘মৃত্যুর পর একজন ব্যক্তির যেন সম্মানের সঙ্গে সৎকার হয়, সে জন্য আমরা স্বেচ্চাসেবামূলক এই কাজ করছি।’
কোয়ান্টামের স্বেচ্ছসেবক অসীম বণিক বলেন, ‘করোনার শুরু থেকেই আমরা এই হাসপাতালে প্রায় প্রতিদিন আসি। অক্সিজেনের জন্য মানুষের দৌড়ঝাঁপ, নোংরা পরিবেশ, রোগী-স্বজনদের অসহায়ত্ব, মৃত্যুযন্ত্রণা—এসব ভোলার নয়।’