বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অপরিকল্পিত শহর

শহরে গড়ে উঠেছে কয়েক শ অপরিকল্পিত দালানকোঠা, বহুতল ভবন। বেশির ভাগই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা লঙ্ঘন করে নির্মিত, পৌরসভা থেকে ছয়–সাততলার নকশা অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯ থেকে ১৯ তলার বহুতল ভবন। শহরে ১৫৫টির মতো বহুতল ভবন রয়েছে।

পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ আল মেহেদী হাসানও বললেন, শহরে ‘মহাপরিকল্পনা’ প্রণয়নের জন্য দরকার কমপক্ষে ২৫ কোটি টাকা। পৌরসভার নিজস্ব তহবিল থেকে এত টাকা ব্যয় করা সম্ভব নয়। সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) জেলার সভাপতি মাসুদার রহমান বলেন, বগুড়া শহরের আয়তন বেড়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যাও। অথচ সিটি করপোরেশন হয়নি। অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র গড়ে উঠছে দালানকোঠা, বহুতল ভবন। এখনো বৃষ্টি হলে শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় হাঁটুপানি, শহরজুড়ে জলজট লেগে যায়।

শিল্প-ঐতিহ্যের অতীত-বর্তমান

শিল্প-ঐতিহ্যের শহর বগুড়া। একসময় জামিল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ, ভান্ডারি কটন অ্যান্ড স্পিনিং মিল, তাজমা সিরামিকস ছাড়াও মেটাল, কাচ, পাটপণ্য, বস্ত্র, কৃষিপণ্যসহ হরেক পণ্য উৎপাদনের কারখানা গড়ে উঠেছিল বগুড়া শহরে। ষাটের দশকে বগুড়ার কৃষি যন্ত্রপাতি, হালকা প্রকৌশল ও ফাউন্ড্রিশিল্পের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও।

দেশের কৃষি যন্ত্রপাতির বড় একটা অংশ সরবরাহ হয় বগুড়া থেকে। এখানকার হালকা প্রকৌশলশিল্প ঘিরে বছরে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়।

উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বগুড়ায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০০টি কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা, ৭০টি নলকূপ কারখানা, ৫০০টি হালকা প্রকৌশল ও ৪২টি ফাউন্ড্রি কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণে শহরের বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ছয় শতাধিক বিক্রয়কেন্দ্র। আর এখানকার কৃষিপণ্য, মোটর পার্টস ও টিউবওয়েল রপ্তানি হয়ে থাকে ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, ভুটানসহ আরও কয়েকটি দেশে।

যানজটে নাকাল

শহরজুড়ে সড়কের ওপর অটোরিকশা ও ইজিবাইকের স্ট্যান্ড। ফুটপাত দখল করে প্রতিদিন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানি-হকাররা। রয়েছে অবৈধ গাড়ি পার্কিং। এতে দিনে–রাতে যানজটে নাকাল শহরবাসী। শহরের কয়েকজন ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, সবকিছুর নেপথ্যে অবৈধ চাঁদাবাজি। ফুটপাতে বা রাস্তায় প্রতিদিন হাজারখানেক দোকানি পসরা সাজিয়ে বসেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সাল পর্যন্ত জেলায় বিআরটিএর নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ৭ হাজার ৬৭৫। ২১ বছরের ব্যবধানে শহরে ১৯ ধরনের যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১৬ গুণ বেড়েছে। এখন নিবন্ধিত যানবাহন ১ লাখ ২১ হাজার ৬২৭টি। এর বাইরে আছে অনিবন্ধিত যানবাহন।

এ ব্যাপারে পৌরসভার মেয়র রেজাউল করিম বললেন, পৌরসভা থেকে আপাতত ব্যাটারিচালিত রিকশা লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যে পরিমাণ রিকশার লাইসেন্স দেওয়া হবে, সেগুলো সকাল-দুপুর, বিকেল-রাত কিংবা পালা করে এক দিন পরপর চলাচলের অনুমতি দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

default-image

ভাঙাচোরা সড়ক

বগুড়া পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২৬৬ কিলোমিটার পাকা সড়কের প্রায় ২০০ কিলোমিটারই বেহাল। অধিকাংশ সড়কের পিচ, খোয়া, ইট, বালু ও কার্পেটিং উঠে গিয়ে খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো সড়ক কাদাপানিতে সয়লাব।

শহরের বনানী থেকে মাটিডালি পর্যন্ত প্রধান সড়কের দুপাশে পানিনিষ্কাশনের নালা অত্যন্ত সরু। এই নালা সারা বছর ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। এদিকে করতোয়া নদীর দুপাশে অসংখ্য অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে। শহরের পুরোনো যেসব নালা নদীতে এসে মিশেছে, অধিকাংশ নালা দখলদারেরা দখল করে পাকা স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এসব নালা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, সড়কের ১৫০ কিলোমিটারের এখনই সংস্কার দরকার। কোনো কোনোটি ১৫ বছরেও সংস্কার হয়নি। এ জন্য কমপক্ষে ৭৫ কোটি টাকা দরকার। ৩২০ কিলোমিটার কাঁচা সড়কে বর্ষাকালে কাদাজলে চলাফেরা দায় হয়ে পড়ে।

বিমান উড়বে কবে!

নব্বইয়ের দশকে বগুড়ায় বিমানসেবা চালুর জন্য সদর উপজেলার এরুলিয়ায় প্রায় ১১০ একর জায়গায় বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। ১৯৯১-৯৬ সালে চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিকে বাণিজ্যিক বিমানবন্দর স্থাপন প্রকল্পে ২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিমানবন্দরে ৫ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য ও ৬০০ ফুট প্রস্থের রানওয়েসহ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ২০০০ সালের দিকে বিমানবন্দর নির্মাণকাজ শেষ হলেও বাণিজ্যিক বিমানসেবা আর চালু হয়নি। পরে সেখানে বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ স্কুল ও স্টলপোর্ট বিমানবন্দর চালু হয়।

বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালুর জন্য আরও তিন হাজার ফুট রানওয়ে সম্প্রসারণ, তেল সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং যাত্রী ও মালামাল ওঠানামাসহ অন্যান্য কাজে আরও ১০০ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য বগুড়া জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম অধিগ্রহণ শাখা থেকে ২০১৮ সালে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর আর কোনো অগ্রগতি নেই।

বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক ও বিসিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক টি এম আলী হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া। এখানে বিদেশি পর্যটক, শিল্পোদ্যোক্তা আসতে চান। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হলে বগুড়া বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক বিমানসেবা চালু করা দরকার।

ধুঁকছে করতোয়া

বগুড়া শহরকে দুই ভাগে ভাগ করেছে একসময়ের খরস্রোতা করতোয়া নদী। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে প্রাচীন এই জনপদ। তবে অতীত ঐতিহ্যের করতোয়া এখন দখলে–দূষণে মরা খাল।

শহরের ফতেহ আলী সেতুর নিচে করতোয়া নদীর ঢালে নামতেই কালো কুচকুচে পানির উৎকট দুর্গন্ধ। করতোয়া নদীর করুণ এই চিত্র দেখে অভ্যস্ত শহরের মানুষ। চেলোপাড়ার রিকশাচালক অনির্বাণ চন্দ্র বলছিলেন, ‘দুর্গন্ধের আর দ্যাকচেন কী? বৈশাখ মাস আসপার দ্যান, নদীর পানি আরও কালো কুচকুচে হবি। সারা বছর লদীর এই অবস্থা।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জেলা কমিটির সভাপতি আনোয়ারুল করিম বলেন, দখল-দূষণে করতোয়া এখন মরা খাল। দুই পাশে অবৈধ স্থাপনা গড়ে তুলে নদী সংকুচিত করা হচ্ছে। আর নদীতে ময়লা-আবর্জনা, কারখানার তরল বর্জ্য ফেলায় পানি কুচকুচে কালো হয়ে উঠেছে।

‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার’ স্টেডিয়াম

২০০৬ সালের ৩০ জানুয়ারি আইসিসি ১৮ হাজার দর্শকের ধারণক্ষমতার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে ঘোষণা করে। একই বছর স্টেডিয়ামটি আন্তর্জাতিক টেস্ট ভেন্যুর স্বীকৃতিও পায়। অথচ স্টেডিয়ামটিতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ হয় না দেড় দশক ধরে। দীর্ঘদিন ধরে অযত্ন–অবহেলায় স্টেডিয়ামের প্রেস বক্স, ভিআইপি গ্যালারি, এমনকি ক্রিকেটারদের ড্রেসিংরুমের অবস্থা এখন জীর্ণশীর্ণ। ভিআইপি গ্যালারির চেয়ার ভাঙা, নেই অধিকাংশ কক্ষের কাচও। চারপাশে গড়ে উঠেছে প্রচুর বাড়িঘর। অনেকেই যাতায়াতের রাস্তা বানিয়েছেন স্টেডিয়াম চত্বরকে।

জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই এ ভেন্যুতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ গড়াচ্ছে না।

শিক্ষায় আছে ঐতিহ্য

সাতমাথার পাশেই ইতিহাস ঐতিহ্যের সাক্ষী বগুড়া জিলা স্কুল। কয়েক শ গজ অদূরে সার্কিট হাউস সড়কে সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় (ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল স্কুল)। ১৮৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বও রয়েছেন।

১৮৬৯ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ইংল্যান্ডের রানি ভিক্টোরিয়ার ভারত সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে ‘ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৬২ সালে সরকারীকরণের পর নাম বদলে রাখা হয় ‘বগুড়া সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়’। বগুড়ার সরকারি এই দুটি বিদ্যালয় ঐতিহ্য ছড়াচ্ছে শিক্ষায়; সুনাম আর ফলাফলেও এগিয়ে।

সরকারি আজিজুল হক কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সামস্ উল আলম বললেন, বগুড়ায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন খুবই জরুরি। এ ছাড়া উত্তরবঙ্গের সেরা সরকারি আজিজুল হক কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫ হাজার। অথচ শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, পরিবহন সংকটসহ নানা প্রতিকূলতা রয়েছে।

১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য স্যার আজিজুল হকের নামে স্থাপিত সরকারি আজিজুল হক কলেজ। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ছাড়াও ২৩টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) কোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী আছে ৩০ হাজারের ওপরে।

সংস্কৃতির বাতিঘর

প্রাচীনকাল থেকেই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের শহর বগুড়া। প্রাচীন পৌরাণিক প্রেমকাহিনি ‘বেহুলার বাসরঘর’ বগুড়ার ১৩ কিলোমিটার অদূরে গোকুল মেধে। প্রাচীন বগুড়ায় পুঁথিপাঠের আসর বসত নিয়মিত। পনেরো শতকে শ্রীমদ্জ্ঞানেন্দ কুমার ভট্টাচার্য্যের সংস্কৃত ভাষায় হাতে লেখা তিনটি পুঁথির দুর্লভ পাণ্ডুলিপি গোবিন্দ কথামৃত, হিরণ্যকশিপুপদ্মপুরাণ ১৬৭ বছরের প্রাচীন উডবার্ন লাইব্রেরিতে এখনো বগুড়ার অতীত সংস্কৃতির সাক্ষী হয়ে আছে।

বগুড়া শহরের সাতমাথায় মুক্তমঞ্চ (মুজিব মঞ্চ) ঘিরে প্রতিদিন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড লেগেই থাকে। নাটক আর বড় বড় সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজন হয় শহীদ টিটু মিলনায়তনে। ‘বগুড়া ইয়ুথ কয়্যার’ আর বগুড়া থিয়েটারের কার্যালয়কে ঘিরে গান-নাটকের মহড়ায় সরগরম থাকে শহরের নওয়াববাড়ি সড়ক।

বগুড়ার সংস্কৃতিকে দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশের মঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তৌফিক হাসান। তিনি অভিনেতা, নাট্যকার, নাট্যনির্দেশক ও নাট্যসংগঠক। তাঁর হাত ধরেই বগুড়া থিয়েটার দেশ-বিদেশের মঞ্চে অসংখ্য জনপ্রিয় নাটক মঞ্চস্থ করেছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন