default-image

প্রবেশের পথটি ধনুক আকৃতির। রাস্তা ধরে সংগ্রহশালায় যাওয়ার সময় দুই পাশে পড়বে গাছের সারি—তালি পাম, পিটালি, লাতিম, কড়ই, আম, জাম, কামরাঙা, বকুল, সেগুন, বটসহ নানা গাছ। এসব গাছ পরিবেশকে সুশোভিত করেছে, গাছে গাছে পাখিদের কলকাকলি চারপাশকে করেছে মুখর। ভবনের ঠিক বাঁ পাশেই দেখা মিলবে ভাস্কর্য। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হামিদুজ্জামান খান।

এর ঠিক পাশেই শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালার উদ্বোধনী নামফলক। ১৯৭৫ সালের ১৫ এপ্রিল সংগ্রহশালাটি উদ্বোধন করেছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। তখন ভবনটি একতলা ছিল। পরে বাংলা ১৩৯৩ সনে ভবনটি পুনর্নির্মিত হয়ে দ্বিতল ভবনে পরিণত হয়।

এই ভবনের ইতিহাস সম্পর্কে জানা যায়, এটি ব্রিটিশ শাসনামলে বড় লাট সাহেবের (ভাইসরয়) এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তী সময়ে এই ভবনটির মালিকানা নেন নলিনীরঞ্জন সরকার নামের এক ব্যক্তি। দেশভাগের পর তিনি অন্যত্র চলে গেলে মুক্তিযুদ্ধের সময় পর্যন্ত বাড়িটি সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দেশ স্বাধীনের পর শিল্পাচার্যের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় ১৯৭৫ সালে সংগ্রহশালার যাত্রা শুরু হয়।

ময়মনসিংহের গুণী ব্যক্তিদের মধ্যে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন অন্যতম। তিনি তাঁর চিত্রকর্ম ও কর্মগুণে এই জেলার নাম বিশ্বমণ্ডলে পরিচিত করেছেন। তাঁর একেকটি চিত্রকর্ম যেন একেকটি জীবন্ত ইতিহাস, বাস্তবের প্রতিফলন। রংতুলির আঁচড়ে দেশের সংস্কৃতি, প্রকৃতি, জীবন-জীবিকা, মানুষ, দুর্ভিক্ষসহ নানা বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। শিল্পাচার্যের এসব চিত্রকর্ম সংরক্ষিত রয়েছে ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে কাঁচিঝুলি সাহেব কোয়ার্টার এলাকার এই সংগ্রহশালায়।

৩ দশমিক ৬৯ একর জায়গাজুড়ে প্রাকৃতিক শোভামণ্ডিত স্থানে এই সংগ্রহশালাটির অবস্থান। পুরোনো একটি দ্বিতল ভবন রয়েছে এখানে। এর দ্বিতীয় তলায় দুটি গ্যালারিতে জয়নুলের হাতে আঁকা চিত্রকর্ম, ব্যবহৃত জিনিসপত্র, আলোকচিত্র ও তাঁর সম্পর্কে বর্ণনা রয়েছে। নিচতলায় দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং এর পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, বিক্রয়কেন্দ্র, সেমিনার কক্ষ ও একটি আর্ট গ্যালারি রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়ই জয়নুলের কিছু চিত্রকর্মের নিদর্শন চোখে পড়বে। বারান্দায় তাঁর জীবদ্দশায় ঘটে যাওয়া নানা কর্মকাণ্ডের বর্ণনা পাওয়া যায়। সঙ্গে ৫৩টি সাদাকালো আলোকচিত্র; যা জয়নুলের জীবন সম্পর্কে ধারণা দেয়।

বারান্দা থেকে ডান পাশে পড়ে প্রথম গ্যালারি। প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যাবে দেয়ালে ঝোলানো জয়নুলের আঁকা বিভিন্ন চিত্রকর্মে। গ্যালারির সাজসজ্জায় রয়েছে আধুনিকতা। আলোক প্রক্ষেপণের ব্যবস্থা থাকায় গ্যালারির চিত্রকর্মগুলো চোখকে আলাদা তৃপ্তি দেয়। দ্বিতীয় গ্যালারিতে চিত্রকর্ম ছাড়াও শিল্পাচার্যের ব্যবহৃত সামগ্রী ও স্মৃতি নিদর্শনগুলো স্থান পেয়েছে।

default-image

মুখ, দুর্ভিক্ষ, স্কেচ, আলফাত্তা, প্রতিকৃতি, মেষ বালিকা, দুটি গরু, দুটি মুখ, বাস্তুহারা মা ও শিশু, প্রতীক্ষা, স্নান শেষে, কঙ্কালসার প্রভৃতি শিরোনামের প্রতিটি চিত্রকর্মই মুগ্ধতা ছড়ায়। প্রতিটি চিত্রকর্মের বিশেষত্ব আলাদা। একটির চেয়ে অন্যটি কোনো অংশেই কম আকর্ষণীয় নয়। প্রতিটি চিত্রকর্মেই যেন মুগ্ধতা ছড়ায়। এ ছাড়া ‘মনপুরা-৭০’ এবং তাঁর বিখ্যাত চিত্রকর্ম ‘জীবনসংগ্রাম’ নামের বিশালাকৃতির চিত্রকর্ম ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে প্রদর্শিত মোট চিত্রকর্মের সংখ্যা ৬২টি। এসবের মধ্যে ১৯৮২ সালে ১৭টি চিত্রকর্ম চুরি হয়ে গিয়েছিল। পরে ১৯৯৪ সালে ১০টি চিত্রকর্ম উদ্ধার করা হয়েছিল।

শিল্পাচার্যের স্বাক্ষর ছাড়াও কোন চিত্রকর্ম কী মাধ্যমে আঁকা, তার বর্ণনাও পাওয়া যায়। কাগজে লিথোগ্রাম, তুলি, কালি ও ওয়াশ, সাইনপেন, জলরং, তেলরং, টেম্পেরা, কালি ও কলম প্রভৃতি মাধ্যমে চিত্রকর্মগুলো আঁকা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে চিত্রকর্মগুলোর পাশে। শুধু তা–ই নয়, কোন চিত্রকর্ম কোন দেশের, সে সম্পর্কেও উল্লেখ রয়েছে। জার্মানি, ভিয়েনা, মেক্সিকো, লন্ডন (ইংল্যান্ড), জাপান, রাশিয়া, ইরান—এই দেশগুলোতে ভ্রমণের সময় তিনি তাঁর তুলির আঁচড়ে সেই দেশগুলোর প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন।

গ্যালারিতে চিত্রকর্মের পাশাপাশি জয়নুলের ব্যবহৃত সামগ্রীগুলো সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। চামড়ার ব্যাগ, চামড়ার জুতা, ওয়েস্ট কোট, শার্ট, সোয়েটার, হাতঘড়ি, চশমা, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ডি–লিট ডিগ্রি সনদ, বাংলাদেশ চারু ও কারুশিল্প মহাবিদ্যালয়ের শ্রদ্ধার্ঘ্য, সনদের খাপ, স্মারক ডাকটিকিটসহ খাম, তাঁর ব্যবহৃত কাঠের খাট রয়েছে এখানে। শিল্পাচার্যের ১২৭টি ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী ও স্মৃতিনিদর্শন পাওয়া যায়।

এসবের পাশাপাশি চিত্রকর্ম আঁকাআঁকির কাজে ব্যবহৃত দোয়াত, মেটাল ক্লিপ, খাগের কলম, কাঠকয়লা, মোম, ব্রাশ হোল্ডার, তারপিন তেলের বোতল, কালার প্যালিট, রংয়ের টিউব প্রদর্শন করা আছে। চিত্রকর্মগুলোকে ধরে রাখার কাজে ব্যবহৃত স্ক্রেইপার, স্প্যাচুলা ও ইজেল প্রদর্শিত আছে। এই সামগ্রীগুলোর সবই জয়নুলের সহধর্মিণী জাহানারা আবেদিন সংগ্রহশালা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছেন। শিল্পাচার্যের সংগৃহীত মাটির পুতুলগুলো এখানে রাখা আছে, আর এগুলো হস্তান্তর করেছিলেন তাঁর ছেলে ময়নুল আবেদীন।

চিত্রকর্ম প্রদর্শনী ছাড়াও এই সংগ্রহশালায় প্রথম থেকে ১০ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের চিত্রকর্ম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। জয়নুল শিশু চারুপীঠের অধীনে প্রায় সাড়ে তিন শ শিক্ষার্থী বর্তমানে ভর্তি আছেন বলে জানিয়েছেন সংগ্রহশালার উপ-কিপার মুকুল দত্ত। এ ছাড়া বছরে শিশু–কিশোরদের অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলোতে মোট ১২টি চিত্রকর্ম প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। প্রতি বছরের ২৯ ডিসেম্বর জয়নুলের জন্মবার্ষিকীতে বড় পরিসরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সংগ্রহশালাটি জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছে। এরপর থেকে সংগ্রহশালাটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন হয় এবং জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়ে আসছে।

দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সংগ্রহশালায় সারা বছরই দর্শনার্থীদের ভিড় থাকে। শনি থেকে বুধ—প্রতিদিন সকাল সাড়ে দশটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বেলা আড়াইটা থেকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে। বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক বন্ধ। কোভিড পরিস্থিতিতে দর্শনার্থী প্রবেশ সাময়িক বন্ধ রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৪ হাজার ৮৪৬ দর্শনার্থী পরিদর্শন করেছেন।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন