বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আমিনা ও আঁখির বাবা আলমগীর হোসেন রিকশাভ্যান চালান। মা আরজিনা বেগম গৃহিণী। দুজনই নিরক্ষর। এ দম্পতির আতিকুর রহমান নামের একটি ছেলে রয়েছে। তিনি নওগাঁর একটি কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে পড়াশোনা করছেন। তাঁদের বাড়ি রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার পকিহানা গ্রামে।

এলাকার কয়েক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আলমগীরের সম্পদ বলতে তিন শতক মাটিতে দুটি ঘর। নেই কোনো আবাদি জমি। রিকশাভ্যান চালিয়ে উপার্জিত অর্থে অতিকষ্টে তিন ছেলেমেয়ের পড়াশোনাসহ পাঁচ সদস্যের সংসার চালান তিনি।
গতকাল রোববার বিকেলে ওই দুই বোনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাবা আলমগীর বাড়িতে নেই। জানা গেল, তিনি রিকশাভ্যান নিয়ে সাতসকালে বের হয়েছেন। চালসহ বাজার নিয়ে ফেরার পর হবে রান্না, হবে রাতের খাওয়া। দুই বোন ও তাঁদের মায়ের সঙ্গে কথা বলার একপর্যায়ে আলমগীর বাড়িতে আসেন।

আরজিনা বলেন, ‘ভাই বাচ্চা তিনটাক পড়াচ্ছি অনেক কষ্ট করে। একটা লোক (স্বামী) সারা দিন ভ্যান টানিয়া কামাই করে। তাক দিয়া খাওয়া, বাচ্চাদের পড়ানো কি সম্ভব! বাচ্চাদের এই পর্যন্ত নিয়ে আসতে কত কষ্ট–যন্ত্রণা প্রতিবেশীদের কটূক্তি সহ্য করতে হইছে, সেটা বলে শেষ করা যাবে না।’ এরপর তিনি শাড়ির আঁচলে চোখ মোছেন।
কথা বলে জানা গেল, অভাবের সংসারে পড়াশোনার খরচ জোগানোর ভয়ে আলমগীর এসএসসি পাশের পর দুই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু স্ত্রী ও মেয়েরা রাজি না হওয়ায় বিয়ে দিতে পারেননি।

আরজিনা বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে আগলে রেখে মেয়ে দুইটাকে এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখন তাদের ভর্তি ও বাইরে থাকা–খাওয়ায় প্রতি মাসে অনেক টাকার দরকার। তাদের বাবা সেই টাকা কোনোভাবেই জোগান দিতে পারবে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমিনা ভর্তি হতে কান্নাকাটি শুরু করে। কিন্তু কোনোভাবেই টাকা জোগাড় হচ্ছিল না। ভর্তির শেষের দিকে এক আত্মীয়ের কাছে সাত হাজার টাকা ধার নিয়ে তাকে ভর্তি করাইছি। এ টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারিনি। এখন ছোট মেয়েটাকেও ভর্তি করাতে হবে। টাকার চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারছি না। মেয়ে দুইটাও চিন্তায় শুকিয়ে গেছে।’

আমিনা বলেন, ‘বাবা অনেক কষ্ট করে এইচএসসিতে এক সেট বই কিনে দিয়েছিল। একটা বই দুই বোন মিলে ভাগাভাগি করে পড়েছি। বড় সমস্যা হয়েছিল পরীক্ষার রাতে। শেষ পর্যন্ত বই টানাটানি করে পড়া নিয়ে দুই বোনের মধ্যে কখনো মনোমালিন্য হতো। পরীক্ষার রাতে কখনো ঠিকমতো বই পড়তে না পেরে কান্নাকাটি করতাম। পরীক্ষা নিয়ে অনেক টেনশন হতো। তবুও চেষ্টা করেছি। পড়াশোনা ছাড়িনি।’

আঁখি বলেন, পরীক্ষার রাতে বই পড়া নিয়ে কখনো কখনো দুই বোন ঝগড়া করতাম। সংসারে অভাব। খেয়ে না খেয়ে দিন চলে। বাবা আমাদের বিয়ে দিয়ে হালকা হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মা ও আমরা রাজি হইনি। অনেক কষ্টে এ পর্যন্ত এসেছি। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার টাকা নেই। দুই বোন মেসে থেকে পড়াশোনা করলে প্রতি মাসে ১০-১২ হাজার টাকা লাগবে। এ টাকা বাবার পক্ষে জোগান দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। হয়তো টাকার কাছে পড়াশোনায় আমাদের হার মানতে হবে।’

আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ছইল তিনটা খালি পইড়বার (পড়াশোনা করতে) চায়। মুই ভ্যান চলাও অত টাকা কোনটে পাও। সেই জন্যে বেটি দুইটাক আগোত বিয়াও দিবার চাচনু। এদ্দিন (এত দিন) ওরা (মেয়েরা) বাড়িত থাকি কষ্ট করি পড়ছে। এ্যালা বাইরোত থাকলে মাসে মাসে ওমার (মেয়েদের) থাকা–খাওয়ার টাকা মুই কোনটে পাইম? বেটাটা (ছেলেটা) নেজে কামাই করি পড়োচে। টাকার অভাবোত বেটি দুইটার আর বুজি পড়া হবার নেয়।’

বদরগঞ্জ মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ বিমলেন্দু সরকার বলেন, ‘ওই দুই বোন পড়াশোনায় ভালো ছিল। আমরা কলেজে তাদের বেতন মওকুফ করে দিয়েছিলাম। পড়ার সুযোগ পেলে ওরা ভবিষ্যতে ভালো কিছু করবে।’

দুই বোনকে সহযোগিতা করা যাবে ০১৭৯২১৩১৪৯৫ (বিকাশ নম্বর)।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন