পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার বালিপাড়া গ্রামের হাবিবুর রহমান (৭৫) চাকরি শেষে সারা জীবনের সঞ্চয় ৩২ লাখ টাকা এহসান গ্রুপে আমানত রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ‘লাখে দুই হাজার টাকা লভ্যাংশ দেওয়ার কথা বলে আমার সব টাকা জমা নেওয়া হয়। প্রথম কয়েক বছর মুনফা পেয়েছিলাম। আড়াই বছর ধরে মুনফা পাচ্ছি না। আমানতের টাকাও ফেরত পাচ্ছি না।’

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার কুমারখালী গ্রামের মাহমুদা বেগম বলেন, ‘স্বামীর বিদেশ থেকে পাঠানো ১১ লাখ টাকা এহসান গ্রুপে জমা রেখেছিলাম। স্বামীর সঙ্গে এটা নিয়ে মনোমালিন্য চলছে। টাকা উদ্ধার করে সদস্যদের ফেরত দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিআইডির এক কর্মকর্তা বলেন, রাগীব আহসান ও তাঁর ভাইদের নামে গ্রাহক-কর্মীদের করা চারটি মামলা এবং অর্থ পাচার আইনে করা মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি। এসব মামলার তদন্তে পিরোজপুরে পাঁচটি ব্যাংকে এহসান গ্রুপের ৩০টি অ্যাকাউন্ট পেয়েছে সিআইডি। এসব অ্যাকাউন্টে ১৫ লাখ টাকা সঞ্চয় আছে। গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে এহসান গ্রুপ নূর-ই-মদিনা ইন্টারন্যাশনাল ক্যাডেট একাডেমি, নূর জাহান মহিলা মাদ্রাসা, পিরোজপুর বস্ত্রালয়-১ ও ২, আল্লারদান বস্ত্রালয়, মক্কা এন্টারপ্রাইজ, বিসমিল্লাহ ট্রেডার্স, সাহাবা হজ কাফেলা ও এহসান সাউন্ড সিস্টেম নামে নয়টি প্রতিষ্ঠান খুলে সেগুলোতে বিনিয়োগ করে। অনুসন্ধানে রাগীব আহসান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামে পিরোজপুর শহরে তিনটি পাঁচতলা ভবন ও এক একর জমি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, গ্রাহকের টাকায় এসব ভবন ও জমি কেনা হয়েছে।

গ্রাহকের কাছ থেকে দুই কোটি টাকা তুলে দিয়েছিলেন এহসান গ্রুপের মাঠকর্মী বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার চিংড়খালী গ্রামের আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমানত রাখা গ্রাহকদের বেশির ভাগই দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ। তাঁরা কষ্ট করে জমানো টাকা মুনাফা পাওয়ার আশায় এহসান গ্রুপে আমানত রেখেছিলেন। এহসান গ্রুপের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি করে এবং আত্মসাৎ করা টাকা আদায় করে গ্রাহকদের ফেরত দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাই।’

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে রাজধানীর তোপখানা রোড থেকে এহসান গ্রুপের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান ও তাঁর ভাই আবুল বাশারকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। একই দিন বিকেলে পিরোজপুর সদর থানা–পুলিশ রাগীব আহসানের দুই ভাই মাহমুদুল হাসান ও খাইরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। আসামিরা এখন কারাগারে। তাঁদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় ছয়টি মামলা হয়েছে। ওই সময় র‍্যাব দাবি করেছিল, এহসান গ্রুপ গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৮ সালে রাগীব আহসান পিরোজপুরে এহসান মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামের একটি সমবায় সমিতি খুলে গ্রাহকদের কাছ থেকে আমানত নেওয়া শুরু করেন। এভাবে পিরোজপুর, বাগেরহাট ও ঝালকাঠি জেলার কয়েক হাজার গ্রাহকের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি টাকা তোলা হয়। ২০১৯ সালের জুলাই থেকে গ্রাহকদের মাসিক মুনাফা ও আমানতের টাকা ফেরত দেওয়া বন্ধ করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির প্রথম আলোকে বলেন, এহসান গ্রুপ গ্রাহকের কাছ থেকে কী পরিমাণ টাকা নিয়েছে, কত টাকা সরিয়েছে এবং গ্রুপের সম্পদের তথ্য অনুসন্ধান করা হচ্ছে। গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে আদালত ও সরকার সিদ্ধান্ত নেবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন