সুখানপুকুর নতুনপাড়ার আনোয়ার মোল্লা ট্রাকচালকের সহকারী। স্ত্রী-সন্তান, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে সাত সদস্যের সংসার। নেতাদের কাছে ধরনা দিয়েও পাননি সাশ্রয়ী মূল্যে টিসিবির পণ্য কেনার ফ্যামিলি কার্ড।

দরিদ্ররা না পেলেও টিসিবির কার্ড দিয়ে পণ্য কিনেছেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মী ও তাঁদের স্বজনেরা। সুখানপুকুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক ও পারকাঁকড়া (ভাঙ্গিরপাড়া) গ্রামের আবদুল মালেক পেশায় কাঠ ব্যবসায়ী। সুখানপুকুর রেলওয়ে বাজারে ক্রোকারিজ ও ইলেকট্রনিক পণ্যের ব্যবসা আছে তাঁর। টিসিবির পণ্য কেনার ফ্যামিলি কার্ডের তালিকায় যুবলীগের এই নেতার নাম আছে তালিকার ৩৬৯ নম্বরে। সচ্ছল ব্যবসায়ী হলেও তালিকায় তাঁর পেশা ‘দিনমজুর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু আবদুল মালেক একা নন, দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তাঁর দুই ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ছাড়াও পরিবারের অন্তত ছয়জনের নামে টিসিবির পণ্য তুলে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে সুখানপুকুর ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল মালেক প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে টিসিবির পণ্য তুললেও তা নিজে খাইনি, পণ্য তুলে এলাকার অসচ্ছল ব্যক্তিদের মধ্যে বিতরণ করেছি।’

টিসিবির তালিকার ৩২ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে গাবতলীর নজরারপাড়া গ্রামের রেজাউল করিমের নাম। তালিকায় রেজাউল করিমের পেশাও ‘দিনমজুর’ বলে উল্লেখ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেজাউল করিম সুখানপুকুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। রেজাউলের আসবাবের ব্যবসা রয়েছে। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও রেজাউল করিম ফোন ধরেননি।

মহিষবাথান গ্রামের নারায়ণ চন্দ্র রায় ও অসীমা বালার নাম রয়েছে টিসিবির কার্ড পাওয়া ব্যক্তিদের তালিকায়। তাঁদের পেশা ‘দিনমজুর’ ও ‘গৃহিণী’ উল্লেখ রয়েছে। টিসিবির তালিকায় ৩৯৩ ও ৩৯৪ নম্বরে রয়েছে তাঁদের নাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণ রায় ও অসীমা বালা সুখানপুকুর ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নিবিড় চন্দ্র রায়ের বাবা-মা।

default-image

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বলেন, নারায়ণ চন্দ্র পেশায় সচ্ছল কৃষক। নিজস্ব পাঁচ-ছয় বিঘা জমি আছে। ছাত্রলীগ নেতা নিবিড় চন্দ্র রায় প্রভাব খাটিয়ে তাঁর বাবা-মায়ের নামে টিসিবির কার্ড নিয়ে পণ্য তুলেছেন। বাবা–মা ছাড়াও নিবিরের মামা প্রণব কুমার সরকারের নামও রয়েছে টিসিবির কার্ডের তালিকায়। নিবিড় চন্দ্র রায়ের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনিও ফোন ধরেননি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাহানুর ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তালিকা তৈরির দায়িত্ব পেয়ে অসচ্ছল পরিবারের বদলে কিছু নেতা নামে–বেনামে অর্ধেক কার্ড নিয়ে টিসিবির পণ্য তুলে নিয়েছেন। এতে শুধু দলের বদনামই হয়নি, প্রধানমন্ত্রীর মহতী উদ্যোগকেও তাঁরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। এসব নেতার বিরুদ্ধে দলীয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) বগুড়ার সভাপতি মাসুদার রহমান বলেন, এত দিন টিসিবির ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে পণ্য বিক্রির কার্যক্রম সাধারণ ভোক্তারা উপকৃত হয়েছেন। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ হয়েছে। অসচ্ছল মানুষের বদলে অনেক জায়গাতেই টিসিবির পণ্য পেয়েছেন সচ্ছল নেতারা।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন