default-image

শীতপ্রধান দেশে ফুলটি হরহামেশাই দেখা যায়। কিন্তু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশে এর দেখা পাওয়া প্রায় অসম্ভব। ফুলটির নাম টিউলিপ। ‘প্রায় অসম্ভব’কেই সম্ভব করে দেখিয়েছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কেওয়া পূর্বখণ্ড গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন। তাঁর বাগানজুড়ে ফুটেছে রাজসিক সৌন্দর্যের ফুল টিউলিপ।

গতকাল শুক্রবার সকালে দেলোয়ারের টিউলিপ ফুল দেখতে আসেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবদুল মুঈদ। বাগান পরিদর্শন করে তিনি বলেন, ‘এ দেশে এই প্রথম টিউলিপ ফুলের চাষ দেখলাম। রপ্তানিযোগ্য এ ফুল ফুটিয়ে ফুলচাষি দেলোয়ার অবাক করেছেন।’

দেলোয়ারের এই সফলতায় দেশে টিউলিপ ফুল চাষের আশা জাগছে বলে মনে করছে কৃষি বিভাগ। আবদুল মুঈদ বলেন, নেদারল্যান্ডস এই ফুল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে। এ দেশে টিউলিপ চাষ করতে যা যা প্রয়োজন, সব করা হবে। বাংলাদেশে টিউলিপ ফুল আদৌ চাষ করা সম্ভব কি না, এটা একটা চিন্তার বিষয় ছিল। কারণ, এটি ঠান্ডার দেশের ফুল। বাংলাদেশে তো গরম আবহাওয়া। তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত—সবকিছু মিলিয়ে এ ফুল চাষ বাংলাদেশে যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। এত প্রতিকূলতার পরও দেলোয়ার তাঁর অনুসন্ধিৎসু উদ্যোগ নিয়ে খামারে টিউলিপ ফুল ফুটিয়েছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, কৃষিবিজ্ঞানীদের এটা নিয়ে আরও গবেষণা করা দরকার। তিনি কৃষিবিজ্ঞানী ও মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন। যদি মনে হয়, এ ফুল দেশে ভালোভাবে চাষ সম্ভব, তাহলে আমরা এর চাষ আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। এটিকে তখন চাষ করা হবে রপ্তানিপণ্য হিসেবে।’

দেলোয়ারের ‘মৌমিতা ফ্লাওয়ার্স’ নামের খামারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত টিউলিপ সারি সারি ফুটে রয়েছে। কয়েক দিন ধরেই একের পর এক ফুটতে শুরু করেছে এই ফুল। বেগুনি, হলুদ ও লাল—এই তিন ধরনের ফুল ফুটেছে বাগানে। এই ফুল ফোটাতে দেলোয়ার উচ্চ কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন বলে জানান। ফুলগুলো একটি শেডের নিচে চাষ হচ্ছে। শেড একটি বিশেষ ধরনের পলিথিন দিয়ে ঢাকা। আর চারপাশ ঢাকা ছোট ছিদ্রযুক্ত নেট দিয়ে। পুরো শেডটিতে বিশেষ পদ্ধতিতে তাপ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ করা হয় সূর্যের আলো।

টিউলিপের চাষ নিয়ে দেলোয়ার প্রথম আলোকে শোনান তাঁর স্বপ্নের কথা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে কোথাও টিউলিপের চাষ হচ্ছে না। তাই এই ফুলকে তিনি দেশে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে দিতে কাজ শুরু করেছেন। সম্প্রতি নেদারল্যান্ডস থেকে তিনি ১ হাজার ১০০টি টিউলিপ গাছের বাল্ব (বীজ হিসেবে ব্যবহৃত রূপান্তরিত কাণ্ড) নিয়ে আসেন। সেগুলোকে রোপণ করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখেন। নিয়মিত পরিচর্যা আর প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে প্রথমবারেই পেয়ে যান সফলতা। দেলোয়ার বলেন, এ দেশে গোলাপ, রজনীগন্ধা, গ্লাডিওলাসসহ বিভিন্ন ফুল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে ভিন্ন সৌন্দর্যের টিউলিপ ফুলের পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাপক চাহিদা আছে। বাংলাদেশের ফুলের বাজারে গোলাপসহ অন্যান্য ফুলের ভিড়ে ব্যাপকভাবে টিউলিপ ছড়িয়ে দিতে চান তিনি। তাঁর বিশ্বাস, এ দেশে টিউলিপের বড় বাজার তৈরি করা সম্ভব। বড় পরিসরে উৎপাদনে যাওয়াও সম্ভব।

default-image

দেলোয়ার জানান, এর আগে দেশে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে জারবেরা ফুল চাষ শুরু করেছিলেন তিনিই। এখন জারবেরা ফুল বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় চাষ হচ্ছে। জারবেরার ব্যবহৃত হচ্ছে এখন প্রায় সব অনুষ্ঠানে। সেটিও তিনি নেদারল্যান্ডস থেকে নিয়ে এসে বাংলাদেশ বিশেষ পদ্ধতিতে চাষ শুরু করেছিলেন। এসব চাষাবাদের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার।

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মূয়ীদুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘টিউলিপ ফুলের চাষ এ দেশে বড় পরিসরে এখনো শুরু হয়নি। ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই বাড়িতে টবে চাষ করছেন শোনা যায়। কিন্তু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে টিউলিপ ফুল চাষে দেলোয়ার যে স্বপ্ন দেখালেন, তা অত্যন্ত সম্ভাবনাময়।’

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কবিতা আঞ্জুমান আরা বলেন, ‘আমাদের উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রেও প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫টি টিউলিপ ফোটে। এগুলো মূলত ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালো ফলন দেয়। তবে ব্যাপকভাবে দেলোয়ারের ফুলের বাগানে ফোটার খবরে এ ফুল চাষে একটা সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে এ দেশে ফুল ফুটলেও পরবর্তীকালে রোপণের জন্য টিউলিপগাছের বাল্ব সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেই। একটা নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় বাল্ব সংরক্ষণ করতে হয়। তাই এটা টিউলিপ চাষের বড় সীমাবদ্ধতা।’

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0