বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের পাঁচ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সদস্যরা শুধু এলাকায় ছোট আকারের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, কবরস্থান, শ্মশানের মতো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার তালিকা প্রণয়নের কাজ করেছেন। এই তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে উপজেলা পরিষদের সঙ্গে জেলা পরিষদ সদস্যদের কোনো সমন্বয় ছিল না।

জেলা পরিষদ সদস্য (ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা থেকে) একরাম হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, চেয়ারম্যানের নির্বাহী ক্ষমতা আছে। সদস্যদের কোনো ক্ষমতা নেই। উপজেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ সদস্যদের কেউ চেনেও না। তিনি বলেন, জেলা পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সবাই বুঝতে পেরেছেন তাঁদের কাজের সুযোগ নেই।

স্থানীয় সরকারের সর্বোচ্চ স্তরের প্রতিষ্ঠান জেলা পরিষদ। আইন অনুযায়ী, একজন চেয়ারম্যান, ১৫ জন সদস্য ও সংরক্ষিত আসনের ৫ জন নারী সদস্য নিয়ে জেলা পরিষদ গঠিত। চেয়ারম্যান ও এই ২০ জন সদস্যকে নির্বাচন করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার সিটি করপোরেশন, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। ২০০০ সালে প্রথম জেলা পরিষদ আইন প্রণীত হলেও প্রথম নির্বাচন হয় ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর।

আইনে জেলা পরিষদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেওয়া থাকলেও পরিষদ সদস্যদের দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা দেওয়া ছিল না। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম কয়েক মাস পরিষদ সদস্যরা ঘুরেফিরেই সময় কাটিয়েছেন। নির্বাচনের পাঁচ মাস পর ২০১৭ সালের মে মাসে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, সদস্য ও সংরক্ষিত সদস্যদের দায়িত্ব ও কার্যাবলি বিধিমালার প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ।

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সংরক্ষিত সদস্য আরজুনা কবীর জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক। সদস্য হিসেবে কেমন কাজ করছেন, প্রশ্নের উত্তরে একরাশ হতাশা প্রকাশ করলেন আরজুনা। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব ছিল, কিন্তু কাজ করতে পারি নাই। সদস্যদের আসলে কাজের কোনো সুযোগ নাই। শুধু প্রকল্পের নাম দিয়েছি।’

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা মূল্যমানের ৬০০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। এসব প্রকল্পের নাম প্রস্তাব করেন জেলা পরিষদ সদস্যরা।

জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউসুফ খান পাঠান ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। তিনি বলেন, গত পাঁচ বছরে প্রায় শতকোটি টাকার নানা ধরনের কাজ করা হয়েছে জেলা পরিষদ থেকে। সদস্যদের তালিকার ভিত্তিতেই প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সবাইকে নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে একটি পক্ষ নানাভাবে সদস্যদের ইন্ধন জুগিয়েছে।

চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সদস্যদের অনাস্থা

ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইউসুফ খান পাঠানের সঙ্গে জেলা পরিষদের সদস্যদের টানাপোড়েন চলছে অনেক দিন ধরে। গত বছর একাধিক পরিষদ সভা বর্জন করেন সদস্যরা। গত বছর সেপ্টেম্বরে ১৭ জন সদস্য মিলে চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে অনাস্থা প্রস্তাব দেন।

পরিষদের সদস্যরা অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান নির্দিষ্ট এলাকায় কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে অন্য এলাকাকে বঞ্চিত করেছেন। ঠিকাদার ও প্রকল্প কমিটির সভাপতির কাছ থেকে উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে কমিশন নিচ্ছেন। জেলা পরিষদের কাজে আত্মীয়স্বজনকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান।

জেলা পরিষদ সদস্য একরাম হোসেন বলেন, পরিষদের এক সভায় চেয়ারম্যানের স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করেন সদস্যরা। অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়ার পর জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক করে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মিলিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অবস্থার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। পরিষদের মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় সদস্যরাও আর এসব নিয়ে কিছু বলছেন না।

উপজেলার সঙ্গে সমন্বয় নেই

উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম তদারক করার দায়িত্ব জেলা পরিষদের সদস্যদের। কিন্তু বাস্তবে তা করতে পারেন না জেলা পরিষদ সদস্যরা। জেলা পরিষদের বরাদ্দের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে যেসব উন্নয়নকাজ হয়, সেগুলোও উপজেলা পরিষদের সঙ্গে সমন্বয় করে হয় না।

ফুলপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, জেলা পরিষদের কাজের সঙ্গে উপজেলার কোনো সমন্বয় নেই। জেলা পরিষদ সদস্য কী কী করেন, সেটা উপজেলা পরিষদ জানে না। উপজেলা পরিষদ কী কাজ করছে, সেটাও জেলা পরিষদ সদস্য তদারকি করেন না।

জেলা পরিষদ আসলে ‘পুনর্বাসনকেন্দ্র’

স্থানীয় সরকারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে জেলা পরিষদে নেই। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্রিটিশ শাসনামলে জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকারে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ছিল। অনেক ভালো কাজ হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। এখন জেলা পরিষদই একটি অগুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। সেই ব্যবস্থায় পুরো ক্ষমতা চেয়ারম্যানের, সদস্যরা ভূমিকাহীন।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ বলেন, এখন জেলায় বেশির ভাগ কাজ হয় জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে। জেলা পরিষদ আসলে রাজনীতিবিদদের পুনর্বাসনকেন্দ্র। তিনি বলেন, জেলা পরিষদে যেমন সদস্যদের ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই, তেমনি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরাও ক্ষমতাহীন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন