বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এই শহরে রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন

১৯১৯ সালের নভেম্বর মাসে তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সিলেটে এসেছিলেন। সে স্মৃতি প্রখ্যাত লেখক সৈয়দ মোস্তফা আলী (১৮৯১—৭ আগস্ট ১৯৭৭) তাঁর আত্মকথা (১৯৬৮) বইয়ে লিখেছেন। সৈয়দ মোস্তফা আলী হচ্ছেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর বড় ভাই। আত্মকথায় সৈয়দ মোস্তফা আলী লিখেছেন, ‘কবি শ্রীহট্ট বাজার স্টেশনে পৌঁছলে পরে তাঁকে বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করা হয়।Ñ তখনও কীনব্রীজ তৈরি হয়নি ও শ্রীহট্ট-শিলং রাস্তা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে পৌঁছলে একখানা সুসজ্জিত জুড়িন্দা নৌকোয় তাঁকে নদী পারাপার হতে হয়। জুড়িন্দায় রবীন্দ্রনাথের কাছেই চেয়ারে উপবিষ্ট ছিলেন শ্রীহট্টের সুসন্তান মৌলবী আবদুল করিম সাহেব, অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি খান বাহাদুর আবদুল মজিদ সাহেব (কাপ্তান মিয়া) ও আমরা ছাত্ররা অনেকেই। অনেকে জুড়িন্দায় স্থান না পেয়ে বারকী নৌকায় (এক রকম দ্রুতগামী নৌকা, যাতে খেয়ার মাশুলের ডাবল দিতে হতো) পার হলেন। সুরমা নদীর উত্তর পারে আসার পর রবীন্দ্রনাথকে একখানা ফিটন গাড়িতে বসানো হলো আর তাঁর পাশে বসলেন আবদুল করিম খান। ছেলেরা ফিটনের ঘোড়া খুলে নিজেরা টানতে লাগলেন। কবির সাথে কবির একমাত্র পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবীও ছিলেন। তাঁরা অন্য গাড়িতে আসলেন। শ্রীহট্টের উত্তর দিকে নয়াসড়কের পাদ্রী সাহেবের বাংলোয় কবিকে নেওয়া হলো।’

আলোকিত দুই পরিবার

মরমি কবি হাসন রাজার বংশধর ও প্রখ্যাত লেখক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের (১ জানুয়ারি ১৯০৮-১ নভেম্বর ১৯৯৯) মৃত্যুর পর ২০০৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ সোনাঝরা দিনগুলো। এ বইয়ে সিলেট শহরের দুটি আলোকিত পরিবারের কাহিনি পাওয়া যায়। আজরফ লিখেছেন, ‘সিলেটের কালচারের সঙ্গে সিলেটের রাজবাড়ির রয়েছে নাড়ির যোগ। সিলেটের শিক্ষাবিস্তারে রাজা গিরীশচন্দ্র রায়ের অবদান অতুলনীয়। তাঁর মাতামহ মুরারী চাঁদ রায়ের নামে এমসি কলেজে রাজা গিরীশচন্দ্র উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করে তিনি সিলেটে উচ্চশিক্ষার যে ব্যবস্থা করেছেন, তার কোনো দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত সিলেটে নেই। এ পরিবার আবার কোনো ভুঁইফোড় পরিবার নয়। এ পরিবার সিলেটের খাঁটি দেওয়ান পরিবার। ইংরেজ শাসনের পূর্বে মুঘল আমলেও এঁরা ছিলেন দেওয়ান অর্থাৎ উচ্চপদস্থ রাজস্ব সংগ্রাহক। এ বংশেরই দেওয়ান মুরারী চাঁদ ছিলেন মুঘল যুগে খুব প্রতিপত্তিশালী অফিসার।’

দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ আরও লিখেছেন, ‘সিলেট শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত মজুমদারির নাম এখন প্রায় বিলুপ্ত, অথচ কোনো এক সময় মজুমদার পরিবারের লোকেরাই ছিলেন সিলেটের বংশানুক্রমিক জননেতা। এ বংশের লোকেরা ছিলেন কোলকাতা ঠাকুরবাড়ির মতো কালচারের ধারক, বাহক ও জনক। গ্রামের জমিদাররা এঁদের কাছ থেকে আচার-ব্যবহার শিক্ষা নিতেন।’

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় শেষে

১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বরের সিলেট শহরের একটা বর্ণনা পাওয়া যায় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নেত্রী সুহাসিনী দাসের (২১ আগস্ট ১৯১৫—৩০ মে ২০০৯) সেকালের সিলেট (২০০৫) বইয়ে। তিনি লিখেছেন, ‘সমগ্র শহর যেন শোকে পাথর হয়ে গেছে। যেদিকে তাকাই, শুধু ধ্বংসরাজির লীলা। শহরের লোকসংখ্যা খুবই কম। দেশপ্রেমিক মানুষজন “জয় বাংলা” বলে মাঝে মাঝে বুকফাটা স্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলছে প্রায় জনমানবশূন্য এই শহর। তারাই শহরকে জাগাচ্ছেন যেন ভোরের পাখি হয়ে। ভয়ে ভয়ে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হই। প্রায় বাড়িই মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাকা বাড়িগুলো দাঁড়িয়ে থাকলেও, সেগুলোর দরজা-জানালা খোলা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, লুট করা হয়েছে এসব বাড়িঘর। আমার বাড়িতেও মালপত্র বলতে কিছুই ছিল না। উমেশচন্দ্র-নির্মলাবালা ছাত্রাবাসে গিয়ে দেখি, জনমানবহীন জায়গা, সবকিছু খোলা। শহরটা চেনাই যাচ্ছে না। সমস্ত শহর ঘুরে বেড়াই, দোকানঘরের মালপত্র যত্রতত্র ছড়ানো-ছিটানো।’

default-image

বাড়িগুলো ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ

শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া সুরমা নদীতে একসময় প্রতিদিন স্টিমার চলত বলে চার পুরুষের কথা (২০০৪) বইয়ে জানিয়েছেন প্রখ্যাত নারীনেত্রী হেনা দাস (১২ ফেব্রুয়ারি ১৯২৪—২০ জুলাই ২০০৯)।

হেনা দাস তাঁর শৈশব-কৈশোরে দেখা শহরের বাড়িঘরের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে, ‘শহরের বাড়িগুলোও ছিল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। ডেপুটি কমিশনার, এসপি প্রভৃতি পদস্থ বড় আমলা ও বিভাগীয় বড় কর্তাদের আবাসিক বাড়িগুলো ছিল ছনে ছাওয়া চমৎকার সব বাংলো। মধ্যবিত্ত বাসিন্দাদের অধিকাংশ বাড়ি ছিল পাকা ভিটের উপর টিনের ছাউনি। দেয়ালের নিচের অংশ পাকা, মাঝের অংশ কাঠ দিয়ে তৈরি, উপরের অংশ ছিল ইকরের তৈরি। তার ওপর সাদা চুনকাম।...তবে শহরে সামান্য কয়েকজন খুব ধনী ব্যক্তি ও বড় জমিদারের বাড়ি ছিল ভিন্ন ধরনের। তাঁদের বাড়িতে ছিল বিরাট আধুনিক পাকা দালান।’

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী (১ জানুয়ারি ১৯৩১—২৩ জুলাই ২০১৬) তাঁর আত্মকথা (২০১১) বইয়ে শুনিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস। তিনি লিখেছেন, ‘১৯৮৬ সালের শুরু থেকে সিলেটবাসীরা সিলেটে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট এরশাদ সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা না দেন, ততক্ষণ পর্যন্ত সিলেটের জনগণ তাঁকে কিংবা তার সরকারের কোনো মন্ত্রীকে সিলেটে আসতে দেবে না। অতঃপর জেনারেল এরশাদ প্রতিশ্রুতি দিতে রাজি হলে তাঁকে সিলেটে যেতে দেওয়া হলো এবং মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত একটি জনসভায় তিনি সিলেটে একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ওয়াদা করেন।’

ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরী আরও লিখেছেন, ‘অবশেষে রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ ২৫ আগস্ট ১৯৮৬ তারিখে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামক একটি অধ্যাদেশ জারি করেন।’

শহরের আশপাশে ছিল বনজঙ্গল

সিলেটের কৃতী সন্তান সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত (জন্ম: ২৫ জানুয়ারি ১৯৩৪) তাঁর আত্মজৈবনিক গ্রন্থ সোনালি দিনগুলি (২০১৬)-তে শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিচারণা করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমার কৈশোরে সিলেটে তিন-চারটি দোকান ছিল বিলেতি দোকান নামে পরিচিত।... মিষ্টির দোকান বলতে ছিল শুধু বান্ধব মিষ্টান্ন ভান্ডার। মুসলমানদের হোটেল ছিল লালদিঘির পাড়ের আবাসিক মোবারক হোটেল এবং বন্দরবাজারের মশরফিয়া হোটেল।’

সিলেটে সেকালে বন্দরবাজারের ‘ছায়াবাণী’ (পরে রংমহল) এবং লালবাজারে ‘লালকুঠি’ নামে দুটি সিনেমা হল ছিল বলে জানিয়েছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর কৈশোরে বন্দরবাজারে চন্দ্রনাথ লাইব্রেরি ও লালদিঘির পাড়ে আর্ল লাইব্রেরি ছিল। মাঝেমধ্যে শহরে বা শহরতলিতে তখন সার্কাস পার্টি আসত বলেও তিনি আত্মস্মৃতিতে লিখেছেন।

সিলেট শহরের আশপাশে কৈশোরে যথেষ্ট বনজঙ্গল দেখেছেন বলে আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি লিখেছেন, ‘এইসব বনজঙ্গলে খুব সাবধানে যেতে হতো। কারণ সাপের ভয় খুবই স্বাভাবিক ছিল। এ ছাড়াও মাঝেমধ্যে এসব বনজঙ্গলে চিতা বা বাঘের আগমন হতো।’

জলাশয়ে মাছ শিকার

সিলেট শহরের এক শ থেকে দেড় শ বছরের একটা ইতিহাস উপস্থাপিত হয়েছে নগর-গবেষক মোহাম্মদ ফজলুল হোসেন মীনা (১৪ এপ্রিল ১৯৩৯—১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০) রচিত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ আমার স্মৃতিতে সিলেট শহর (২০০৯)-এ। শহরের প্রাণকেন্দ্র জল্লারপাড় এলাকায় তাঁর জন্ম। তিনি বইটিতে জানিয়েছেন, তাঁর শৈশবে শহরের জল্লারপাড়, সোবহানীঘাট, সাগরদিঘিরপাড়, হাউজিং এস্টেট ও উপশহরের জলাশয়ে শৌখিন শিকারিরা শীতের সময়ে কিংবা বৃষ্টিবাদলার দিনে মাছ শিকার করতেন। এখন এলাকাগুলো নামে থাকলেও জলাশয়ের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

বর্তমান সময়ে সিলেট নগরের সবচেয়ে ব্যস্ততম দু-একটি স্থানের একটি জিন্দাবাজার। ১৯৪৭ সালে এই এলাকা কেমন ছিল, এর একটা ধারণা পাওয়া যায় ফজলুল হোসেন মীনার বইয়ে। তিনি জানিয়েছেন, সমগ্র জিন্দাবাজারে তেমন কোনো ঘনবসতি তখন ছিল না। এমনকি দালানও তখন ছিল না।

সিলেট শহরের যে জায়গায় এখন সিটি সুপারমার্কেট, সেখানে একসময় বিশাল দিঘি ছিল। এ দিঘিটি লালদিঘি নামে পরিচিত ছিল। মোহাম্মদ ফজলুল হোসেন মীনা লিখেছেন, ‘বর্ষার দিনে বিশাল দিঘির স্বচ্ছ পানিতে শৌখিন লোকজন নৌকা বাইতেন আর সাদা সাদা ছোট–বড় বকপাখি এসে মাছ ধরত। দিঘির ধারে প্রাচীন বটগাছের সাথে অন্যান্য বড় বড় গাছপালায় ভরপুর ছিল। গাছের গোড়ায় সাপদের বাসাও থাকত। গাছের ডালে ডালে নানা জাতীয় পাখি কিচিরমিচিরের মধ্যে এদিক–সেদিক ওড়াউড়ি করে মনোমুগ্ধকর পরিবেশের সৃষ্টি করত।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন