বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মামলার আসামিদের মনোনয়ন দেওয়া প্রসঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আতাউর রহমান সরকার প্রথম আলোকে বলেন, দলের বর্ধিত সভায় সবার মত নিয়েই অনেকের নামের তালিকা উপজেলায় পাঠানো হয়। সেই তালিকা জেলা কমিটি হয়ে কেন্দ্রে যায়। কেন্দ্রীয় কমিটি দলীয় প্রার্থী বেছে নেয়। আর যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা তো আদালতে এখনো অপরাধী সাব্যস্ত হননি।

তবে তৃণমূলের অন্য নেতা-কর্মীরা বলছেন ভিন্ন কথা। দরবস্ত ইউনিয়নের দুর্গাপুর গ্রামের যুবলীগ নেতা ওলিউর মণ্ডল বলেন, ‘যাঁরা ধর্মীয় সভার টাকা আত্মসাৎ করেন, তাঁরা কীভাবে দলীয় মনোনয়ন পান, সেটা বোধগম্য নয়। এতে ত্যাগী নেতা-কর্মীরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তবে ভোটের মাধ্যমে এসব প্রার্থীকে বর্জন করতে হবে।’ দরবস্ত ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হানিফ মিয়া বলেন, ‘এখানে যাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তিনি চাল আত্মসাৎ মামলার আসামি। তাঁর নাম কেন্দ্রে পাঠানো ঠিক হয়নি। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় নৌকার ভরাডুবি হতে পারে।’

এখানে যাঁকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তিনি চাল আত্মসাৎ মামলার আসামি। তাঁর নাম কেন্দ্রে পাঠানো ঠিক হয়নি। তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ায় নৌকার ভরাডুবি হতে পারে।
আবু হানিফ মিয়া, সাধারণ সম্পাদক, দরবস্ত ইউনিয়ন যুবলীগ

এ বিষয়ে দরবস্ত ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, মামলার আসামির নাম দেওয়া যাবে না, ইউনিয়ন থেকে নাম পাঠানোর সময় এমন কোনো নির্দেশনা ছিল না। তবে আসামি হওয়ার বিষয়টি নির্বাচনের ওপর প্রভাব ফেলবে।
জানতে চাইলে দরবস্ত ইউপির আওয়ামী লীগের প্রার্থী শরিফুল ইসলাম মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে, কিন্তু আদালতে অপরাধ তো প্রমাণিত হয়নি। বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবেও তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। ফলে মামলার প্রভাব নির্বাচনে পড়বে না।

রাজাহার ইউপির ৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বলেন, যাঁরা চাল আত্মসাৎকারী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন, যাঁদের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে, তাঁদেরই দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। সচেতন ভোটাররা ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তাঁদের অন্যায়ের জবাব দেবেন।

রাজাহার গ্রামের আওয়ামী লীগের কর্মী আবদুর রহিম বলেন, মামলার আসামিকে প্রার্থী করায় দলের নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়েছেন। এতে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছেন, দল তার নৈতিক জায়গা থেকে সরে এসেছে। তাঁরা মনে করছেন, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হয় না।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজাহার ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের এক কর্মী বলেন, এই ইউপিতে বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ সরকারকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি দুর্নীতির মামলার আসামি ছাড়াও প্রায় চার-পাঁচ বছর ধরে শারীরিকভাবে অসুস্থ রয়েছেন। ঠিকভাবে কথা বলতে পারেন না। তিনি নির্বাচিত হলে কী করবেন।

মামলার আসামিকে প্রার্থী করায় দলের নেতা-কর্মীরা হতাশ হয়েছেন। এতে নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ মনে করতে শুরু করেছেন, দল তার নৈতিক জায়গা থেকে সরে এসেছে। তাঁরা মনে করছেন, দুর্নীতিবাজদের শাস্তি হয় না।
আবদুর রহিম, রাজাহার গ্রামের আওয়ামী লীগের কর্মী

এ নিয়ে কথা বলতে লতিফ সরকারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, যেসব ইউপিতে দুদকের মামলার আসামিকে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে, সেসব ইউপিতে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এই সুযোগ কাজে লাগাবেন। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থীর ভরাডুবি হতে পারে।

চতুর্থ ধাপে আগামী ২৩ ডিসেম্বর গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউপিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। গতকাল রোববার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ড এই ধাপের নির্বাচনের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করে। এসব ইউপির মধ্যে দুদকের মামলার আসামি পাঁচজন হলেন কামদিয়া ইউপিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মোশাহেদ হোসেন চৌধুরী, শাখাহারে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি তাহাজুল ইসলাম, রাজাহারে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুল লতিফ সরকার, দরবস্তে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শরিফুল ইসলাম এবং শিবপুরে উপজেলা আওয়ামী লীগের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক সেকেন্দার আলী মণ্ডল।

মামলার বিবরণ

২০১৭ সালের জুনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর ধর্মীয় সভায় আগত ব্যক্তিদের জন্য খাবার বাবদ ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়। ২ হাজার ২৫৩টি প্রকল্পের অনুকূলে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়, যার মূল্য ২২ কোটি ৩ লাখ ২১ হাজার ৫৯০ টাকা। এদিকে কাগজ–কলমে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ওই চাল উত্তোলন করা হয়েছে দেখানো হয়। যদিও দুদকের প্রাথমিক তদন্তে জানা যায়, জাল কাগজপত্র তৈরি করে সেসব চাল আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এসব অভিযোগে চলতি বছর ২৬ আগস্ট মামলা করে দুদক। মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হয়, যার মধ্যে এবারের ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া ওই পাঁচজন রয়েছেন।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উপজেলায় ২ হাজার ২৫৩টি ধর্মীয় সভা অনুষ্ঠিত দেখানো হয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ওই চাল উত্তোলন করা হয়। এতে আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে জালিয়াতির আশ্রয় নেন। তাঁরা ওই সংখ্যক ধর্মীয়সভা অনুষ্ঠিত দেখিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত জাল কাগজপত্র বানান। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠনসংক্রান্ত কাগজপত্রে সব সদস্যের সই একই প্রকৃতির এবং একই হাতের লেখা। তৎকালীন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ২ হাজার ২৫৩ জন প্রকল্প সভাপতির অনুকূলে ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল সরবরাহে ডিও লেটার (আধা সরকারি পত্র) ইস্যু করেন। পরে সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভার মহিলা কাউন্সিলর তাঁদের ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বাস্তবায়ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন দেন। এভাবে ৫ হাজার ৮২৩ মেট্রিক টন চাল আত্মসাতের ঘটনা ঘটে।

এ নিয়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় ‘ধর্মীয় সভার নামে ২২ কোটি টাকা আত্মসাৎ, মামলা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন