খানাখন্দে ভরে গেছে সড়ক। এখন বছরজুড়ে জোড়াতালি দিয়ে যান চলাচলের উপযোগী রাখতে হচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বর বরিশাল–মহাসড়কের গৌরনদীর পালরদী এলাকায়
খানাখন্দে ভরে গেছে সড়ক। এখন বছরজুড়ে জোড়াতালি দিয়ে যান চলাচলের উপযোগী রাখতে হচ্ছে। ১ সেপ্টেম্বর বরিশাল–মহাসড়কের গৌরনদীর পালরদী এলাকায়প্রথম আলো

ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের গৌরনদীর ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড থেকে উজিরপুরের জয়শ্রী পর্যন্ত সড়ক সংস্কার করা হয়েছে সবে দুই বছর আগে। এরই মধ্যে খানাখন্দ হয়ে আগের চেহারায় ফিরে গেছে ২৩ কিলোমিটারের সড়কটি। এলাকাবাসী বলছেন, ঠিকাদারেরা নিম্নমানের কাজ করায় গচ্চা গেছে সড়ক সংস্কারের প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

সড়কটি সচল রাখতে বরিশাল সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ গত অর্থবছর আবার ব্যয় করেছে ১ কোটি টাকা। এই টাকায় বছরজুড়ে অব্যাহতভাবে সড়কে জোড়াতালি চলে। তাতে জনসাধারণের দুর্ভোগ কমেনি এতটুকু। তবু নিয়মবহির্ভূতভাবে এক বছর আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জামানতের টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমএসএএমপিজেভি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. সোহরাব আলী বলেন, বর্ষায় পিচ-পাথর উঠে গিয়ে রাস্তা খারাপ হয়েছে। এর দায় ঠিকাদারের নয়। অন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমএম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. নাসির উদ্দিন আহম্মেদ ও তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার তানভীর হোসেনের মুঠোফোন নম্বর দুটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে তাঁদের প্রকল্প প্রতিনিধি মো. মুকুল হোসেন বলেন, ‘আমরা বর্ষার মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। এতে কাজ খারাপ হয়েছে। তবে এক বছর আমরা দায়িত্ব নিয়ে সড়ক সংস্কার করে দিয়েছি।’

বিজ্ঞাপন
default-image

সওজ সূত্রে জানা গেছে, ভূরঘাটা বাসস্ট্যান্ড থেকে জয়শ্রী পর্যন্ত মহাসড়ক সংস্কারের জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩২ কোটি টাকার দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকল্প পুনঃপ্রাক্কলন করে ব্যয় সাড়ে ৪৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এমএম বিল্ডার্স ও মেসার্স এমএসএএমপিজেভি লিমিটেডকে ২০১৬ সালের অক্টোবরে কার্যাদেশ দেয় সওজ। কার্যাদেশ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের মার্চে কাজ শেষ করার কথা ছিল। তবে ঠিকাদারেরা কাজ শেষ করেন ২০১৮ সালের জুনে। কাজ শেষ হতে না হতেই সড়ক বেহাল হতে থাকে। ধীরে ধীরে খানাখন্দে ভরে যায় সড়কটি।

১ সেপ্টেম্বর সরেজমিন দেখা গেছে, জয়শ্রী থেকে ভূরঘাটা পর্যন্ত ২৩ কিলোমিটার পুরো সড়কই বেহাল। সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত। অনেক স্থানে রাস্তা ফুলে উঁচু হয়ে উঠেছে। কার্পেটিং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও বড় অংশজুড়ে রাস্তা দেবে গেছে। বেশি খারাপ অবস্থা গৌরনদীর বাটাজোর বাসস্ট্যান্ড, বাটাজোর কবিবাড়ি, নীলখোলা তালগাছতলা ও উজিরপুরের মোড়াকাঠি, ক্রসফায়ার, সানুহার, বামরাইল এলাকায়। এ ছাড়া কাসেমাবাদ লালপোল, হরিসোনা, আশোকাঠি থেকে হেলিপ্যাড, ইসলামিক মিশন, মল্লিক শাহর মাজার, নীলখোলা, ইল্লা, গাইনের পাড়, সুন্দরদী, সাউদের খালপাড়, রামনগর, তারাকুপি, বার্থী বাজার এলাকায় সড়কের পিচ-পাথর উঠে গেছে।

বিজ্ঞাপন
মান ঠিক রেখে কাজ করলে এত তাড়াতাড়ি সড়ক খারাপ হওয়ার কথা নয়। মূলত সড়ক সংস্কারের নামে এখানে সরকারি অর্থ লুটপাট হয়েছে। এ কারণে সড়কটি বেশি দিন টেকেনি।
আবদুল মান্নান, ইউপি সদস্য, বাটাজোর, গৌরনদী

হরিসোনা গ্রামের মেহেদী হাসান (৩২), সানুহার এলাকার জাকির হোসেনসহ (৪৮) অনেকে বলেন, সড়কের কোথাও কোথাও গর্তে বৃষ্টির পানি জমে থাকে। ফলে গর্ত দেখা যায় না। এসব স্থানে ছোট-মাঝারি যান গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। ফলে চরম দুর্ভোগে আছে সড়কটি ব্যবহারকারী সবাই।

বাটাজোর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবদুল মান্নান (৪২) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মান ঠিক রেখে কাজ করলে এত তাড়াতাড়ি সড়ক খারাপ হওয়ার কথা নয়। মূলত সড়ক সংস্কারের নামে এখানে সরকারি অর্থ লুটপাট হয়েছে। এ কারণে সড়কটি বেশি দিন টেকেনি। এখন বছরজুড়ে খানাখন্দ ভরাট করে কোনোমতে সড়কটি যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখছে সওজ। সব মিলিয়ে সরকারের কোটি কোটি টাকা গচ্চা গেছে।

সড়কটি মেরামতের পর দ্রুতই খানাখন্দ হয়ে যাওয়ার কথা স্বীকার করেন বরিশাল সওজ বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, কাজ শেষ হওয়ার পর প্রথম এক বছর সড়কটির ভাঙাচোরা অংশ মেরামত করে দিয়েছেন ঠিকাদারেরা। এরপর থেকে সওজের পক্ষ থেকে খানাখন্দ ভরাট করা হচ্ছে। এই কাজের জন্য গত অর্থবছরে সওজ ব্যয় করেছে এক কোটি টাকা। জনদুর্ভোগ লাঘবের জন্য বিভাগীয় উদ্যোগে জরুরি মেরামতকাজ অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, ঠিকাদারের জামানাত ফেরত পাওয়ার কথা সড়কের মেরামতকাজ শেষ হওয়ার তিন বছর পরে। কিন্তু সবাইকে হাত করে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই জামানত তুলে নিয়েছে ২০২০ সালের ৩০ জুন। আর প্রকল্পের চূড়ান্ত বিল তারা পেয়েছে ২০১৮ সালের ৩০ জুন। অর্থাৎ, মেরামতের কাজ শেষ করার পর চূড়ান্ত বিল পেতে এক মাসও অপেক্ষা করতে হয়নি।

নির্ধারিত সময়ের আগেই জামানত তুলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সওজ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি অল্প কিছুদিন আগে এখানে যোগদান করেছি। ফলে আগেই জামানত তুলে নেওয়ার বিষয়ে আমি অবগত নই। তবে সরেজমিনে দেখেছি, সড়কটির কাজের গুণগতমান ভালো ছিল না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করেছে। তদারকির কাজে সংশ্লিষ্ট উপসহকারী প্রকৌশলীর উদাসীনতা ছিল। সব মিলিয়ে কাজটা খারাপ হয়েছে। এখন মহাসড়ক সচল রাখতে সওজের উদ্যোগে সংস্কার করতে হচ্ছে।’

মন্তব্য পড়ুন 0