যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । ভাঙনের কবলে পড়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চরাঞ্চল। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার আউচারপাড়া চরে ।
যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে । ভাঙনের কবলে পড়েছে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার চরাঞ্চল। গত বৃহস্পতিবার উপজেলার আউচারপাড়া চরে ।প্রথম আলো

যমুনা নদীতে শেষ দুই দিনে নতুন করে ভাঙন ও পানি বৃদ্ধি পেয়ে তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শনিবার ও শুক্রবারের প্রবল নদীভাঙনে বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার দুর্গম দলিকার চর নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। ইতিমধ্যে দলিকার চরের প্রায় ২৫০টি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। গৃহহারা হয়ে পড়েছে সহস্রাধিক মানুষ। নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে বেড়েছে ভাঙনের তাণ্ডব। ভাঙছে লোকালয়, বসতি, ঘরবাড়ি-ফসলি জমি। দিশেহারা দুর্গম চরের হাজারো মানুষ।

দুর্গম এই চরে প্রায় ৩৫০ পরিবারের বসবাস। প্রবল ভাঙনের মুখে অবশিষ্ট পরিবার বসতঘর ছেড়ে সহায়সম্বল নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। নদীভাঙনে যমুনাগর্ভে বিলীনের পথে দলিকার চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন।

বিজ্ঞাপন
এর আগে গত জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের বন্যায় বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় নদীভাঙনে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের বসতি গড়ে ওঠা সাতটি চর সম্পূর্ণ ও আংশিক বিলীন হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, যমুনায় অব্যাহত পানি বেড়ে বর্তমানে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে চরাঞ্চলে তৃতীয় দফা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এর আগে গত জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসের বন্যায় বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় নদীভাঙনে চালুয়াবাড়ি ইউনিয়নের বসতি গড়ে ওঠা সাতটি চর সম্পূর্ণ ও আংশিক বিলীন হয়। বিলীন হওয়া চরের মধ্যে রয়েছে হাটবাড়ি, আউচারপাড়া, উত্তর শিমুলতাইড়, সুজনেরপাড়া, ধনার চর, কাকালিহাতা, খাবুলিয়ার চর, মানিকদাইড় চর ও পাকুরিয়ার চর।

নদীভাঙনে ইতিমধ্যে বিলীন হয়েছে বহুলাডাঙ্গা, উত্তর শিমুলতাইড় ও পাকুরিয়া চরের তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। এ ছাড়া আউচারপাড়া চরে বিলীন হয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং আউচারপাড়া উচ্চবিদ্যালয়। নতুন করে দলিকার চরে ভাঙনের তাণ্ডবে দিশেহারা মানুষ বসতঘরের টিনের বেড়া, সহায়সম্বল নিয়ে ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। কেউ কেউ নতুন করে জেগে ওঠা পাশের  চরে বসতি গড়ছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, চার দিন আগেও দলিকার চরে ৩৫০টি পরিবারের বসতি ছিল। মানুষের কলকাকলিতে মুখরিত ছিল দুর্গম এই চরের জনপদ। গত চার দিনের নদীভাঙনে দিশেহারা চরের মানুষ। বিস্তীর্ণ জলরাশির স্রোতের তোড়ে ভেঙে যাচ্ছে লোকালয়, বসতভিটা, আবাদি জমি, বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা। দুই দফা বন্যার পর মাথা গোঁজার ঠাঁই গড়তে না গড়তেই দিশেহারা দলিকার চরের বাসিন্দারা।

বিজ্ঞাপন

দলিকার চরের আজিজার শেখ (৭০) বলেন, ‘দুদিন আগতও সাড়ে তিন শ বসতঘর, খ্যাতভরা পাট, গোয়ালত গরু, হাঁস-মুরগি কত–কী আচল। প্রায় তামান চরডাই যমুনার প্যাটত। লোকজন ঘরের জিনিসপাত্তি, গরু-ছাগল লৌকাত (নৌকায়) তুলে লিয়ে ম্যালা দূর যাচ্চে। ভাঙনের তাণ্ডব থামে যাবি এমন আশায় শ খানেক পরিবার ক্ষণ গুনিচ্চে।’

তিন দিন আগেও দলিকার চরে বসতঘর ছিল দিনমজুর মঈন উদ্দিনের (৬০)। নদীভাঙনে বসতভিটা, জায়গাজমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব তিনি। উঠেছেন পাশে জেগে ওঠা নতুন চরে। বলেন, ‘যমুনা তিনডা মাস ধরে বেজায় খ্যাপা। কখনো জলত ভাসিচ্চি, কখনো আবার খ্যাপা যমুনার তাণ্ডবে বসতঘর-আবাদি জমি হারাচ্চি। বাপ–দাদার ভিটেমাটি বিলীন হয়্যা যাচ্চে। কিচ্চু করবার পারিচ্চি না।’

রাতত খায়্যাদায়া ঘুমাচি, বিয়ানবেলা লদীর তর্জন-গর্জনে ঘুম ভাঙচে। কোনোরকমে লৌকাত উঠলাম। বসতভিটা নিমেষে শ্যাষ।
হামিদ শেখ, কৃষক, দলিকার চর, সারিয়াকান্দি, বগুড়া

দলিকার চরের বাসিন্দা হাফিজ শেখ (৬৫) বলেন, ‘আট বিঘা আবাদি জমি, বসতভিটা সব শ্যাষ। বউ-ছল, গরু-বাছুর লিয়ে কোনটে যামো, কী করমু কূল পাচ্চি না।’

দলিকার চরের আরেক কৃষক হামিদ শেখ (৬৯) বলেন, ‘রাতত খায়্যাদায়া ঘুমাচি, বিয়ানবেলা লদীর তর্জন-গর্জনে ঘুম ভাঙচে। কোনোরকমে লৌকাত উঠলাম। বসতভিটা নিমেষে শ্যাষ।’

নদীভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে চর দলিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন। স্থানীয় লোকজন জানান, ২০১৬ সালে চর দলিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয়। এত দিন সেখানে শতাধিক শিশু পড়াশোনা করত।

বিজ্ঞাপন

চালুয়াবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ইউপি) শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, দলিকার চরে প্রায় ৩৫০টি পরিবারের দেড় হাজার মানুষ বসবাস করত। দুই দফা বন্যায় প্রায় দুই মাস ধরে পানিবন্দী ছিল এই চরের বাসিন্দারা। তিন–চার দিন ধরে হঠাৎ করে যমুনায় পানি বৃদ্ধি পায়। সঙ্গে প্রবল ভাঙনের তাণ্ডব। এতে বিলীন হয় আবাদি জমি, বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা। আজ শনিবার পর্যন্ত প্রায় আড়াই শ পরিবার গৃহহারা হয়ে পড়েছে। শ খানেক পরিবার সেখানে থাকলেও তারা বসতঘর সরিয়ে পাশের চরে আশ্রয় নিচ্ছে। দু-এক দিনের মধ্যে দলিকার মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন হবে। নদীগর্ভে বিলীনের পথে চার বছর আগে নির্মিত দলিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনও।

সারিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাসেল মিয়া বলেন, প্রথম দুই দফা বন্যায় প্রায় দুই মাসব্যাপী পানিবন্দী ছিল চরাঞ্চলের লাখো মানুষ। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার মাসখানেকের মাথায় আবারও যমুনার পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপরে। সঙ্গে চরাঞ্চলে যমুনার তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। যমুনার ভাঙনে দলিকার চর নিশ্চিহ্ন হওয়ার আশঙ্কার কথা সেখানকার ইউপি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। সেখানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনও যমুনাগর্ভে বিলীনের পথে।

মন্তব্য পড়ুন 0