বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

মার্গ্রেট বলেন, তবে চলার পথে আসে ঝড়। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ১৯৯৬ সালে একটি দুর্ঘটনায় তাঁর বাবা মারা যান। পরিবারের কঠিন পরিস্থিতিতে বই-খাতা কেনার অবস্থা ছিল না। সহপাঠীদের কাছ থেকে নোট নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান। লক্ষ্মীপুর থেকে এরপর চলে যান সুনামগঞ্জের নারায়ণতলা মিশন স্কুলে। ভর্তি হন নবম শ্রেণিতে। সেখান থেকে ২০০০ সালে ভালো ফল করেই এসএসসি উত্তীর্ণ হন। এরপর যান ঢাকায়। ভর্তি হন মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে। এবার শুরু হয় পুকুর থেকে সাগরে গিয়ে থাকা। মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ থেকে ২০০২ সালে এইচএসসি পাস করেন। তবে অর্থাভাবে কখনো প্রাইভেট পড়তে পারেননি। অভাব-অনটন এতটাই তীব্র ছিল, উৎসব-পার্বণ তো দূরের কথা, নিয়মিত পোশাক-আশাক কেনাই কঠিন ছিল। এইচএসসি পাস করে ইচ্ছা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু দারিদ্র্য সেটি হতে দেয়নি। স্নাতকে ভর্তি হন ইডেন মহিলা কলেজে। সেখান থেকে ২০১০ সালে সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর পাস করেন। মার্গ্রেট বলেন, পড়াশোনার এই যাত্রাপথের শেষ পর্যন্ত আসতে পারেন সবখানেই মিশনারি হোস্টেলে থেকে পড়ার সুযোগ পেয়েছেন বলে।

মার্গ্রেট সুমের প্রথম আলোকে বলেন, ‘পড়ালেখা করছিলাম ঠিকই। কিন্তু লক্ষ্য কী ছিল, বুঝতাম না। খাসিয়াদের মধ্যে পড়াশোনা কম। বাইরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ কম। তবে ঢাকায় আসার পর প্রথম বড় স্বপ্ন তৈরি হয়। পড়ালেখা করেই কিছু একটা করব পণ করি। কিন্তু ঢাকায় থাকাটা সহজ ছিল না। মিশনারি থেকে কিছু বৃত্তি পেতাম। মা সামান্য কিছু টাকা দিতেন। তাতে কোনোরকম চলত। হাতখরচের টাকা ছিল না। বান্ধবী, মিশনের নানরা কাপড়চোপড় দিতেন। গরিবি জীবনযাপন করেছি।’ মার্গ্রেট হেসে বলেন, ‘এখনো সাধারণ জীবনযাপনই করি।’

ঢাকায় পড়াশোনার সময় বেশ কিছু ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকারে কাজ করা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন মার্গ্রেট। স্নাতকোত্তরের পরে বড়লেখায় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে কিছুদিন পড়িয়েছেন। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসে সাত বছর কাজ করেছেন। তবে ইচ্ছা ছিল তাঁর দেশের বাইরে পড়াশোনা করার। পরীক্ষা দিয়ে ‘অস্ট্রেলিয়া অ্যাওয়ার্ড স্কলারশিপ’ জুটিয়ে ২০১৯ সালে চলে যান অস্ট্রেলিয়া। সেখানে দুই বছর থেকে ফ্লিন্ডার্স ইউনিভার্সিটিতে এডুকেশন: লিডারশিপ ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার ডিগ্রি নেন। সেখানেও ভালো ফল করেছেন। বিভিন্ন ছাত্র ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসেন। এ বছর জুনে বেসরকারি সংস্থা ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেসে (আইপিডিএস) মনিটরিং ও ইভ্যালুয়েশন কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন। এ বছরই শিক্ষা ও চাকরিতে সফল নারী হিসেবে জেলা পর্যায়ে জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন।

মার্গ্রেট সুমের প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর চার বোনের মধ্যে সবাই লেখাপড়া করেছেন। পুঞ্জির ছেলেমেয়েদের মধ্যে শিক্ষা কম। শিক্ষা ছাড়া কিছু বদলাবে না। তাদের মনমানসিকতা পরিবর্তনে কাজ করতে চান তিনি। তিনি বলেন, ‘একটা ভাষায় কথা বলি, পড়েছি আরেকটা ভাষায়। এই ভাষা, দারিদ্র্য, যোগাযোগের পশ্চাৎপদতা, অন্য পরিবেশ—এসব বাধা অতিক্রম করতে পেরেছি মায়ের সমর্থন, অনুপ্রেরণা এবং আমার পড়াশোনার নেশার কারণেই। বাবা মারা যাওয়ার পর মা বড় মেয়ে হিসেবে কাজে লাগিয়ে দিতে পারতেন। তা করেননি। আমি এমন কিছু করতে চাই, যাতে শুধু খাসিয়াই না, সব পিছিয়ে পড়া জাতিগোষ্ঠীকে এগিয়ে নিতে পারি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন