দেশজুড়ে প্রতিবাদ–বিক্ষোভ। তবু ধর্ষণের ঘটনা থামছে না। নেতা, পুলিশ ও নিকটাত্মীয়রা অভিযুক্ত।

ভুক্তভোগী শিশুদের মা–বাবাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উত্তর গোড়ানে একটি ছাপরায় স্ত্রীসহ ভাড়া থাকেন সজল মোল্লা। স্থানীয় শিশুরা তাঁকে ‘নানা’ বলে সম্বোধন করে। গত মঙ্গলবার একটি শিশুকে খুঁজে না পেয়ে তার মা সজল মোল্লার ঘরে ঢুকে মেয়েসহ প্রতিবেশী আরেকটি শিশুর সঙ্গে সজল মোল্লাকে আপত্তিকর অবস্থায় পান। সেখান থেকে উদ্ধার পাওয়া শিশু দুটি জানায়, তাদের আরও দুই খেলার সাথিকে ‘সজল নানা’ বাসায় ডেকে নিয়ে অনেক দিন ধরে খারাপ কাজ করে আসছিলেন। এ ঘটনাগুলো মা-বাবার কাছে না বলতে শিশুদের ভয় দেখাতেন সজল।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, অতীতেও দেখা গেছে, সাধারণত নানা রকম প্রভাবের কারণ অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়নি। দু–একটি ঘটনায় সামাজিক চাপে বিচার হয়। শিশুরা কোনো কিছু বলতে পারে না বা কোনোভাবেই বাধা দিতে পারে না। ফলে তারা সহজেই অপরাধের শিকার হচ্ছে। কঠিন বার্তা পৌঁছে দিতে হবে যে কোনো প্রভাবেই কোনো কাজ হবে না। সত্যিকার অর্থেই আইন তার নিজস্ব গতিতে চললে অপরাধের মাত্রা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট বার্তা না থাকলে কোনো কাজ হয় না। ধর্ষণের মতো অপরাধ কমাতে স্পষ্ট, শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছার বহিঃপ্রকাশ জরুরি।

সুবর্ণচরে ঘরে ঢুকে শিশু ধর্ষণ

গত বছরের ডিসেম্বরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে স্বামী–সন্তানকে বেঁধে রেখে এক নারীকে (৪০) গণধর্ষণের ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে। ওই উপজেলার মোহাম্মদপুর ইউনিয়নে গত বুধবার রাতে ঘরে ঢুকে ছয় বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হেলাল উদ্দিন (২০) নামের এক তরুণকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন স্থানীয় লোকজন।

ময়মনসিংহে শিশু ধর্ষণ

ময়মনসিংহে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণের মামলার প্রধান আসামি জাহাঙ্গীর আলমকে (২০) গতকাল ভোরে টাঙ্গাইলের মধুপুর থেকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে র‍্যাব–১৪। র‍্যাব জানায়, ৪ অক্টোবর তারাকান্দা উপজেলার রামপুর চারিয়া এলাকায় সাড়ে তিন বছরের শিশুটিকে চিপস দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন জাহাঙ্গীর।

গাজীপুরে ছাত্রীকে গণধর্ষণে মামলা

গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় একটি স্কুলের ভেতরে নিয়ে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে (১৩) গণধর্ষণের অভিযোগে গতকাল সকালে মামলা করেছেন মেয়েটির মা। মামলায় নওগাঁ সদর উপজেলার রজাকপুর এলাকার সম্রাট হোসেন ওরফে শান্ত এবং একই উপজেলার ভবানীপুর এলাকার শাকিল আহম্মেদকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশ জানায়, বুধবার সকালে মেয়েটির মা-বাবা কাজে বের হয়ে যান। দুপুরের দিকে মেয়েটি প্রতিবেশী একটি শিশুকে খুঁজতে বাসা থেকে বের হলে পথে সম্রাট ও শাকিল তাকে জোর করে পাশের স্কুলে নিয়ে ধর্ষণ করে পালিয়ে যান। পরে কিশোরীর চিৎকার শুনে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করেন।

নালিতাবাড়ীতে গ্রেপ্তার ৫

শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে গৃহকর্মী শিশুকে (১০) ধর্ষণের মামলায় বুধবার পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলাটির প্রধান আসামি কৃষক লীগ নেতা হারুন মণ্ডল (৪০)। তিনি উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়ন কৃষক লীগের সভাপতি বলে স্থানীয় আওয়ামী লীগ সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শিশুটির পরিবার ও পুলিশ জানায়, হারুন মণ্ডলের বাড়িতে চার-পাঁচ মাস আগে শিশুটি গৃহকর্মীর কাজ নেয়। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে একাধিকবার ধর্ষণ করেন বাড়ির কর্তা হারুন। সপ্তাহখানেক আগে ওই শিশু কাজ বাদ দিয়ে বাড়ি চলে যায়। কয়েক দিন পর তার ভাই–ভাবি শিশুটিকে আবার হারুনের বাড়িতে কাজের জন্য যেতে বলেন। কিন্তু ওই শিশু কাজে যেতে চাইছিল না। পরে সে ভাই–ভাবিকে ঘটনা খুলে বলে।

শিশুটির স্বজনেরা জানান, ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য হারুন গোপনে একটি সালিস ডেকে কাউকে না জানানোর শর্তে ২০ হাজার টাকা জরিমানা দেন। তবে সালিসের সপ্তাহখানেক পর বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়ে যায়। গত মঙ্গলবার থেকে ফেসবুকে হারুনের শাস্তি দাবি করে বেশ কিছু সামাজিক সংগঠন ও ব্যক্তি পোস্ট দেন।

এরপর পুলিশ তৎপর হয়ে উঠলে সালিসকারীদের চাপে মঙ্গলবার রাতের মধ্যেই শিশুটিকে এলাকা থেকে সরিয়ে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয় পরিবার। পরে বুধবার সকালে পুলিশ এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে। ওই দিন বিকেলে শিশুটির বাবা থানায় মামলা করেন। সেই মামলায় হারুন মণ্ডলসহ আটজনকে আসামি হয়। সাত আসামির বিরুদ্ধে সালিস-বিচারের নামে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।

গতকাল এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেরপুরের পুলিশ সুপার (এসপি) কাজী আশরাফুল আজিম বলেন, শেরপুর সদর হাসপাতালে শিশুটিকে মেডিকেল পরীক্ষা করানো হয়েছে।

সাতক্ষীরায় যুবক গ্রেপ্তার

সাতক্ষীরার আশাশুনিতে সাত বছরের একটি শিশুকে ধর্ষণের মামলায় তরিকুল ইসলামকে (১৮) গত বুধবার মধ্যরাতে শ্যামনগরের সীমান্তবর্তী সুন্দরবন–সংলগ্ন পূর্ব কাশিমারী গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি। সাতক্ষীরা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আনিচুর রহমান বলেন, গত সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে ছবি দেখানোর কথা বলে শিশুটিকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করেন তরিকুল।

কিশোরী ধর্ষণে খালু গ্রেপ্তার

টানা ১৩ দিন আটকে রেখে কিশোরীকে (১৬) ধর্ষণের অভিযোগে মেয়েটির খালুকে গ্রেপ্তার করেছে ফরিদগঞ্জ থানার পুলিশ। দুই বছর আগে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে কৌশলে ভিডিও ধারণ করেন তিনি। পরে ওই ভিডিও প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কিশোরীটিকে ধর্ষণ করেন। সর্বশেষ গত ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি মেয়েটিকে অপহরণ করে লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের একটি বাসায় ১৩ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার রাতে রায়পুরের নতুন বাজার এলাকার লোকজন তাঁকে আটক করে ওই কিশোরীকে উদ্ধার করেন। এ ঘটনায় ধর্ষণ ও পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা হয়েছে।

টাঙ্গাইলে শিশুকে ধর্ষণ

টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগে গতকাল গোলাম মোস্তফা (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ঘটনার আরেক আসামি ইসমাইল হোসেন (৪০) পলাতক। গত সোমবার শিশুটিকে ধরে নিয়ে তাঁরা ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ। গতকাল মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়লে বিষয়টি জানাজানি হয়।

ভোলায় শ্বশুর গ্রেপ্তার

ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় এক নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে বুধবার রাতে তাঁর শ্বশুরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার সাত দিনেও মামলা নিচ্ছিল না চরফ্যাশন থানার পুলিশ। ওই গৃহবধূ বিষয়টি জেলার এসপিকে লিখিতভাবে জানালে বুধবার রাতে মামলা হয়। এরপরই শ্বশুর গ্রেপ্তার হন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১ অক্টোবর রাতে স্বামী ও শাশুড়ির অনুপস্থিতিতে তাঁকে মুখে গামছা গুঁজে ধর্ষণ করা হয়।

আরও গ্রেপ্তার

পাবনার চাটমোহরে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের মামলায় বুধবার রাতে গোলজার হোসেন (৩৫) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোলজার বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ কনস্টেবল আবদুল কুদ্দুসকে (৩৫) গতকাল সকালে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে গত বুধবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন সরকারকে (৪০) গ্রেপ্তার করেছে কুমিল্লার হোমনা থানা পুলিশ।

মাদারীপুরের কালকিনিতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে বিশ্বজিৎ বৈদ্য নামের এক তরুণকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান নেহাল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে দেশে ধর্ষণ, গণধর্ষণের ঘটনা কমছে না। আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। ধর্ষণের শিকার ভুক্তভোগী মামলা করলে কিছুদিনের মধ্যেই আসামিরা জামিনে বেরিয়ে যান। নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন ভুক্তভোগীরা। ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে এই অপরাধ কমানো যাবে না।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন