নকলনবিশ লেখে দেন ‘পি’, সাবরেজিস্ট্রার সই করেন ‘চোখ বুজে’

গাজীপুর জেলার ম্যাপ

গাজীপুর সদর যুগ্ম সাবরেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল নিবন্ধনের জন্য সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ওই অফিসকেন্দ্রিক একটি দালাল চক্রের সহায়তায় কর্মকর্তারা এই ঘুষ–বাণিজ্যে সক্রিয় বলে অভিযোগ। কার্যালয়ের ভেতরে প্রকাশ্যে ঘুষ নেওয়ার একটি ভিডিও চিত্র ফাঁস হয়েছে, যেটি প্রথম আলোর হাতে এসেছে।

ভিডিওতে কার্যালয়ের দুই নকলনবিশ হ‌ুমায়ূন শেখ ও ফরিদ আহমেদকে নিজেদের কক্ষে বসে, এমনকি সাবরেজিস্ট্রারের খাসকামরার ভেতরে গিয়ে টাকা লেনদেন করতে দেখা যায়। অথচ সরকারি এই কার্যালয়ে জমি নিবন্ধনসহ কোনো ধরনের ফি নগদ লেনদেনের নিয়ম নেই।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নকলনবিশ হুমায়ুন শেখ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কোনো দুর্নীতি বা ঘুষ গ্রহণ করি না। কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে থাকলে তা কোনো ফির টাকা। মানুষের এসব অভিযোগ মিথ্যা।’ তবে ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন নকলনবিশ ফরিদ আহমেদ। তিনি বলেন, মোক্তাররা অনেক সময় খুশি হয়ে দু-তিন হাজার টাকা দিয়ে থাকেন।’

আগস্টের শুরুর দিকে ধারণ করা ওই ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, নকলনবিশ হ‌ুমায়ূন ও ফরিদ আহমেদ দলিল লেখকদের সঙ্গে দর–কষাকষি করছেন আর গুনে গুনে টাকা বুঝে নিচ্ছেন। ঘুষের ওই টাকা কখনো ড্রয়ারে, কখনো নিজেদের প্যান্টের পকেটে রাখছেন। সাবরেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহর খাসকামরার ভেতরে তাঁর অনুপস্থিতিতে টাকা লেনদেনের দৃশ্য দেখা যায়। নকলনবিশ হ‌ুমায়ূন শেখ কিছু সময় পরপর ওই খাসকামরায় ঢুকছেন এবং প্রতিবারই দালালদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন।
ভিডিওর একাংশে দেখা যায়, এক যুবক খাসকামরায় ঢুকে দুটি দলিল টেবিলের ওপর রাখেন। তাঁর পেছনে পেছনে সেখানে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন নকলনবিশ হ‌ুমায়ূন শেখ। তিনি ওই যুবকের কাছ থেকে টাকা নিজের হাতে নিয়ে দলিলের ওপর কিছু একটা লিখে দেন। এরপর হাতে থাকা টাকা প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে খাসকামরা ছেড়ে পাশের এজলাস কক্ষে চলে যান।

ভিডিওর শুরুর দিকে দেখা যায়, এজলাসকক্ষের চেয়ারে বসে আছেন নকলনবিশ ফরিদ আহমেদ। তাঁর সামনে টেবিলে টাকার বান্ডিল রেখে গুনে গুনে নোটগুলো আলাদা করেন এক ব্যক্তি। তিনি ৫০০ টাকার ওই নোটগুলো ফরিদের হাতে তুলে দেন। ফরিদ হাত বাড়িয়ে সেগুলো নেন। এরপর একটি তালিকার ওপর লাল কলম দিয়ে দাগ কাটেন। ফরিদ এতক্ষণ টাকা গণনা দেখছিলেন। তখন পাশের চেয়ারে বসে রেজিস্টারে কিছু একটা লিখছিলেন এক যুবক। লেখা শেষ হলে তিনি ফরিদের হাতে টাকা ধরিয়ে দেন।

সরকারি এই কার্যালয়ের সব ফি জমা নেওয়ার কথা পে-অর্ডারের মাধ্যমে। এই পে–অর্ডার করতে হয় নির্ধারিত ব্যাংকে গিয়ে। কোনো ফি হাতে হাতে নগদ লেনদেনের সুযোগ নেই। তাহলে এসব লেনদেন কিসের? এ বিষয়ে জানতে কথা হয় ১২ জন দলিল লেখকের সঙ্গে। তাঁদের ভাষ্যে উঠে আসে কীভাবে, কোন দলিলের জন্য কত টাকার ঘুষ লেনদেন হয়, তার আদ্যোপান্ত। সরকার নির্ধারিত ফির পর অতিরিক্ত এই টাকা দেওয়ার বিষয়টি ছকবাঁধা নিয়ম বানিয়ে ফেলেছেন কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তারা।
আমমোক্তার ও বন্ধকি দলিল বাংলায় হলে দুই হাজার টাকা, ইংরেজিতে হলে আড়াই হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। বন্ধকি দলিলের মূল্য ৯৯ লাখ টাকা পর্যন্ত হলে ঘুষ দিতে হয় ১ হাজার টাকা। এরপর দলিলমূল্য যত বাড়বে, প্রতি কোটিতে বাড়তি ১ হাজার টাকা করে নির্ধারিত। যেমন দলিলমূল্য ৫০ কোটি টাকা হলে বাড়তি দিতে হয় ৫০ হাজার টাকা।

সাফকবলা ও বণ্টননামা দলিলের বেলায় প্রতি লাখে বাড়তি ২০০ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। যেমন ৫০ লাখ টাকার দলিল হলে বাড়তি দিতে হবে ১০ হাজার টাকা, ১ কোটি টাকার দলিল হলে পরিমাণটা দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকায়। একইভাবে বায়না ও হেবা দলিল বাবদ ২ হাজার করে বাড়তি দিতে হয়। এই ঘুষ–বাণিজ্যে সব সময় সামনে থাকেন নকলনবিশ হ‌ুমায়ূন শেখ ও ফরিদ আহমেদ।

দলিল লেখকদের ভাষ্যমতে, হ‌ুমায়ূন ও ফরিদ দলিল পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে জমির খাজনা, নামজারি, জাতীয় পরিচয়পত্র ইত্যাদির খুঁত বের করেন। জাতীয় পরিচয়পত্র, খাজনা, নামজারির মূল কপির স্থলে ফটোকপি থাকলে বা খাজনা ও নামজারির কপি ছেঁড়াফাটা হলে ইচ্ছেমতো টাকা দাবি করেন তাঁরা। এরপর চাহিদামতো টাকা দিলে তাঁরা দলিলের কোনায় ‘পি’ লিখে দেন। সাংকেতিক এই চিহ্নের অর্থ লেনদেন হয়েছে। টাকা না দিলে দলিলে বসিয়ে দেন প্রশ্নবোধক ‘?’ চিহ্ন। এর অর্থ দলিলের সংশ্লিষ্ট লোকজন টাকা দেননি।

কার্যালয়ের একজন দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘পি’ লেখা দলিলে চোখ বুঝে সই করে দেন সাবরেজিস্ট্রার। আর প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেওয়া দলিল ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

গাজীপুরের টঙ্গী সাবরেজিস্ট্রি অফিসের নিয়মিত সাবরেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহ। তিনি সদর যুগ্ম সাবরেজিস্ট্রি অফিসে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এই কার্যালয়ে বসেন সপ্তাহের শেষ দুই দিন বুধ ও বৃহস্পতিবার।

সাবরেজিস্ট্রার মাইকেল মহিউদ্দিন আবদুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, ‘নকলনবিশেরা দলিল ঠিক আছে না বললে আমি স্বাক্ষর করি না, এটা সত্য; কিন্তু আমার অফিসে ঘুষ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিছু ফি আছে যেগুলো অফিসে আদায় করতে হয়। সেই টাকাই তাঁরা নিয়েছেন।’ আপনার খাসকামরার দরজা বন্ধ করে টাকা নিতে দেখা গেছে, এমনটি জানালে তিনি বলেন, নকলনবিশ হুমায়ুন ও ফরিদ যেকোনো স্থানে দাঁড়িয়েই টাকা নিতে পারেন।

গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার ওহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুগ্ম সাবরেজিস্ট্রার অফিসে ঘুষ নেওয়ার ভিডিও সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে আমি বিষয়টির খোঁজ নিয়ে দেখব।’