default-image

‘হাওরকন্যা সুনামগঞ্জের মাছ, ধান ও গান

সুরমাতীরে এনেছে মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ’

এটি জেলা ব্র্যান্ডিংয়ের স্লোগান। হাওর, হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য; মাছ, ধান আর বাউলসাধকদের গানেই যেন মিশে আছে সুনামগঞ্জের সুনাম। তবে হাওরের পাশাপাশি ভ্রমণপিপাসুদের জন্য জেলাজুড়ে রয়েছে বেশ কিছু দর্শনীয় স্থান। যেগুলো ঘুরে মুগ্ধতায় মনভরে, নয়ন জুড়ায় পর্যটকদের। মরমি সাধক হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমসহ অসংখ্য বাউল-কবিদের জন্ম এই জেলায়। তাঁদের সহজিয়া জীবন, মনমজানো গানও মানুষকে টানে সুনামগঞ্জে।

ভৌগোলিক দিক থেকে হাওর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আলাদা। মানুষের জীবনযাত্রা ও আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও এখানে ভিন্ন। বছরের বেশির ভাগ সময় হাওর থাকে জলমগ্ন। থই থই জলের ওপর তখন ছোট ছোট গ্রামগুলো ভাসে দ্বীপের মতো। আবার শুকনা মৌসুমে মাইলের পর মাইল হাঁটাপথ। মানুষের যোগাযোগ-যাতায়াত এখানে কঠিন। এই কঠিন যোগাযোগচিত্র বোঝাতে বলা হয়ে থাকে ‘বর্ষায় নাও আর হেম‌ন্তে পাও’। তবে এখন পরিস্থিতি অনেকটা বদলেছে। মানুষের জন্য যোগাযোগ সহজ করার চেষ্টা হচ্ছে। পাশাপাশি নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন সম্ভাবনা বিকাশের।

সুনামগঞ্জে প্রতিবছর যেসব পর্যটক ঘুরতে আসেন, তার বেশির ভাগই তাহিরপুর উপজেলায়। এই উপজেলায় পাশাপাশি বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে। যেগুলো পর্যটকদের কাছে খুবই প্রিয়। পর্যটকেরা সহজেই এসব ঘুরে দেখতে পারেন। এই উপজেলায় একসঙ্গে টাঙ্গুয়ার হাওর, এই হাওরের উত্তর পাড়ের শহীদ সিরাজ লেক, নিলাদ্রী ডিসি পার্ক, স্বাধীনতা উপত্যকা, লাকমা ছড়া, টেকেরঘাটের নয়নাভিরাম ছোট ছোট টিলা, স্মৃতিসৌধ, মহেষখলার মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিসৌধ, বারিক টিলা, শাহ আরেফিনের (র.) আস্তানা, শ্রী অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দির, শিমুল বাগান এবং যাদুকাটা নদের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পাশেই হাতছানি দেয় ভারতের মেঘালয় পাহাড়। হাওর, নদী, পাহাড়ের সৌন্দর্যের মেলবন্ধন এখানে। টেকেরঘাট এলাকায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কটেজ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। রয়েছে পুরোনো আরেকটি অতিথিশালা। আগে থেকে যোগাযোগ করে এলে এসবে থাকতে পারেন পর্যটকেরা। তাহিরপুর উপজেলা সদরে এখন থাকার হোটেল হয়েছে। রয়েছে উপজেলা পরিষদের একটি বিশ্রামাগার। আবার ইচ্ছা করলে সকালে গিয়ে সারা দিন ঘুরে সন্ধ্যা নামার আগেই ফেরা যায় জেলা শহরে।

প্রত্নতাত্ত্বিক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার গৌরারং জমিদারবাড়ি, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া জমিদারবাড়ি, ধরমপাশা উপজেলায় সুখাইড় জমিদারবাড়ি, তাহিরপুর উপজেলায় হলহলিয়া রাজবাড়ি, দিরাই উপজেলা ভাটিপাড়া জমিদারবাড়ি।
বিজ্ঞাপন
default-image

সুনামগঞ্জে প্রত্নতাত্ত্বিক দর্শনীয় স্থানের মধ্যে রয়েছে সদর উপজেলার গৌরারং জমিদারবাড়ি, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া জমিদারবাড়ি, ধরমপাশা উপজেলায় সুখাইড় জমিদারবাড়ি, তাহিরপুর উপজেলায় হলহলিয়া রাজবাড়ি, দিরাই উপজেলা ভাটিপাড়া জমিদারবাড়ি। লোকজ ট্যুরিজম স্থান হিসেবে ঘুরে দেখা যায়, জেলা শহরে থাকা মরমি সাধক হাসন রাজার সমাধি ও হাসন রাজা মিউজিয়াম, দিরাই উপজেলায় বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমের সমাধি ও জাদুঘর; জগন্নাথপুর উপজেলায় লোককবি রাধারমণ দত্তের সমাধি। ইচ্ছা করলে সদর উপজেলায় চলতি নদ, সুরমা নদী ও দেখার হাওরে নৌকার ঘুরতে পারেন পর্যটকেরা।

ঐতিহাসিক স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে দোয়ারাবাজার উপজেলায় বাঁশতলা (হকনগর) শহীদ স্মৃতিসৌধ, সদর উপজেলায় ডলুরা স্মৃতিসৌধ; শিল্পবিষয়ক পর্যটন স্থানের মধ্যে দেশের প্রথম স্থাপিত রাষ্ট্রায়ত্ত ছাতক সিমেন্ট কারখানা, লাফার্জ সুরমা সিমেন্ট কারখানা, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মিছাখলী রাবার ড্যাম; ধর্মীয় পর্যটন স্থান হিসেবে পাগলা বড় মসজিদ, পণতীর্থ ধাম, আছিম শাহের মাজার, সদর উপজেলার সীমান্তবর্তী নারায়ণতলা মিশন এলাকা। সদর উপজেলা সীমান্তবর্তী ডলুরা এলাকায় গেলে পাশেই রয়েছে সীমান্ত হাট। ডলুরা স্মৃতিসৌধ এলাকায় পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য ব্যবস্থা রয়েছে।

আগের চেয়ে এখন যাতায়াত উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি এখানে পর্যটনের বিকাশে সরকারের বেশি কিছু উদ্যোগ চলমান আছে।
মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), সুনামগঞ্জ

সম্প্রতি জেলা প্রশাসন আয়োজিত সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের পর্যটন বিকাশবিষয়ক এক কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটকদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় নৌকা তৈরি করা হয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণকালে হাওরের প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতামূলক নানা প্রচারণা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টেকেরঘাট এলাকায় তৈরি করা হয়েছে কটেজ। বারিক টিলা, শহীদ সিরাজ লেকে পর্যটকদের বিশ্রামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি এ জেলায় থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার বাঁশতলা স্মৃতিসৌধ এলাকায় পর্যটকদের থাকার জন্য অতিথিশালা রয়েছে। কর্মশালায় বলা হয়, এ জেলায় পর্যটন খাত উন্নত হলে এখানে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। এতে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান হবে, আয় বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি হবে। পাশাপাশি পর্যটকেরাও সুনামগঞ্জের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার সঙ্গে সঙ্গে হাওর জনপদের মানুষের জীবন প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা পাবেন।

তবে সুনামগঞ্জ হাওর এলাকা হওয়ায় এখনো উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। বিশেষ করে পর্যটকদের রাতযাপনের জন্য জেলায় পর্যাপ্ত হোটেল বা মোটেলের ব্যবস্থা নেই। জেলা শহর থেকে উপজেলাগুলোর পর্যটন স্থানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন যানবাহনের অভাব রয়েছে।

default-image

তাহিরপুর উপজেলার বাসিন্দা পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা বলেন, ‘সুনামগঞ্জে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পর্যটক আসেন। বিশেষ করে টাঙ্গুয়ার হাওরে। টাঙ্গুয়ার হাওর এবং সীমান্ত এলাকায় কাছাকাছি থাকা দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের জন্য সংযোগ সড়ক তৈরি করতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরে ইঞ্জিনচালিত নৌযান প্রবেশ বন্ধ করতে হবে। আমরা চাই, হাওরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনের বিকাশ। পর্যটনশিল্পের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বলেন, ‘বড় সমস্যা হচ্ছে অনুন্নত যোগাযোগ। পাশাপাশি পর্যটকদের থাকার ভালো কোনো সুবিধা নেই। পর্যটকেরা এসে বিশ্রাম নিতে পারেন না। শৌচাগার নেই। জেলার পর্যটনের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে। এর সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্রগুলো আরও আকর্ষণীয় করতে হবে। এখন অনেকেই আসেন, হাওরে ঘুরেন। কিন্তু কোনো শৃঙ্খলা নেই। এটিও ভাবতে হবে। পর্যটকেরা এসে যদি ভোগান্তিতে পড়েন, তাহলে একসময় তাঁরা আসবেন না। আমরা চাই, সবকিছু একটা পরিকল্পনার মধ্যে নিয়ে আসতে। এ জন্য প্রশাসন, জনপ্রতিনিধিসহ সবার সহযোগিতা দরকার।’

সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলেছেন, ‘সুনামগঞ্জ পর্যটনের অপার সম্ভাবনার জায়গা। আমরা এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই। তবে এটি হাওর এলাকা হওয়ায় যোগাযোগসহ নানা প্রতিবন্ধকতা আছে। আমরা যোগাযোগ, অবকাঠামো, পর্যটকদের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা, প্রয়োজীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছি। আগের চেয়ে এখন যাতায়াত উন্নত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি এখানে পর্যটনের বিকাশে সরকারের বেশি কিছু উদ্যোগ চলমান আছে। তবে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগও প্রয়োজন।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন