পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার তদন্ত এক বছরেও শেষ হয়নি

  • পুলিশ বিভিন্ন সময়ে এজাহার নামীয় ৪৩ জনসহ ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করে।

  • গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ৮ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামে পবিত্র কোরআন অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার তদন্ত এক বছরেও শেষ হয়নি। তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সতর্কতার সঙ্গে মামলার তদন্ত করা হচ্ছে। দ্রুতই তাঁরা আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারবেন।

২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর রংপুর শহরের শালবন মিস্ত্রিপাড়ার আবু ওয়াজেদ মিয়ার ছেলে আবু ইউনুস মো. শহীদুন্নবী জুয়েল বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ পড়তে যান। সেখানে পবিত্র কোরআন অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে আটক করা হয়।

পুলিশ ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, পবিত্র কোরআনের অবমাননার অভিযোগে বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে পাঁচ থেকে ছয়জন ব্যক্তি শহীদুন্নবী ও তাঁর সঙ্গী সুলতান জোবায়ের নামের একজনকে মারধর করেন। খবর পেয়ে বুড়িমারী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য হাফিজুল ইসলাম তাঁদের সেখান থেকে নিয়ে যান। তাঁদের ইউপি কার্যালয়ের একটি কক্ষে রাখা হয়। এরপর কক্ষের দরজায় তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।

ঘটনাটি জানাজানি হলে উত্তেজিত জনতা বুড়িমারী ইউপি চত্বরে জমায়েত হয়ে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দুজনকে মারধর করেন। পুলিশ জোবায়েরকে সরিয়ে নিতে পারলেও শহীদুন্নবীকে উদ্ধার করতে পারেনি। সেখানেই গণপিটুনি দিয়ে ও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয় তাঁকে।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে, সেদিন আবু ইউনুস পবিত্র কোরআন অবমাননা করেননি।

এ ঘটনায় পাটগ্রাম থানায় পৃথক তিনটি মামলা দায়ের হয়। এর একটি মামলা মিথ্যা অভিযোগে নির্যাতনের পর আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করার অভিযোগে দায়ের হয়। এই মামলায় লালমনিরহাটের ডিবি পুলিশ বিভিন্ন সময়ে এজাহার নামীয় ৪৩ জনসহ ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করে। তাঁদের মধ্যে অধিকাংশ উচ্চ আদালত থেকে জামিন লাভ করেন।

গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ৮ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁরা হলেন আবুল হোসেন (৪৫), আবদুল গণি (৪৯), জাবেদ ওমর (৩৫), ফরিদুল ইসলাম (২৯), জোবেদ আলী (৬০), মেহেদী হাসান (২০), রাসেল ওরফে বিষু (২৪) এবং রশিদুল ইসলাম (১৮)।

আবু ইউনুস মো. শহীদুন্নবী (৫০) রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের গ্রন্থাগারিক ছিলেন।

শহীদুন্নবীর স্ত্রী জেসমিন আখতার বলেন, তাঁর স্বামী একজন ধর্মভীরু মুসলমান ছিলেন। তাঁকে পবিত্র কোরআন অবমাননা করার মিথ্যা অভিযোগে বুড়িমারীতে নির্যাতনের পর প্রকাশ্য আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হলো। কবে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করবে? কবে বিচার শুরু হবে। তিনি বলেন, ‘স্বামী হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন, আমি অনেক কষ্টে সন্তানদের নিয়ে সংসার চালাচ্ছি, বিচারটা শুরু হলে সান্ত্বনা পেতাম, দোষী ব্যক্তিদের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’

লালমনিরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, ঘটনাটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। যাতে দোষী কেউ রেহাই না পায় আর নিরীহ কেউ ফেঁসে না যায়। তিনি এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে।