১০০ নম্বরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের ৬ নম্বর প্রশ্নে একটি অনুচ্ছেদ অনুবাদ করতে বলা হয়। ওই অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে, ‘শ্রীমঙ্গলকে চায়ের রাজধানী বলা হয়। শ্রীমঙ্গলে ৯২টি চা-বাগান রয়েছে। শ্রীমঙ্গলের চা খুবই উপাদেয়। কুলিরা হাত দিয়ে পাতা সংগ্রহ করে। প্রক্রিয়াজাত চা-পাতা থেকে চা উৎপন্ন করা হয়।’

এখানে কুলি লিখে চা-শ্রমিকদের হেয় করার অভিযোগ উঠেছে। নাম প্রকাশ না করে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া চা-শ্রমিকদের কয়েকজন সন্তান বলেন, চা-শ্রমিকদের কুলি আখ্যা দেওয়ায় পরীক্ষাকেন্দ্রে তাঁদের খুব মন খারাপ হয়েছে। তাঁদের বাবা-মায়ের কষ্টের কথা, সংসারের অভাব-অনটনের কথা মনে করে শেষ পর্যন্ত তাঁরা পরীক্ষা দিয়েছেন।
প্রশ্নের ওই অংশটুকুতে তথ্যগত ভুলও রয়েছে। চা-বাগান সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে ৯২টি চা-বাগান নেই। শ্রীমঙ্গল উপজেলায় চা-বাগানের সংখ্যা ৪২। মৌলভীবাজার জেলায় মোট চা-বাগান ৯২টি।

বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। প্রদীপ পাল নামের একজন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘শ্রীমঙ্গলে ৯২টি চা-বাগান রয়েছে, কথাটি ভুল এবং এর পরেরটা হচ্ছে ন্যক্কারজনক।...এর সঠিক ব্যাখ্যা চাই আমরা। আমরাও এই দেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অধিকার রাখি। সময় এবং সভ্যতা পরিবর্তনের সাথে মানুষের মননশীলতার উন্নয়ন ঘটেছে নিঃসন্দেহে। মানবিকতা এখন অনেক এগিয়ে। এই দেশে রোহিঙ্গারাও পরম যত্নে আশ্রয় নিচ্ছে। দেশে যখন এমন উদাহরণ। তখন একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের দিকে এগিয়ে যাওয়া শিল্পের চাকাকে সচল রাখা শ্রমিকদের নিয়ে এ রকম ব্যবহার মোটেও প্রত্যাশিত নয়।’

এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া চা-শ্রমিক সন্তানদের সংগঠন বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ। সংগঠনটির সভাপতি মনোজ কুমার যাদব ও সাধারণ সম্পাদক রাজু নুনিয়া স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদের অনুচ্ছেদে খেটে খাওয়া, মেহনতি, সাধারণ চা-শ্রমিকদেরকে কুলি সম্বোধন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে প্রতিনিয়িত ত্বরান্বিত করা চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মানুষের জন্য এটি চরম অবমাননাকর। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে দাসত্বের বেড়াজালে বন্দী চা-শ্রমিকদের অবজ্ঞার সুরে এই নামে সম্বোধন করা হতো। বর্তমান স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে এমন চর্চা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি বাইরে আছি। এই প্রশ্ন তৈরির সঙ্গে ডিসি অফিস জড়িত নয়। এই প্রশ্ন সিলেট বিভাগীয় কমিটি থেকে হয়ে থাকে।’

সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) জাকারিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁদের সেন্টিমেন্টটা আমাদের নজরে এসেছে। এই সেন্টিমেন্টকে আমরা সম্মান করি। এ বিষয়ে আমাদের ও জেলা প্রশাসনের ফেসবুকে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।’

ফেসবুকের বক্তব্যে বলা হয়েছে, ‘মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের রাজস্ব বিভাগের অধীন নিয়োগ পরীক্ষায় চা-শ্রমিক বোঝাতে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করায় সৃষ্ট অসন্তোষ বিভাগীয় নির্বাচনী বোর্ডের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। কাউকে ছোট করা বা আঘাত করার জন্য এরূপ শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। এ অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য বিভাগীয় নির্বাচনী বোর্ড দুঃখ প্রকাশ করছে। সকলের অনুভূতি ও ভাবাবেগের প্রতি বিভাগীয় নির্বাচনী বোর্ড শ্রদ্ধাশীল ও সহানুভূতিশীল। ভবিষ্যতে এ ধরনের ভুল এড়ানোর জন্য সর্বাত্মক সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন