বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আবুল ফজলের শিক্ষাজীবন শুরু হয়েছিল মাদ্রাসায়। জ্ঞানান্বেষণের নানা পথ পরিক্রমায় পরিবারের অমত উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেছিলেন তিনি। ধর্মভীরু পিতা বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চাকে রীতিমতো অপরাধ গণ্য করতেন। সাহিত্যচর্চা যদি করতেই হয়, তবে তা আরবি বা ফার্সিতে করার উপদেশ দিয়েছিলেন তিনি পুত্রকে (আবুল ফজল, রেখাচিত্র, বাতিঘর সংস্করণ, পৃ: ১৫)। কিন্তু সেই আবুল ফজলই বাংলায় সাহিত্যচর্চা তো করেছেনই, উপরন্তু মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার অপরিহার্যতা নিয়ে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে গেছেন সেই বন্ধুর সময়ে।

সাহিত্যজীবনের সূচনালগ্নে আবুল ফজল গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেছিলেন। তাঁর রাঙ্গা-প্রভাত, চৌচির, সাহসিকা, জীবন-পথের যাত্রী প্রভৃতি গ্রন্থ পাঠকসমাদৃত হয়েছিল। প্রগতি, কায়েদে আজম, একটি সকাল, আলোকলতা নামে কয়েকটি নাটক বা একাঙ্কিকাও রচনা করেছিলেন তিনি। পরিণত বয়সে সম্ভবত তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে তাঁর বক্তব্য প্রকাশের জন্য প্রবন্ধই হতে পারে প্রধান বাহন। জীবন-পথের যাত্রী, বা রাঙ্গা-প্রভাত–এ যে অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্রের স্বপ্ন তিনি তুলে ধরেছিলেন আখ্যান ও কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে, প্রবন্ধে তা যুক্তি-তর্কের শাণিত বক্তব্যে আরও স্পষ্ট করে প্রকাশ করেছিলেন। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর বিখ্যাত উক্তি, ‘একুশ মানে মাথা নত না করা’ দুঃসময়ে বারবার প্রেরণা জুগিয়েছে এ দেশের মানুষকে। সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, রাজনীতি বিষয়ে খোলামেলা মতপ্রকাশের জন্য তাঁকে ‘বাংলার বিবেক’ আখ্যা দেওয়া হয়। সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্তি না থাকলেও ষাটের দশকে তিনি ছিলেন পাকিস্তানি সামরিক শাসক ও একনায়কতন্ত্রের কঠোর সমালোচক। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে তাঁর বাসভবন ‘সাহিত্য নিকেতনে’ চট্টগ্রামের সর্বশ্রেণির বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীরা মিলিত হয়ে গড়ে তোলেন ‘শিল্পী-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী প্রতিরোধ সংঘ’। আবুল ফজল এই সংঘের পৃষ্ঠপোষক নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি আত্মগোপন করেন এবং দুর্দিনের দিনলিপি রচনা করেন (প্রাগুক্ত, পৃ: ৪৬)।

কর্মজীবনে আবুল ফজল স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজে শিক্ষকতা করেছেন দীর্ঘকাল। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুরোধে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্বাধীনতা–পরবর্তীকালে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, আবুল ফজলের দৃঢ় ভূমিকার কারণে তার অনেকটাই দূরীভূত হয়।

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন, তখন দেশের চারটির মধ্যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তাতে সমর্থন জানিয়েছিলেন, আবুল ফজল ছিলেন একমাত্র ব্যতিক্রম। অনেকেই ভেবেছিলেন, এ কারণে উপাচার্য পদ থেকে অপসারিত হবেন তিনি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁকে নিজের ইচ্ছানুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার দিয়ে উপাচার্য পদে বহাল রেখেছিলেন। পঁচাত্তরে সপরিবার বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁকে ব্যথিত ও হতাশাগ্রস্ত করেছিল। ২৩.৮.৭৫ তারিখে তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘এক সপ্তাহ হয়ে গেল। তবু পারছি না বিবেককে এতটুকু হালকা করে তুলতে। এক দুর্বহ বোঝার ভারে বিবেক আমার স্তব্ধ ও বোবা হয়ে আছে এ কদিন। এ এক অকল্পনীয় পাপের বোঝা—আমার, আপনার, সারা বাংলাদেশের’ (শেখ মুজিব: তাঁকে যেমন দেখেছি, বাতিঘর সংস্করণ, ২০১৬, পৃ: ৭৮)।

এরই তিন দিন পর ২৬.৮.৭৫ তারিখে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষকে বাঙালি পরিচয় দেওয়ার হিম্মত কে জুগিয়েছে? শেখ মুজিব ছাড়া এর কি দ্বিতীয় কোনো জবাব আছে? শেখ মুজিবকে হত্যা করা মানে এক অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে হত্যা করা। তিনি ছিলেন আমাদের স্বাধীনতার, আমাদের হিম্মত আর সংগ্রামের প্রতীক’ (প্রাগুক্ত, পৃ: ৮১)। ‘বিবেকের সংকট’ নামে একটি প্রবন্ধেও তিনি এই হতাশা ও গ্লানির কথা প্রকাশ করেন। এই যাঁর মনের অবস্থা, সেই ব্যক্তিটিই বঙ্গবন্ধু হত্যার অব্যবহিত পরে বিচারপতি সায়েমের বিতর্কিত সরকারে রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা হয়েছিলেন। সত্তরোর্ধ্ব বয়সে এই ঘটনা তাঁকে কিছুটা বিতর্কিত করেছিল বৈকি। শোনা যায়, তৎকালীন রাষ্ট্রপতির চাপ যেমন তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি, তেমনি উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে থাকা কয়েকজন মান্যগণ্য প্রবীণ ব্যক্তি তাঁকে প্রভাবিত করেছিলেন (প্রাগুক্ত, পৃ: ১০৭)।

কিন্তু তাঁর প্রকৃত সুহৃদ ও ঘনিষ্ঠজনেরা তাঁর এই নতুন পরিচয়কে (রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা) ‘অভিনন্দনযোগ্য’ মনে করেননি (আনিসুজ্জামান, আবুল ফজল: স্মৃতি কথা, আবুল হাসনাত সম্পাদিত আবুল ফজল: ব্যক্তিস্বরূপ ও সাধনা, পৃ: ৯৮ )। ১৯৭৮ সালে শেখ মুজিব: তাঁকে যেমন দেখেছি গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে আবুল ফজল লিখেছেন, ‘আজ সবই রহস্যময় মনে হচ্ছে। মানব স্বভাবটাই বোধ করি এমনি রহস্যময়। এর তল খুঁজে পাওয়া মুশকিল (পৃ: ১৪) ।’ এ যেন নিজেরই হতাশাদীর্ণ মনোভাবের প্রতিধ্বনি।

অবশ্য তিনি ক্ষমতাবলয়ে থাকাকালেই বঙ্গবন্ধুর হত্যাসংক্রান্ত বিষয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। উপদেষ্টা থাকাকালেই পঁচাত্তরের হত্যাকাণ্ডের পটভূমিতে তিনি লেখেন ছোটগল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’। গল্পটি সাহিত্য পত্রিকা সমকালে প্রকাশিত হওয়ার পর হইচই পড়ে যায়। এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ অবলম্বনে তিনি আরও তিনটি গল্প রচনা করেন ‘নিহত ঘুম’, ‘ইতিহাসের কণ্ঠস্বর’ ও ‘কান্না’। এ গল্পগুলোর মাধ্যমেই যেন মুক্তবুদ্ধির সাধক আবুল ফজল নিজেকে দায়মুক্ত করলেন, আর নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ হলেন।

শেখ মুজিব: তাঁকে যেমন দেখেছি গ্রন্থাকারে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে। পরবর্তীকালে এর একাধিক সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। এ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আবুল ফজলের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণা, তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্ব সম্পর্কে মূল্যায়ন রয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ কামাল সম্পর্কে আবুল ফজলের স্মৃতিচারণামূলক একটি লেখা (‘শেখ কামাল: স্মৃতিচারণ’ শিরোনামের এই লেখা শেখ মুজিব তাঁকে যেমন দেখেছি গ্রন্থের বাতিঘর সংস্করণে সংযোজিত হয়েছে, পৃ: ১০০ ), এই তরুণ সম্পর্কে তত্কালীন পরিকল্পিত অপপ্রচারের একটি যথার্থ প্রতিবাদ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে।

গল্প-উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা দিনলিপি, ভ্রমণ, জীবনকাহিনি, অনুবাদ ও সম্পাদনা ইত্যাদি মিলিয়ে আবুল ফজল রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৫০। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার, প্রেসিডেন্টের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার, আদমজী সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, আবদুল হাই সাহিত্য পদক ও স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৪ সালে তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট দেয়।

দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে ১৯৮৩ সালে আবুল ফজল মৃত্যুবরণ করেন।

বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কথাসাহিতি্যক, প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন