বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিবিদ, গোঁড়ামিমুক্ত ধর্মীয় নেতা, নিরলস কর্মী, অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী, অনন্য সমাজসংস্কারক, চিন্তাবিদ, শিক্ষা সম্প্রসারণের অগ্রদূত এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা, দাতা ও সমন্বয়কারী। নিজের ভোগ-বিলাস পরিহার করে দেশ ও দেশের স্বার্থে কাজ করে পরহিতব্রতে স্বীয় জীবন নিঃস্বার্থভাবে বিলিয়ে দিয়েছেন।

মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দে অবিভক্ত পটিয়া থানার আড়ালিয়া (বর্তমান বাইনজুরি) গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মতারিখ জানা যায়নি। তাঁর পিতার নাম মুন্সি মতিউল্লাহ পণ্ডিত।

পিতার প্রচেষ্টায় মনিরুজ্জামান একজন গৃহশিক্ষক মৌলভির তত্ত্বাবধানে স্বগৃহে আরবিশিক্ষা সমাপ্ত করেন। অতঃপর তাঁর পিতা তাঁকে হুগলি পাঠিয়ে দেন। তিনি সেখানে হুগলি মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে হুগলি মাদ্রাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান প্রথম শ্রেণিতে প্রথম বিভাগ অধিকার করে জামায়াত-উলা পাস করেন।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি হুগলি কলেজে শিক্ষকতার প্রস্তাব পান কিন্তু সরকারি চাকরি প্রত্যাখ্যান করে এবং স্বীয় বিষয়-সম্পত্তির লালসা ত্যাগ করে মুসলিম সম্প্রদায়ের শিক্ষার প্রসারকল্পে রংপুরে একটি নিউস্কিম মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। এ সময় তিনি উক্ত এলাকায় বেশ কয়েকটি স্কুল, মাদ্রাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এ ছাড়া তিনি সীতাকুণ্ড নিউস্কিম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে কিছুদিন কাজ করেন।

মাওলানা ইসলামাবাদী অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। তিনিই সম্ভবত একমাত্র আলেম এবং বাঙালি নেতা, যিনি মুসলিম লীগ না করে কংগ্রেস করেছেন এবং পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেননি। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে আমরা আরেকজন মুসলমান নেতা ও মাওলানাকে পাই, যিনি শুধু কংগ্রেসই করেননি, বরং কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টও হয়েছিলেন। তিনি হচ্ছেন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ। ব্যারিস্টার আবদুর রসুল, কাজেম আলী মাস্টার, শাহ বদিউল আলম প্রমুখ রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীও মুসলিম লীগ করেননি, কিন্তু তাঁরা মাওলানা ছিলেন না। মাওলানা ইসলামাবাদী ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে কংগ্রেসে যোগদান করেন। তিনি সুরাট কংগ্রেসে গিয়েছিলেন।

বিশ শতকের প্রারম্ভে চট্টগ্রামে নানা আন্দোলন দানা বেঁধে উঠতে থাকে। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ আদেশ ঘোষিত হতে না হতেই বাংলাদেশজুড়ে প্রতিবাদ ধ্বনিত হতে থাকে। দেশের প্রান্তীয় জেলা চট্টগ্রাম জেগে ওঠে আন্দোলনের তরঙ্গাভিঘাতে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সফরে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন তুমুল গতিবেগ অর্জন করে আছড়ে পড়ে বন্দরনগরীতে। তখন বাঙালি পরিচয় ছিলই মুখ্য, হিন্দু-মুসলমানের কোনো প্রশ্ন ছিল না। হিন্দু নলিনীকান্ত-যামিনীকান্ত ভ্রাতৃদ্বয়, দেশপ্রিয় জে এম সেনগুপ্তের পিতা যাত্রামোহন সেন, কবি শশাঙ্কমোহন সেন ও বিপিন বিহারী নন্দী, চট্টল গৌরব মহিন চন্দ্র দাশ, ত্রিপুরাচরণ চৌধুরী, অম্বিয়া চক্রবর্তী, শিখ মোহন্ত কৃপাল দাস উদাসী, মুসলিম শেখ-ই-চাটগাম কাজেম আলী মাস্টার, তদীয় পুত্র শের-ই-চাটগাম একরামুল হক, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, শাহ বদিউল আলম, আমানত খান, জালাল আহমদ জগলুল হাত-ধরাধরি করে আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। আন্দোলনে সামরিক ছেদ পড়ে। পরে দেখা গেল সেটা ছিল আরও বড় আন্দোলনের প্রস্তুতির জন্য সাময়িক বিরতি। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। সেবার গান্ধীজি আফ্রিকা থেকে এসে ভারতীয় রাজনীতিতে নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ব্যারিস্টার জে এম সেনগুপ্তও চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়ে সৈনাপত্য গ্রহণ করেন। অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের ডামাডোল বেজে ওঠে। কাজেম আলী মাস্টার, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী ছিলেন সে আন্দোলনে জে এম সেনগুপ্তের উপদেষ্টা। মহিমচন্দ্র দাশ ও ত্রিপুরা চরণ চৌধুরী ছিলেন প্রধান সহযোগী। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ নভেম্বর মুসলিম হাইস্কুলের ছাত্ররা ধর্মঘট করে। জে এম সেন হলে ধর্মঘটি ছাত্র ও জনসাধারণের বিরাট জনসভায় সভাপতিত্ব করেন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী।

১৯২০ সালে কলকাতায় আহূত ভারতীয় কংগ্রেসের বিশেষ অধিবেশন যোগদান করেন ইসলামাবাদী। তিনি বঙ্গীয় কংগ্রেস কমিটি ও কৃষক প্রজা পার্টির সহসভাপতির পদ অলংকৃত করেন। নিখিল বঙ্গ জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের সভাপতিও ছিলেন তিনি। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করে কারাবরণ করেন। এরপর ইসলামাবাদী সংসদীয় রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। প্রথমে তিনি জেলা বোর্ডের সদস্য, ১৯৩৭-এর নির্বাচনে চট্টগ্রাম দক্ষিণ (মধ্য) নির্বাচনী এলাকা থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অসারতা প্রতিপন্ন করে আনন্দবাজার পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রবন্ধ রচনা (১৯৪২-১৯৪৩) করেন। ত্রিশের দশকে তিনি বঙ্গীয় কৃষক-প্রজা দলে যোগদান করেন।

মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জন ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য। ইসলামাবাদীর রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে যোগদান ও নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের সমর্থনে এগিয়ে এসে। ১৯৪২-৪৩ সালে নেতাজির সঙ্গে আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে তিনি ইস্টার্ন জোনের (বর্তমান বাংলাদেশ ও আসাম) প্রধান সংগঠক ও সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত হন। নেতাজির চট্টগ্রাম সফরকালে কর্ণফুলী নদীর মোহনায় দেয়াং পাহাড়ে মাওলানা ইসলামাবাদীর সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই সময় ইসলামাবাদী সেখানে ইসলাম মিশন এতিমখানা শাখা, পশুপালন খামার, মত্স্য খামার, কৃষি খামার এবং জাতীয় আরবি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তার আগে মাওলানা ইসলামাবাদী তাঁর পৈতৃক সম্পত্তি হস্তান্তর করে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড এলাকায় ব্রিটিশবিরোধী এবং ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের গোপন দুর্গ হিসেবে বিপুল জায়গাজমি নিয়ে এক খামারবাড়ি স্থাপন করেন। বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার দায়ে ১৯৪৪-এর ১৩ অক্টোবর চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার হন। এক বছর (১৯৪৪-৪৫) লাহোর সেন্ট্রাল জেলে আটক ছিলেন।

পত্রিকায় প্রবন্ধ লিখে মনিরুজ্জামানের সাহিত্যিক জীবনের সূত্রপাত হয়। প্রচারক, ইসলাম-প্রচারক, নবনূর, আল-এছলাম প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর ধর্ম, সমাজ, শিক্ষা ও ইতিহাসবিষয়ক প্রবন্ধ মুদ্রিত হয়। তাঁর গদ্যভঙ্গি প্রাঞ্জল অথচ বলিষ্ঠ ছিল। মাওলানা ইসলামাবাদী বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর লেখা গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: তুরস্কের সুলতান, কনস্টান্টিনোপাল, ভারতে এসলাম প্রচার, সমাজসংস্কার, বঙ্গীয় মুসলমান সমাজের জাতীয় উন্নতির উপায়, এছলামের শিক্ষা, নিম্নশিক্ষা ও শিক্ষাকর, ইসলাম জগতের অভ্যুত্থান, আওরঙ্গজেব, মোসলেম বীরাঙ্গনা, ভূগোল শাস্ত্রে মুসলমান, তছবিরে বাঙ্গালা।

সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ইসলামাবাদী বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি সাপ্তাহিক ও পরে দৈনিক ছোলতান পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ সম্পাদিত আল এসলাম-এর তিনি যুগ্ম সম্পাদক, পরে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯২৬ সালে কলকাতায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সময়ে তিনি ছোলতান দৈনিক আকারে প্রকাশ করেন। ১৯২৮ সালের শেষভাগে দৈনিক আমীর পত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও সম্পাদনা করেন। হাবলুল মতিন নামে আরেকটি সাপ্তাহিকও তিনি সমসময়ে সম্পাদনা করেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ইসলামাবাদ ও সাপ্তাহিক সত্যবার্তার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। বিশিষ্ট সংগঠক ও সমাজসেবক হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধি অর্জন করেছিলেন। তিনি কলকাতা মোহামেডান ইউনিয়নের ও বঙ্গীয় মুসলমান ইসলাম মিশন স্থাপনের ক্ষেত্রে যে কজন চিন্তাশীল ব্যক্তির উদ্যোগ সক্রিয় ছিল, তাঁদের মধ্যে মনিরুজ্জামান ছিলেন প্রধান। তিনি উভয় প্রতিষ্ঠানের কার্যনির্বাহক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন।

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী: সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন