default-image

গাজীপুর মহানগরীর জোড়পুকুর পাড় এলাকার যুক্তরাষ্ট্রফেরত মনিরা সুলতানা মুনমুনের ব্যতিক্রমী ছাদকৃষি সবাইকে অবাক করে দিচ্ছে। তিনি স্বামী আকরাম হোসেনের সার্বিক সহযোগিতায় গত সাত বছরে তাঁর তিন তলার বাড়ির ছাদ সাজিয়েছেন নিজের স্বপ্নের মতো করে।

মনিরা সুলতানার ছাদে শুধু ব্যতিক্রমী উদ্ভিদ নয়, বৈচিত্র্য আছে উদ্ভিদের পরিচর্যার প্রক্রিয়াতেও। সম্পূর্ণ অরগানিক পদ্ধতিতে চলছে তাঁর উদ্ভিদ পরিচর্যা। মাছ পালনের পানির হাউস থেকে ফাইটোপ্লাংকটন-মিশ্রিত পানি দেওয়া হচ্ছে গাছের গোড়ায়। নিজেই উৎপাদন করছেন জৈব সার। গাছগুলোর গোড়ায় মাটি না দিয়ে সেখানে দেওয়া হচ্ছে নারকেলের ছোবড়া ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ। ছাদকৃষি শুধু নিজের মধ্যে না রেখে তিনি তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন অন্যদের মাঝেও। তিনি তাঁর ছাদে অন্যদের দিচ্ছেন প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া কীভাবে খুব অল্প জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার করা যায়, তা নিয়ে চলে গবেষণা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ খুলে অনলাইনে দেন প্রশিক্ষণ। নিজের ছাদে উৎপাদিত চারা থেকে কিছু বিক্রিও করেন তিনি। এভাবে ছাদ ও ছাদকৃষিকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন মনিরা সুলতানা।

গত মঙ্গলবার তাঁর ছাদে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বড় বড় সব পানির পাত্রে উঁকি দিয়ে আছে বিভিন্ন প্রজাতির শাপলা ও পদ্ম। কয়েকটিতে ধরেছে ফুল ও কলি। এর পাশেই বড় ধরনের পানির হাউস তৈরি করা হয়েছে। সেখানে লাফালাফি করছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। ছাদজুড়ে যেন প্রাণ-প্রকৃতির খেলা চলছে। বাহারি ফুল, ফল, সবজি, ঔষধি গাছ, লতাগুল্মে ছেয়ে আছে ছাদের চারপাশ। ছাদের দক্ষিণ পাশে পাখিদের বসার জন্য তৈরি করা হয়েছে মাচা। সেখানে একটু পর পর উড়ে এসে বসছে ঘুঘু, বুলবুলি, শালিক, চড়ুই।

বিজ্ঞাপন

মনিরা সুলতানা প্রথম আলোকে জানালেন, তিনি শখের বশে ২০১৪ সালের দিকে অল্প কিছু গাছ এনে লাগিয়েছিলেন। এরপর হঠাৎ মাথায় এল কীভাবে এটিকে উৎপাদনমুখী ও বাণিজ্যিক করা যায়। সেই চিন্তা থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন জাতের ঔষধি গাছ, সবজি ও নানা ধরনের ফলের গাছ আমদানি করেন। স্বামী আকরাম হোসেন যতবার বিদেশে গেছেন, ততবার তাঁর জন্য নিয়ে এসেছেন কোনো না কোনো উদ্ভিদের জাত। ছাদটি পরিপূর্ণভাবে সাজিয়ে সেখান থেকে কিছু চারা তিনি বিক্রি করেছেন। এরপরই মাথায় এল আরও বড় পরিসরে ছাদে বিভিন্ন ঔষধি গাছ ও ফলমূলের চারা উৎপাদন করবেন। একই সঙ্গে চারা উৎপাদন, ছাদকৃষিতে উদ্ভিদের পরিচর্যা ও অল্প জায়গার সর্বোত্তম ব্যবহার নিয়ে লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেবেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ফেসবুকে ‘প্ল্যান্টস ফ্রম মুন’ নামের একটি গ্রুপ খোলেন। সেখানে সদস্য হন অনেকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে থাকেন।

মনিরা সুলতানা আরও বলেন, ৫ মার্চ সর্বশেষ তিনি প্রায় ৩০ জনকে নিয়ে কর্মশালা অনুষ্ঠান করেন। তাতে শেখানো হয়, কীভাবে উদ্ভিদের পরিচর্যা করতে হয়, জৈবসার তৈরির প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন দেশ থেকে উদ্ভিদের জাত সংগ্রহের পদ্ধতি। তাঁর ছাদে তিনি মাছের চাষ করছেন। মাছের হাউস থেকে বালতিতে করে পানি নিয়ে গাছের গোড়ায় দেন তিনি। এতে গাছ অনেক পুষ্টি পায়। এ ছাড়া বাড়িতে উৎপাদিত সবজির উচ্ছিষ্টাংশ বিশেষ পদ্ধতিতে জৈবসারে রূপান্তর করেন। এসব সার বাজারে পাওয়া যেকোনো সারের চেয়ে অনেক বেশি নিরাপদ। অরগানিক সবজি উৎপাদনের জন্য তিনি এগুলো খাবার হিসেবে গাছকে দেন। তাঁর ছাদবাগানে সব মিলিয়ে উদ্ভিদের সংখ্যা ১ হাজার ৪৩৯টি। এর মধ্যে ঔষধি গাছ আছে ৪০ প্রজাতির। শোভাবর্ধনকারী গাছ আছে ৫৬ প্রজাতির। বিশেষ প্রজাতির গাছের সংখ্যা ২৬টি। দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় গাছ আছে ৭ প্রজাতির। ফলদ গাছের সংখ্যা ৯৯টি। অন্যান্য অন্তত ১০০ প্রজাতির অনেক গাছ আছে।

ঔষধি গাছের মধ্যে আছে অর্জুন, আমলকী, বহেরা, হরীতকী, ঘৃতকুমারী, নিম, তুলসী, থানকুনি, বাসক, পেইন কিলার, অ্যাড্রেসিয়া বেরি, ক্লিন স্টোমাক, চেইন অব গ্লোরি, রুইলিয়া রেসিলিয়া, ডেইজি, কিডনি প্ল্যান্ট, ভ্যানিলা অর্কিড, কর্পূর, জয়ত্রী, গোলমরিচ, সুইট রেসিন, ট্রি রেসিন, কারি পাতা প্রভৃতি। সবজির মধ্যে আছে লেটুস, করলা, ধনেপাতা, বেগুন, কাঁকরোল, পটল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, লাউ, লাল ঢ্যাঁরস, শিম, শসা, টমেটোসহ আরও বিভিন্ন প্রজাতি। এ ছাড়া দেশীয় বিলুপ্তপ্রায় জাতের মধ্যে আছে ওল্ড চন্ডাল, আগর, সিভিট, হলদু, কৃষ্ণ বট, অশোক, কর্পূর প্রভৃতি।

মনিরা সুলতানার স্বামী আকরাম বলেন, ‘আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ফিরে এসেই মনিরা সুলতানার ছাদে গাছপালা রোপণ করতে শুরু করেন। তাঁর আগ্রহ দেখে আমিও তাঁকে বিভিন্ন দেশ থেকে কিছু জাত সংগ্রহ করে দিলাম। এরপর তিনি লোকজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলেন। তাঁর ছাদ কৃষির প্রতি আগ্রহ ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য আমি সব সময় সহযোগিতা করছি। ছাদকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার এই পদ্ধতিটি নারীদের সমাজে এগিয়ে রাখবে।’

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন