মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে শ্যামপুরের জমিদারবাড়িটি সংরক্ষণের আহ্বান

বাকেরগঞ্জে কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর জমিদারবাড়িটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সেটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে তাঁর পরিবার
ফাইল ছবি

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুরে কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর (নাটুবাবু) জমিদারবাড়িটি ওই অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম ঘাঁটি ছিল। ২৫ মার্চের পর বরিশাল অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয় জমিদারবাড়িটি। ঐতিহাসিক বাড়িটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন জমিদার পরিবারের সদস্যরা।

আজ সোমবার সকালে জমিদারবাড়ির বধ্যভূমিতে গণহত্যা ৭১ শীর্ষক এক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার বিনয় জর্জ। এ সময় তাঁর সঙ্গে সহকারী হাইকমিশনার রাজেশ কুমার, বাকেরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র লোকমান হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাধবী রায় উপস্থিত ছিলেন। সকালে হাইকমিশনের লোকজন ওই বাড়িতে গেলে তাঁদের শুভেচ্ছা জানান কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর স্ত্রী ছায়া রায় চৌধুরী ও মেয়ে অপর্ণা রায় চৌধুরী। এ সময় তাঁরা ঐতিহাসিক বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য সরকারের প্রতি আবেদন জানান।

কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর ছেলে লন্ডনপ্রবাসী বিপ্লব বন্ধু রায় চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই জমিদারবাড়ি স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়েও সংরক্ষণ করা হয়নি। বাড়িটি দখল করার জন্য স্থানীয় স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তি ও তাঁদের সহযোগীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, বাড়িটি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ অধিগ্রহণ করে রাষ্ট্রের কোনো সেবামূলক কাজে ব্যবহার করুক। আমরা সব সম্পত্তি সেবামূলক কাজে দান করে দিতেও প্রস্তুত।’

চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ডেপুটি হাইকমিশনার বিনয় জর্জ বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য গৌরবের উপাখ্যান। মহান মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের আত্মত্যাগের যে ইতিহাস, সে জন্য জাতি হিসেবে বাঙালি গর্ব করতে পারে। শ্যামপুর জমিদারবাড়ি ও বধ্যভূমির ইতিহাস তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ তার স্বকীয়তা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ধরে রাখতেই ঐতিহাসিক এসব জায়গা সংরক্ষণ করবে। এ ক্ষেত্রে বন্ধু হিসেবে ভারত এ দেশের মানুষের পাশে আগেও যেমন ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে।

বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর বধ্যভূমিতে ‌গণহত্যা ৭১ শীর্ষক এক চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন ভারতীয় হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার বিনয় জর্জ। আজ সকালে উপজেলার শ্যামপুরে
ছবি: প্রথম আলো

জমিদারবাড়ির বধ্যভূমিতে প্রথমবারের মতো এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করায় এলাকাবাসী খুশি। দিনব্যাপী প্রদর্শনীতে ২১টি চিত্রকর্ম স্থান পায়। রংতুলির আঁচড়ে ৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়াবহতা ফুটিয়ে তোলা হয়। এর আগে সকাল ১০টায় বধ্যভূমিতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর জমিদার পরিবারের প্রতিষ্ঠিত শ্যামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গড়ে তোলা হয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। ২৫ মার্চের পর বরিশাল অঞ্চলের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয় বাড়িটি। এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পরিকল্পনা করা হতো। উনিশ শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত জমিদারির ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন পঞ্চম বংশধর কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরী (নাটুবাবু)। তিনি ছিলেন আজীবন বিপ্লবী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর বাড়িতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ক্যাম্প তৈরি করে সেখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতাবিরোধীরা কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীকে হত্যা করেন।

আরও পড়ুন

৬ দশমিক ৬৯ একর জমির ওপর গড়ে তোলা বাড়িটির মূল দোতলা ভবনটি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বাড়িতে ঢোকার মূল ফটকেরও একই অবস্থা। মূল দোতলা ভবনটিতে বাস করছেন কুমুদ বন্ধু রায় চৌধুরীর স্ত্রী ছায়া রায় চৌধুরী ও ছেলে বিপ্লব বন্ধু রায় চৌধুরী। বাড়ির ভেতরে বড় একটি দিঘি, একটি পুকুর ও বাগান আছে। এই পরিবারের জমির ওপর শ্যামপুর মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয়, প্রাথমিক বিদ্যালয়, শ্যামপুর বাজার, মসজিদ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট, বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধকালে ১৫ নভেম্বর স্থানীয় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে ওই বাড়িতে আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। সেদিন সম্মুখযুদ্ধে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আর মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে ২১ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। ওই যুদ্ধে ৩৫ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা।