প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হয়েছে অতীশ দীপঙ্করের সময়ের বৃহৎ ও সমৃদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স। আজ বুধবার মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর দেউল এলাকায়
প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিষ্কৃত হয়েছে অতীশ দীপঙ্করের সময়ের বৃহৎ ও সমৃদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স। আজ বুধবার মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর দেউল এলাকায়প্রথম আলো

প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নাটেশ্বর দেউলে অতীশ দীপঙ্করের সময়ের বৃহৎ একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের খননে আবিষ্কৃত হওয়া প্রত্ন নিদর্শনগুলো দশম ও একাদশ শতকের।

আজ বুধবার দুপুরে নাটেশ্বর দেউলে আবিষ্কৃত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও খননকাজ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়। এ সময় বলা হয়, নাটেশ্বর দেউলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে দশম-একাদশ শতকে বৃহৎ ও সমৃদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স আবিষ্কৃত হয়েছে। এমন আবিষ্কার বাংলাদেশে এটিই প্রথম। বিগত সময়ের আবিষ্কারের মধ্যে বৃহৎ আকারের নান্দনিক কেন্দ্রীয় অষ্টকোনাকৃতি স্তূপ ছিল। এটির চারদিকে চারটি স্তূপ হলঘরও ছিল। এবার খননের মাধ্যমে ওই স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুটি বৃহৎ আকারের অষ্টকোনাকৃতি স্তূপ, স্মারক কুঠুরি, সুরক্ষাপ্রাচীরের অংশ ও নকশাকৃত ইট।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অষ্টকোনাকৃতি স্তূপের কেন্দ্রে বিশেষ ধরনের স্থাপত্য স্মারক কুঠুরিটি দুষ্প্রাপ্য ও তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কার। এখানে গৌতম বুদ্ধ বা তাঁর গুরুত্বপূর্ণ শিষ্যের দেহভস্ম ও ব্যবহৃত জিনিস রাখা হতো। এর ওপরের অংশ গোলাকার ও নিচের অংশ চতুষ্কোণাকৃতি। স্মারক কুঠুরির গোলাকার অংশটি বৌদ্ধ দর্শনের সৃষ্টিতত্ত্ব ‘শূন্যবাদ’–এর প্রতীকী রূপ। এ ছাড়া স্তূপের ভেতরের স্থানে নির্মিত হয়েছিল স্পোকযুক্ত গাড়ির চাকার আদলে। গোল চাকাই শূন্যের প্রতিরূপ এবং চাকা গতির প্রতীক। উল্লম্ব ইটের বিন্যাসকে চাকার স্পোকের সঙ্গে তুলনা করা হয়। স্পোক সূর্যের রশ্মির প্রতীকও।

বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের খননে আবিষ্কৃত হওয়া প্রত্ন নিদর্শনগুলো দশম ও একাদশ শতকের।
বিজ্ঞাপন

খননের ব্যাপারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এবং বিক্রমপুর অঞ্চলের প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের গবেষণা পরিচালক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ইতিপূর্বে খননে ইটের তৈরি সুরক্ষাপ্রাচীরের অংশবিশেষ পাওয়া গিয়েছিল। সুরক্ষাপ্রাচীরটি যে পুরো স্তূপ কমপ্লেক্স জুড়েই ছিল, এবারের আবিষ্কারে তা অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে। পুরো বসতিজুড়ে সুরক্ষাপ্রাচীর আবিষ্কার বাংলাদেশে এই প্রথম। এর আগে উৎখননে নকশা আকৃতির ইটের ভাঙা টুকরা পাওয়া গেলেও স্থাপত্যের সঠিক অবস্থানে ইটের নকশা পাওয়া যায়নি। এবার সুরক্ষাপ্রাচীরের বাইরের দেয়ালে একটি হলেও ইটের পূর্ণাঙ্গ নকশা সঠিক অবস্থানে আবিষ্কৃত হয়েছে।
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খননকালে হতাশার জায়গা ছিল নাটেশ্বরে পোড়ামাটির ফলক আবিষ্কৃত না হওয়া। তবে নকশাকৃত ইটের ব্যবহার বুঝতে পেরে সে রহস্য এবার উন্মোচিত হলো। স্তূপ কমপ্লেক্সের দেয়াল অলংকরণের ক্ষেত্রে পোড়ামাটির ফলকের পরিবর্তে নকশাকৃত ইট ব্যবহৃত হয়েছে।

default-image

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেলিন বলেন, ‘আমরা যতই খনন করছি, ততই গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ নিদর্শন আবিষ্কার হচ্ছে। আমাদের এখানে আরও সম্ভাবনা আছে, আরও কিছু পাওয়ার আছে। তবে এগুলো খুব ব্যয়সাপেক্ষ। সেই সঙ্গে প্রাকৃতিক সমস্যাও রয়েছে। সরকার আমাদের সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সেটা পর্যাপ্ত হচ্ছে না। সহযোগিতা আরও বেশি পেলে খননকাজ আরও দ্রুতগতিতে করা যাবে।’

খননে আবিষ্কৃত বৃহৎ ও সমৃদ্ধ স্তূপ কমপ্লেক্স আজ ঘুরে দেখেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এ সময় মন্ত্রী বলেন, ‘নাটেশ্বরে খনন থেকে আমরা আমাদের অতীত ইতিহাসকে জানতে পারি। যেখানে অতীত ইতিহাস পাওয়া যায়, পর্যটকেরা সেখানেই ভ্রমণ করতে চান। সে ক্ষেত্রে নাটেশ্বরের দেউলকে একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হবে। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন সে কাজটি করে যাচ্ছে। সরকার এ কাজে তাদের সব দিক থেকে সহযোগিতা করছে।’

default-image

দুপুরে মন্ত্রী ও অতিথিরা মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার রঘুরামপুর বৌদ্ধবিহার প্রত্নস্থানে বিক্রমপুর উন্মুক্ত জাদুঘর উদ্বোধন করেন। রঘুরামপুরের প্রত্নবস্তু ছাড়াও ২০০ প্রজাতির ঔষধি গাছ, হারবাল জাদুঘর দেখে মন্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার, পুলিশ সুপার আবদুল মোমেন, বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা কর্মসূচির ‘কর্মসূচি পরিচালক’ নূহ-উল-আলম লেনিন, গবেষণা পরিচালক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান প্রমুখ।

অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনায় ঐতিহ্য অন্বেষণের গবেষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, চিনের হুনান প্রদেশের প্রত্নতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক বস্তু ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় খননকাজ চলছে। ২০১৩ সালে ১০ একর বিশালাকৃতির জায়গায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। এরই মধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অষ্টকোনাকৃতির অসাধারণ কেন্দ্রীয় মন্দির, ক্রুশ আকৃতির ইটনির্মিত একাধিক রাস্তা, স্নানাগার, নালা, একাধিক ঘর, মেঝে প্রভৃতি। কার্বন-১৪ ডেটিং পদ্ধতিতে প্রত্নবস্তুগুলোর সময়কাল পাওয়া গেছে ৭৮০ থেকে ১২২৩ খ্রিষ্টাব্দ।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন