default-image

কুমিল্লার ঐতিহ্য বলতেই নাম চলে আসে লালমাই আর ময়নামতি পাহাড়ের। তবে পাহাড় কাটার কারণে লালমাইয়ের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। সরকারি সড়ক সম্প্রসারণের কাজেও কোপ পড়েছে লালমাই পাহাড়ের বুকে। প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়কটির উন্নয়নে এরই মধ্যে পাহাড়ের ১ লাখ ১৪ হাজার ঘনফুট মাটি কেটে ফেলেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত ১১ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আন্তরিক হলে পাহাড়টি রক্ষা করেই প্রকল্পের কাজ শেষ করা যেত। এর ফলে পরিবেশ ও প্রতিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা কোনোভাবেই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।

তবে সড়ক নির্মাণকারী সংস্থা সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আহাদ উল্লাহ বলছেন, পাহাড় কাটার বিষয়টি তাঁরা জানেন না। প্রকল্পের প্রাক্কলনে পাহাড় কাটার কোনো অনুমোদন নেই।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, অমূল্য প্রত্নসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর লালমাই পাহাড় ধ্বংস করা হচ্ছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি করা হয়। পাহাড় ক্রমেই সমতল ভূমিতে রূপ নিচ্ছে।

২০১৫ সালের জুন মাসে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত (পরিমার্জিত সংস্করণ) ময়নামতি-লালমাই বইয়ে বলা হয়েছে, ‘কুমিল্লা শহর থেকে আট কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত অনুচ্চ, অপ্রশস্ত ও বিচ্ছিন্ন বিন্যাসে বিন্যস্ত টিলাগুলোর উত্তরের অংশে ময়নামতি ও দক্ষিণের অংশে লালমাই। এ টিলাগুলোর মাটির রং লাল। আনুমানিক ১০ থেকে ২০ লাখ বছরের প্রাচীন প্লায়স্টোসিন অধিযুগের লাল রঙের পললে ঢাকা এই পাহাড়। প্রতিদিন শত শত পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসু এই পাহাড় দেখতে আসেন।’

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
শওকত আরা কলি পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপপরিচালক
বিজ্ঞাপন

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর লালমাই পাহাড়ের মধ্য দিয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগ কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার পিপুলিয়া থেকে লোলবাড়িয়া, রতনপুর, চণ্ডীমুড়া হয়ে মগবাড়ি পর্যন্ত ১৩ দশমিক ৯০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের সড়কের উন্নয়নকাজ শুরু করে। এতে ব্যয় হচ্ছে ৩৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আগে এই সড়কের প্রস্থ ছিল ৩ দশমিক ৭ মিটার। বর্তমানে সেটি বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ মিটার করা হচ্ছে। আগামী ১১ জুন ওই কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

গত ১১ নভেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের কুমিল্লার উপপরিচালক শওকত আরা কলি বড় ধর্মপুর পাহাড় কাটা এলাকা পরিদর্শন করেন। ১৬ নভেম্বর শওকত আরা কলি চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে পাহাড়ের মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৩০ ঘনফুট মাটি কাটা হয়েছে।

উপপরিচালক শওকত আরা কলি প্রথম আলোকে বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এই অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট মামলা দায়েরের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

উপপরিচালকের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১৪ কিলোমিটার সড়কের ৭ কিলোমিটার অংশে পাহাড় কাটা হয়েছে। এতে প্রস্তাবিত বর্ধিত অংশের বাইরে প্রায় ৭৫০ ফুট দৈর্ঘ্যে কোথাও ৩-৭ ফুট, কোথাও ১০ থেকে ১৪ ফুট গভীরতায় ৫ থেকে ৫০ ফুট উঁচু পাহাড় কাটা হয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটায় কোনো কোনো অংশে পাহাড়ি গাছপালাসহ মাটি ধসে আটকে আছে।

গত ২৫ ডিসেম্বর বারপাড়া ইউনিয়নের বড় ধর্মপুর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, পাহাড়ের টিলার চূড়া থেকে নিচ পর্যন্ত কাটা। বিভিন্ন অংশে পাহাড় ধসে পড়েছে। কোথাও গাছ ও লতাজাতীয় বৃক্ষ পড়ে আছে। চূড়ার ওপরের বাঁশ কাত হয়ে আছে। এই এলাকার স্কুলপাড়া অংশে ভেকু মেশিন দিয়ে পাহাড় কাটার চিহ্ন দেখা গেছে।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বড় ধর্মপুর স্কুলপাড়া এলাকার সড়ক প্রশস্তকরণের জন্য তিনটি অংশে খাড়া পাহাড় কেটে ফেলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাসান টেকনো বিল্ডার্স ও মেসার্স হক এন্টারপ্রাইজ। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ইমামুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘তিন ফুট গভীরতায় বক্স কাটতে গিয়ে কিছু পাহাড় ধসে পড়েছে। আমরা কোনো পাহাড় কাটিনি।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সভাপতি মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বছরের পর বছর লালমাই পাহাড় থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। কখনো চার লেন মহাসড়কের জন্য, কখনো রেললাইনের জন্য পাহাড়ের মাটি নেওয়া হয়। এবার সড়ক প্রকল্পের জন্য খাড়া টিলা কাটা হয়। লালমাই পাহাড় রক্ষার জন্য তাঁরা বারবার প্রশাসনের কাছে গেছেন। কিন্তু তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন