শতাধিক বিচ বাইকের চাপায় মরছে সৈকতের লাল কাঁকড়া
কক্সবাজারের প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ১২০ কিলোমিটার সমুদ্রসৈকতে সব ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। কিন্তু এ আইন অমান্য করে সৈকতে চলছে শতাধিক পর্যটকবাহী মোটরযান ‘বিচ বাইক’। এসব গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে শত শত লাল কাঁকড়া।
সম্প্রতি এক বিকেলে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে নেমে দেখা গেছে, বালুচরের এ প্রান্ত ও প্রান্ত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ১০ থেকে ১২টি বিচ বাইক। আরও ১০ থেকে ১৫টি বাইক বালুচরে রাখা আছে। উত্তর দিকের সিগ্যাল, লাবণী পয়েন্টে চলছে ১০ থেকে ১২টি বিচ বাইক। সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে সিগ্যাল পয়েন্ট পর্যন্ত আধা কিলোমিটার বালুচর ঘুরে এলে পর্যটককে গুনতে হয় ২০০ টাকা। একটু দূরের লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার ঘুরে এলে পরিশোধ করতে হয় ৩০০ টাকা। বাইকে চালকের সঙ্গে বসতে পারেন সর্বোচ্চ তিনজন পর্যটক। পর্যটকের ভিড় থাকলে প্রতিটি বাইকের দৈনিক ২০ থেকে ৩০টি রাউন্ড হয়।
কলাতলী ও দরিয়ানগর সৈকতে চলে ২০টির বেশি বিচ বাইক। হিমছড়ি, ইনানী ও পাটোয়ারটেক সৈকতে চলে ৪০ থেকে ৫০টি বাইক। মানুষ নিয়ে বাইকগুলো যখন বালুচর দিয়ে ছুটে চলে, তখন শত শত লাল কাঁকড়া মারা পড়ে। অন্য গাড়ির তুলনায় বাইরের চাকাগুলো মোটা। চাকায় লন্ডভন্ড হয়ে যায় বালুর বুকে দৃষ্টিনন্দন নকশায় তৈরি করা লাল কাঁকড়ার প্রজনন ও আবাসস্থল।
চট্টগ্রামের বহদ্দারহাটের তরুণী জাকিয়া সুলতানা অভিযোগ করেন, সেন্ট মার্টিনের মতো দেখতে পাথরে ভরপুর পাটোয়ারটেক সৈকতে নামতেই দুটি বিচ বাইকের চালক তাঁদের ঘিরে ধরেন। কম ভাড়ায় পুরো সৈকত ঘোরানোর প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু সুবিধার মনে না হওয়ায় তরুণী সমুদ্রের পানির দিকে নেমে পড়েন। তাতেও চালকেরা পিছু ছাড়েননি। সমুদ্রের হাঁটুপানিতে বাইক দুটো নিয়ে নেমে পড়েন দুই চালক। তরুণীর বাবা-মা মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বোধ করলেও প্রতিকার চাওয়ার কেউ ছিল না সেখানে।
পাটোয়ারটেক সৈকতে বাইক চালাচ্ছিলেন শফিউল্লাহ নামের এক যুবক। প্রতিবেশ সংকাটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত সৈকতে বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেলা প্রশাসনের লাইসেন্স (অনুমতিপত্র) নিয়ে তাঁরা বিচ বাইক চালাচ্ছেন। কেউ কেউ অন্যের লাইসেন্স কিনে নিয়ে বাইকের ব্যবসায় নেমেছেন।
কয়েকজন চালক বলেন, প্রতিটি বাইকের বিপরীতে দৈনিক আয় হয় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা। কমিশনের ভিত্তিতে বাইক চালান তাঁরা। যেমন ১ হাজার টাকা আয় হলে চালকেরা কমিশন পান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অর্থাৎ ২৫০-৩০০ টাকা। দৈনিক একজন চালকের সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকাও আয় হয়।
বিচ বাইক মালিক সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার ইসলাম বলেন, সৈকতে চলছে ১২৭টির মতো বিচ বাইক। এর মধ্যে লাবণী পয়েন্ট থেকে দরিয়ানগর পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার সৈকতে ভাগাভাগি করে চলে ৬২টি বাইক। এগুলো সমিতির আওতাভুক্ত। হিমছড়ি, ইনানী, পাটোয়ারটেক সৈকতের আরও ২০-৩০ কিলোমিটারে চলে সমিতির নিবন্ধনবিহীন ৬৫টির মতো বিচ বাইক। এসব বিচ বাইকের অধিকাংশ চালক অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও রোহিঙ্গা নাগরিক। তাঁরা পর্যটকের সঙ্গে দুর্ব্যহার করেন, নানা অজুহাতে অতিরিক্ত ভাড়া হাতিয়ে নেন।
সমিতির নেতারা বলেন, ২০০৮ সালে সৈকতে বিচ বাইকের চলাচল বন্ধ করা হয়েছিল। চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০১২ সালের নভেম্বর মাস থেকে ৩০টি বিচ বাইক চলাচল শুরু হয়। এখন বাইকের সংখ্যা চার গুণে ঠেকেছে। বিচ বাইক চালানোর লাইসেন্স নিতে জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলে ১৬ হাজার ৫০০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয়।
পর্যটন সেলের দায়িত্বে থাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মুরাদ ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত ৬২টি বিচ বাইককে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। বাইকগুলো কলাতলী সৈকত থেকে উত্তর দিকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত চার কিলোমিটার সৈকতে চালানোর কথা, যেখানে কোনো লাল কাঁকড়া নেই। এর বাইরে অন্য কোনো সৈকতে বিচ বাইক চালানো নিষিদ্ধ। কারণ, ওই সব সৈকতে হাজার হাজার লাল কাঁকড়া বিচরণ করে, যা দেখে পর্যটকেরা মুগ্ধ হন। কলাতলীর দক্ষিণ দিকের সৈকতে বিচ বাইক চালানো হচ্ছে কি না, অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে বিচ বাইকের লাইসেন্স বাতিল করা হবে।
দরিয়ানগর থেকে হিমছড়ি-প্যাঁচার দ্বীপ হয়ে পাটোয়ারটেক সৈকত পর্যন্ত ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার এলাকা ভরপুর থাকে লাল কাঁকড়ায়। এক–একটি কাঁকড়ার ওজন ৩০০-৫০০ গ্রাম। স্থানীয় জেলেরা বলেন, করোনা মহামারির সময় সৈকত পর্যটকদের বিচরণ টানা দেড় বছর বন্ধ থাকায় কাঁকড়ার প্রজনন বেড়ে গিয়েছিল অনেক গুণ। এখন বিচ–বাইকের চাকায় শেষ হচ্ছে লাল কাঁকড়া।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক শেখ মো. নাজমুল হুদা বলেন, দরিয়ানগর থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত অন্তত ৮০ কিলোমিটার সৈকতে বিচ বাইকসহ যানবাহনের চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। বিশেষ অভিযান চালিয়ে এসব যানবাহন জব্দ করতে হবে, না হলে সৈকতের জীববৈচিত্র্য বলতে কিছু থাকবে না।