শয্যা ছাপিয়ে মেঝেতেও রোগী, হিমশিম অবস্থা

রোগী বেড়ে যাওয়ায় সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে শয্যা বাড়ানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে।

  • চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটের ২০০ শয্যায় গতকাল রোগী ছিল ২৪৬ জন।

  • বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড শয্যা রয়েছে ৬৫০টি। এগুলোর মধ্যে ৬২৪ জন রোগী ভর্তি।

প্রতীকী ছবি

প্রতি ঘণ্টায় আসছে করোনায় আক্রান্ত আর উপসর্গের রোগী। জরুরি বিভাগের যেন দম ফেলারও জো নেই। এমন রোগীর চাপে হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক, নার্সসহ হাসপাতালের কর্মীদের। শয্যায় জায়গা না পেয়ে ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে। চিকিৎসা পেতে কী আকুতি রোগী আর স্বজনদের।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটের এ চিত্র গতকাল শনিবারের। ইউনিটের রেড জোনে দুপুরে রোগী ছিল ১৬৮ জন। ইয়েলো (উপসর্গ) জোনে রোগী ছিল ৭৮ জন, আর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ১০টি শয্যা তো খালি থাকছে না কয়েক দিন ধরেই। করোনার শুরুতে এখানে প্রথমে কোভিড শয্যা ছিল ১০০টি, এরপর বাড়িয়ে ২০০টি করা হয়। এখন ৩০০ রোগী রাখার জন্য শয্যা, অক্সিজেনসহ অন্যান্য সুবিধা বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এভাবে চট্টগ্রামের প্রতিটি হাসপাতালে করোনা রোগী বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালে কিছু শয্যা ফাঁকা আছে দাবি করা হলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা–ও নেই। এই অবস্থায় সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রে শয্যা বাড়ানোর তৎপরতা শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মমিনুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘করোনা রোগী বেড়েছে। তাই আমরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে শয্যা বাড়ানোর চিন্তা করেছি। আশা করি সপ্তাহখানেকের মধ্যে কিছু শয্যা বাড়বে।’

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে চট্টগ্রামে সরকারি হাসপাতালে ৯৫০টি শয্যা রয়েছে। তাতে গতকাল রোগী ছিল ৩৪১ জন। কিন্তু এই ৯৫০ শয্যার মধ্যে রেলওয়ে হাসপাতালের ২০০ এবং হলি ক্রিসেন্টের ১০০ শয্যাও ধরা হয়েছে। কিন্তু হাসপাতাল দুটিতে বর্তমানে কোনো রোগী ভর্তি হয় না। কারণ, সেখানে চিকিৎসা–সুবিধা গড়ে ওঠেনি। এ ছাড়া উপজেলা হাসপাতালগুলোর শয্যাও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে উপজেলা হাসপাতালে করোনা রোগী নেই বললেই চলে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড শয্যা রয়েছে ৬৫০টি। এগুলোর মধ্যে ৬২৪ জন রোগী ভর্তি ছিলেন।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সেখ ফজলে রাব্বি প্রথম আলোকে বলেন, রোগী উভয় ক্ষেত্রে বাড়ছে। এই অবস্থায় মেডিকেলে শয্যা বাড়ানো হয়েছে। জেনারেল হাসপাতালেও ১৪০ থেকে ২০০ শয্যা পর্যন্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আইসিইউ শয্যা বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে গতকাল রোগী ছিল ৯৬ জন। এর বাইরে একই হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী ছিল ১৬ জন। হাসপাতালটিতে প্রথমে শয্যা ছিল ১০০টি। এরপর ৪০টি বাড়িয়ে ১৪০ করা হয়। এখন আবার বাড়ানোর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।

সরেজমিন

গতকাল বেলা দেড়টায় চমেক হাসপাতালের রেড জোনে দেখা যায়, মেঝেতে শয্যা পেতে রাখা হয়েছে রোগী। প্রায় প্রত্যেক রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক। হাসপাতালের কর্মীরা বলেন, রোগী বেড়ে যাওয়ায় মেঝেতে শয্যা পাতা হয়েছে।

চমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক সাজ্জাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এখন ৩০০ পর্যন্ত রোগী ভর্তি করাতে পারব বলে জানিয়ে দিয়েছি। সে অনুযায়ী অক্সিজেনের লাইন বাড়ানো, শয্যার জায়গা তৈরি করাসহ সব কাজ করা হচ্ছে।’

রেড জোনের একটু দূরে আইসিইউ বিভাগ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে অপেক্ষা করছেন ব্যবস্থাপত্রসহ এক নারী। তিনি জানান, তাঁর বাবাকে রেড জোন থেকে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসক। কিন্তু আইসিইউ খালি না হওয়ায় দিতে পারছেন না।

এদিকে আইসিইউর অপেক্ষায় থাকা সীতাকুণ্ডের আবদুস সবুরের অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে চিকিৎসকেরা জানান। তাঁকে বৃহস্পতিবার আইসিইউ দেওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম আইসিইউর জন্য ছোটাছুটি করছিলেন। আইসিইউ না পেলেও তাঁর অক্সিজেনের পরিমাণ এখন বেড়েছে বলে জানা গেছে।

জেনারেল হাসপাতালেও আইসিইউ শয্যার জন্য হাহাকার চলছে। এক দিন অপেক্ষা করে রিজিয়া বেগম নামের এক রোগী গতকাল বিকেলে আইসিইউ শয্যার নাগাল পেয়েছেন। এ ছাড়া আরও তিন–চারজন আইসিইউ শয্যার অপেক্ষায় রয়েছেন বলে কর্তব্যরত নার্স জানান।

বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেও শয্যা খালি নেই। গতকাল সকালে ম্যাক্স হাসপাতালে দেখা যায়, কোভিড কেবিনগুলোর অনেকগুলোতে দুজন করে রোগী রয়েছে। হাসপাতালে মহাব্যবস্থাপক রঞ্জন দাশগুপ্ত বলেন, কোনো কেবিন বা শয্যা খালি নেই। কোভিড অন্তত পাঁচটি কেবিনে দুজন করে একই পরিবারের রোগী রয়েছে।

এক দিনে ৬০৩ জন শনাক্ত

চট্টগ্রামে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে সংক্রমিত তিনজন মারা গেছেন। একই সময়ে নতুন করে রেকর্ড ৬০৩ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। শনাক্তের হার ৩২ শতাংশ। শনিবার সকালে চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো করোনা-সংক্রান্ত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। সরকারি হিসাব অনুসারে, চট্টগ্রামে এখন পর্যন্ত ৬৪ হাজার ২৯৯ জনের শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় চট্টগ্রামে মারা গেছেন মোট ৭৫৭ জন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৯০৭ জনের করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হয়। ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজন শহরের ও একজন উপজেলার বাসিন্দা।