বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অবস্থা দেখে আবদুর রহমান ও রওশন জটলার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস করলেন না। সরে এসে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে তা দেখতে থাকেন। অবস্থা দেখে পরিবেশকের লোকজন স্লিপ দেওয়া বন্ধ করে দেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে। যাঁরা আগাম স্লিপ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের নাম বিক্রয় কর্মীদের লিখে নিতে বললেন পুলিশ সদস্যরা। তা দেখে পণ্য কিনতে আসা কলেজপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মোমেনা বেগম (৫২) বলতে লাগলেন, নাম লিখে নেওয়া সান্ত্বনা পুরস্কার, আর কী। পরে বেলা আড়াইটার পর শুরু হয় পণ্য বিক্রি।

ক্রেতাদের লাইন থেকে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এই প্রতিবেদক আবদুর রহমানের কাছে জানতে চান, পণ্য কিনেছেন কি না? জবাবে আবদুর রহমান ট্রাকের দিকে হাত দেখিয়ে বলেন, ওখান থেকে জিনিস কেনার উপায় আছে? পরে তিনি ছন্দ মিলিয়ে বলতে লাগলেন, শরীরে জোর আছে যার, টিসিবির পণ্য তার।

আবদুর রহমান ও রওশন আরার মতো আগাম স্লিপ থেকে বঞ্চিত দুই শতাধিক নারী-পুরুষ তখনও এই এলাকা ছাড়েননি। সে সময় সাবেত্রী রায় (৫৭) প্রথম আলোকে জানান, সকাল সাতটার আগে এসেছেন। কারণ, দেরি করে এলে স্লিপ পাওয়া যায় না। আর ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর যখন স্লিপ দেওয়ার সময় হলো, তখন লোকজনের হুড়োহুড়িতে বঞ্চিত হলেন তিনি। এ নিয়ে সাবেত্রীর ক্ষোভের শেষ নেই। তিনি বলেন, বাজারে সব জিনিসের দাম আগুন। এর মধ্যে যদি একটু কম দামে দুটি পণ্য কেনা যায়, তাতেই অনেক পাওয়া। তবে যা অবস্থা, তাতে সুস্থভাবে পণ্য কিনে বাড়ি ফিরতে পারব কি না, বলা মুশকিল।’

এ সময় ছবি তুলতে গেলে এক নারী (৫৫) লাইন থেকে সরে যান। জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে ওই নারী বলেন, ‘ভাই, এখান থেকে তেল-ডাল কিনতে এসেছি, এ ছবি যদি প্রকাশ পায়, তাহলে তো আত্মীয়স্বজন দেখে ফেলবে, লজ্জা লাগবে। কিন্তু বাজারে জিনিসপত্রের দাম এত বেশি যে এখান থেকে না নিয়ে উপায় নেই। ছবি পত্রিকায় দিয়েন না, ভাই।’

কয়েকজন ক্রেতা বলেন, ‘এতটুকু বরাদ্দ নিয়ে আসা ঠিক হয় না। আমরা কত মানুষ। তাঁরা ছোট্ট ট্রাকে পণ্য নিয়ে এসে কয়েকজনকে দিয়ে বলে শেষ। তাহলে যাঁরা কষ্ট করছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে পণ্য পান না, তাঁদের অপরাধ কী? তাঁরা কেন পাবে না?’

টিসিবির পরিবেশক মেসার্স মুসলিমা ট্রেডার্স সূত্রে জানা গেছে, টিসিবির রংপুর কার্যালয় থেকে ট্রাকে বিক্রয়ের জন্য একেক দিন ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণে পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। সোমবার তাদের ৫০০ কেজি চিনি, ৪৮০ লিটার সয়াবিন তেল, ৪০০ কেজি মসুরের ডাল ও ৪৮৫ কেজি পেঁয়াজ বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রতি কেজি চিনি ৫৫, মসুর ৫৫ ,সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১০০ ও পেঁয়াজ ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন জায়গায় চারজন পরিবেশকের (ডিলার) মাধ্যমে ট্রাকে করে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে। একই স্থানে প্রতিদিন বিক্রি করা হলে অন্য এলাকার লোকজন এ সুবিধা পাবেন না, এ কথা মাথায় রেখে জেলা প্রশাসন বিক্রয়ের স্থান নির্ধারণ করে দেয়।

টিসিবির পরিবেশকেরা বলছে, বাজারে সয়াবিন তেল ও চিনির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন টিসিবির এই দুটি পণ্যের প্রতি ক্রেতার নজর বেশি। বাজারে যেখানে পাঁচ লিটার সয়াবিন তেলের ক্যান বিক্রি হচ্ছে ৭১০ টাকায়, টিসিবির ট্রাকে সেটা মিলছে ৫০০ টাকায়। আর প্রতি কেজি চিনি ও মসুরের ডালে সাশ্রয় হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। এ কারণে টিসিবির পণ্য কিনতে মানুষের হুড়োহুড়ি লেগেই থাকে।

টিসিবির পরিবেশক মেসার্স মুসলিমা ট্রেডার্সের মুসলিম উদ্দিন বলেন, টিসিবি থেকে এক দিনে বিক্রয়ের জন্য যে পরিমাণ পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হয়, তার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি ক্রেতা আসছেন। এ কারণে ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। অনেক সময় অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটে। ডিলারদের বরাদ্দ বাড়িয়ে দিলে এই যন্ত্রণা কিছুটা কমতে পারে।

টিসিবি রংপুর কার্যালয়ের উপ-ঊর্ধ্বতন কার্যনির্বাহী প্রতাপ কুমার বলেন, ‘প্রতিটি ট্রাকে কতটুকু পণ্য বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা প্রধান কার্যালয় থেকে নির্ধারিত হয়। টিসিবির পণ্যের চাহিদা থাকলেও বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়টি আমাদের হাতে নেই।’

টিসিবির ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কেন্দ্রের কার্যক্রম দেখভাল করেন ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর মো. আবদুল কাইয়ুম খান। যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, জেলায় টিসিবির পণ্যের যে পরিমাণ চাহিদা আছে, টিসিবির পণ্য কীভাবে সহজলভ্য করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা চলছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন