বিজ্ঞাপন

কুমুদিনী হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চায়নি; তাই ২০০১ সালের ৪ জুন রণদাপ্রসাদ সাহার নাতি রাজীব প্রসাদ সাহার হাত ধরে হাসপাতাল ক্যাম্পাসে যাত্রা শুরু হয় ‘কুমুদিনী উইমেন্স মেডিকেল কলেজ’। শুধু চিকিৎসাসেবা নয়, ভালো মানবিক গুণসম্পন্ন চিকিৎসক তৈরি করার উদ্দেশ্যে এর যাত্রা শুরু হয়। তাই অল্প সময়েই চারদিকে এর সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু দেশ নয়, দেশের বাইরে থেকেও শিক্ষার্থীরা আসছে পড়াশোনা করতে। এখানে এমবিবিএস ও বিডিএস কোর্সে পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে।

default-image

১৯৭৩ সালে এখানে চালু করা হয়েছিল নার্সিং ইনস্টিটিউট। শুরুতে নার্সিং ডিপ্লোমা কোর্স করানো হতো। ২০০৭ সালে চালু করা হয়েছে বিএসসি নার্সিং কোর্স। বর্তমানে নার্সিং বিষয়ে এমএসসি কোর্স চালুর বিষয়টিও অনুমোদন লাভ করেছে। কুমুদিনী কল্যাণ সংস্থা সম্প্রতি উদ্যোগ নিয়েছে ‘কুমুদিনী ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স অ্যান্ড ক্যানসার রিসার্স’ স্থাপনের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।

১৯৩৮ সালে হাসপাতালের কাজ শুরুর সময় রণদাপ্রসাদ সাহার স্ত্রী মেয়েদের জন্য একটি আবাসিক স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। বাংলাদেশে প্রথম এই আবাসিক স্কুলই হচ্ছে ভারতেশ্বরী হোমস। স্কুলের জন্য পাকা দালান তৈরি শেষে ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। শুরু থেকেই নিরাপদ আবাসিক পরিবেশে থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক চর্চা, শরীরচর্চাসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে। ভারতেশ্বরী হোমসের শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা প্রদর্শনীর সুনাম রয়েছে সারা দেশে। বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে এই শিক্ষার্থীদের ড্রিল (শরীরচর্চা) দেশে–বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেছে। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে স্কুল ও কলেজ শাখায় সাড়ে সাত শ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ভারতেশ্বরী হোমস ২০২০ সালে স্বাধীনতা পদক লাভ করে।

নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য রণদাপ্রসাদ সাহা ১৯৪৩ সালে টাঙ্গাইল শহরে প্রতিষ্ঠা করেন কুমুদিনী কলেজ। ১৪ দশমিক ১৩ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই কলেজ বৃহত্তর ময়মনসিংহে মেয়েদের প্রথম কলেজ। শুধু উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি দিয়ে শুরু হলেও কয়েক বছরের মধ্যে স্নাতক শ্রেণি চালু করা হয়। শুরু থেকেই নিরাপদ পরিবেশে মেয়েদের হোস্টেলে থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছিল। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেয়েরা এই কলেজে পড়তে আসতেন। কলেজটি ১৯৭৯ সালে জাতীয়করণ করা হয়। প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে এখানে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ছাড়াও ১৬টি বিষয়ে স্নাতক সম্মান এবং ৮টি বিষয়ে স্নাতকোত্তরে লেখাপড়া করছেন।

default-image

শুধু টাঙ্গাইলে নয়, রণদাপ্রসাদ সাহা ১৯৪৪ সালে মানিকগঞ্জে তাঁর বাবা দেবেন্দ্রনাথ সাহার নামে প্রতিষ্ঠা করেন ‘দেবেন্দ্র কলেজ’। সে সময় মানিকগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় কোনো কলেজ ছিল না। দেবেন্দ্র কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানিকগঞ্জে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের দ্বার উম্মোচন করেন রণদাপ্রসাদ সাহা। দেবেন্দ্র কলেজ এখনো জেলার সর্ববৃহৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কুমুদিনী ট্রাস্টের আওতায় নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়ে রণদাপ্রসাদ সাহা বিশ্ববিদ্যালয়।

অন্যদের স্থাপন করা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও রণদাপ্রসাদ সাহার অবদান স্বীকৃত। টাঙ্গাইলের করটিয়া সা’দত কলেজ, মির্জাপুর এস কে পাইলট হাইস্কুল, কাগমারী মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ, বরিশাল আলতাব মেমোরিয়াল স্কুল, ভূঞাপুর ইবরাহিম খাঁ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রণদাপ্রসাদ সাহার আর্থিক সহায়তা রয়েছে। সমাজকল্যাণমূলক কাজ ও দানের কারণে এলাকার মানুষ তাঁর নামের আগে ‘দানবীর’ যোগ করে থাকেন।

default-image

১৯৪৭ সালের ২২ মার্চ রণদাপ্রসাদ সাহা তাঁর সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কল্যাণধর্মী কাজের স্বার্থে একটি ট্রাস্টভুক্ত করেন। ট্রাস্টের নামকরণ করেন ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল’। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এই ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন রণদাপ্রসাদ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং এদেশীয় দোসররা তাঁকে এবং তাঁর ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহাকে ধরে নিয়ে যায়। আর তাঁরা ফিরে আসেননি।

দেশ স্বাধীনের পর রণদাপ্রসাদ সাহার মেয়ে জয়াপতি ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নেন। তিনি অবসর নেওয়ার পর রণদাপ্রসাদ সাহার নাতি রাজীব প্রসাদ সাহা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। রণদাপ্রসাদ সাহা নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে আজও চলছে সেবা ও শিক্ষার আলো ছড়ানোর কাজ।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন