default-image

মাদকসেবী এক ব্যক্তি মাদকের টাকা জোগাড়ের জন্য অপহরণ করেছিলেন প্রতিবেশী এক শিশুকে। পরিকল্পনা ছিল মুক্তিপণের পাঁচ লাখ টাকা আদায় করার। কিন্তু অপহরণের সময়ই শিশুটি চিৎকার করলে গলা চেপে ধরেন তিনি। একপর্যায়ে শ্বাসরোধে শিশুটির মৃত্যু হয়। মাদকসেবী ওই ব্যক্তি এবার পরিকল্পনা সাজান নতুন করে।

শিশু অপহরণ ও হত্যার ঘটনায় গতকাল শুক্রবার বগুড়ার গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মনজু মিয়া (৩৪)। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁর স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে গতকাল সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বর্ণনা দেয় পুলিশ। নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত ওই সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন বগুড়ার পুলিশ সুপার আলী আশরাফ ভূঞা। মনজু মিয়ার বাড়ি গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের নিশুপাড়া গ্রামে। অপহরণ ও হত্যার শিকার শিশুর নাম হানজালাল (৬)। তার বাড়িও একই গ্রামে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, হানজালালের বাবা পিন্টু প্রামাণিক মালয়েশিয়া প্রবাসী। সে অপহরণের শিকার হয় গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর। ওই দিন বাড়ির পাশে খেলতে গেলে মনজু মিয়া তাকে অপহরণ করে একটি দোকানের ভেতর নিয়ে যায়। ওই দোকানও মনজু মিয়ার। পরিকল্পনা অনুযায়ী হানজালালকে অপহরণ করে মুক্তিপণের টাকা আদায় করতে চেয়েছিলেন তিনি। বিপত্তি বাঁধে তার (হানজালাল) মুখে স্কচটেপ প্যাঁচাতে গেলে। চিৎকার করায় ঘটনা জানাজানি হওয়ার ভয় পেয়ে যান মনজু। একপর্যায়ে চিৎকার থামাতে হানজালালের গলা চেপে ধরেন। শ্বাসরোধে মারা যায় হানজালাল।

এদিকে হানজালাল নিখোঁজের পরপরই গাবতলী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার মা তাসলিমা বেগম। এরপর একটি অচেনা মুঠোফোন নম্বর থেকে কল আসে। তাতে হানজালালকে অপহরণের কথা জানিয়ে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। তখন পর্যন্ত ছেলের বেঁচে থাকার কথা জানতেন তাসলিমা বেগম। অন্যদিকে ছেলে নিখোঁজের খবর পেয়ে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসেন পিন্টু প্রামাণিক। এরপর বিভিন্ন সময় অপহরণকারী ও শিশুটির পরিবারের মধ্যে দর–কষাকষি চলে।

৩৮ দিন পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি অপহরণকারী জানান, হানজালালের লাশ গ্রামের বটতলাসংলগ্ন হাড়িপুকুরে রাখা আছে। লাশ উদ্ধারের পর ২২ জানুয়ারি গাবতলী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন পিন্টু প্রামাণিক। অপহরণকারী ও হত্যাকারীর সন্ধানে নামে গোয়েন্দা পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

ভিক্ষুকের সূত্র ধরে
গাবতলী উপজেলা থেকে বগুড়া শহরের দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। শহরের প্রাণকেন্দ্রেই পৌর পার্ক। সেখানে ভিক্ষা করতেন পক্ষাঘাতগ্রস্ত আনন্দ কুমার দাস। হানজালালের অপহরণকারীর সন্ধানে নেমে শুরুতেই তাঁকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ।

আনন্দ কুমারের জবানবন্দির বরাত দিয়ে বগুড়া ডিবির পরিদর্শক এমরান মাহমুদ বলেন, পৌর পার্কে ভিক্ষা করার সময় একদিন এক ব্যক্তি আনন্দের কাছে আসেন। তিনি আনন্দকে ১০ টাকা ভিক্ষা দেন। এরপর বিভিন্ন খোঁজখবর নেওয়ার ছলে আলাপ শুরু করেন। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি আনন্দ কুমারকে অনুদানের টাকা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন। এ জন্য আনন্দকে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র দিতে বলেন ওই ব্যক্তি।
পুলিশ জানায়, মনজু মিয়া যে মুঠোফোন নম্বর থেকে হানজালালের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, তা আনন্দ কুমারের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে কেনা। আনন্দের কাছে থেকে এমন সূত্র পাওয়ার পরই নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও বিভিন্ন প্রযুক্তির ব্যবহার করে পুলিশ। অবশেষে গতকাল শুক্রবার নিশ্চিত হওয়ার পর মনজুকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মনজুর দেওয়া বর্ণনা
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গ্রেপ্তারের পর মনজু পুলিশকে জানান, নেশা করতে গিয়ে ধারদেনা হয়। ইয়াবা সেবনের টাকা জোগাতেই মুক্তিপণ আদায়ের জন্য প্রতিবেশীর শিশুকে অপহরণের পরিকল্পনা আঁটেন তিনি। সুযোগ মেলে ১৩ ডিসেম্বর বিকেলে। ওই দিন তিনি নিশুপাড়া বাজারে নিজের ওষুধের দোকানে বসে ইয়াবা সেবন করছিলেন। শিশু হানজালাল পাশেই খেলছিল। কৌশলে তাকে দোকানে ডেকে নিয়ে মুঠোফোন খেলতে দেন। এরপর দোকানের ঝাঁপ ফেলে হনজালালের মুখে স্কচটেপ বাঁধার চেষ্টা করেন।

গলা চেপে ধরায় শ্বাসরোধে হানজালাল মারা গেলে একটি বড় পলিথিনের ব্যাগে তার লাশ ভরে স্কচটেপ দিয়ে পুরো শরীর মুড়িয়ে দোকানের কাঠের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখেন। মধ্যরাতে ফের দোকানে এসে প্লাস্টিকে বস্তাবন্দী করে তিনটি ইট বেঁধে হানজালালের লাশ পুকুরে ফেলে দেন।

এ ঘটনার পর ১৯ ডিসেম্বর বগুড়া শহরের পৌর পার্কে ভিক্ষুক আনন্দ কুমার দাসের সঙ্গে দেখা হলে অনুদান দেওয়ার কথা বলে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করেন। এরপর শহরের সাতমাথা এলাকা থেকে সিমকার্ড কেনেন। নতুন কেনা মুঠোফোনে তা তুলে কল করেন হানজালালের মায়ের কাছে।

ডিবির পরিদর্শক এমরান মাহমুদ বলেন, অপহরণের ঘটনায় থানায় জিডি হওয়ার পর পুলিশই কৌশলের অংশ হিসেবে হানজালালের পরিবারকে দর–কষাকষি করতে বলে। এই সুযোগে তারা অপরাধীকে ধরতে চেয়েছিল। একপর্যায়ে অপরাধীই হত্যার কথা বলেন ও লাশের সন্ধান দেন। আজ শনিবার ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার জন্য মনজু মিয়াকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন
জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন